Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
সরকারের সচিব হলেন লক্ষ্মীপুরের সুসন্তান মোঃ হাবিবুর রহমান  অতিরিক্ত আইজিপি হলেন লক্ষ্মীপুরের কৃতী সন্তান মোহাম্মদ ইব্রাহীম ফাতেমী  লক্ষ্মীপুরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব দিবস পালিত  সকলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চাই -মোহাম্মদ মাসুম, ইউএনও, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা  ফেনী জেলা পরিষদ শিশু পার্ক থেকে বিমুখ স্থানীয়রা 

নাট্যব্যক্তিত্ব শাহ ফরহাদের যত কথার কিছু কথা

॥ এ কে এম গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ ॥
লোকটিকে দেখলে পরিচিত মনে হত। কোথায় যেন দেখেছি। দেখার স্থান ছিল নোয়াখালীর মাইজদী শহরের প্রধান সড়কের আশপাশ। সাদা লম্বা চুল, মুখে খোঁচাখোঁচা দাঁড়ি, গায়ে হাফ শার্ট অথবা ফতুয়া, পরণে জিন্স প্যান্ট আর চোখে চশমা। সত্যিকারের বয়স যাই হোক না কেন, নতুনত্ব আর যৌবন তার থেকে কখনো দূরে সরে যায়নি। আর এ বেশধারী লোকটির নাম শাহসুদ্দিন চৌধুরী। তবে শাহ ফরহাদ নামে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন। নামের পরিচিতি যাই থাকুক না কেন, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী, নাট্য সংগঠক এবং নাট্য ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্বের মহারথে ভর করে তিনি অনেক দূর পাড়ি দিয়েছেন। আর তার ভাগ্যাকাশে উড়িয়েছেন নানা রঙের ঘুড়ি তথা নাটক।
তার সংক্ষিপ্ত পরিচয়
নাম তার শামসুদ্দিন চৌধুরী। তবে সবার কাছে তিনি শাহ ফরহাদ নামে পরিচিত। পিতা মরহুম ফয়েজ আহম্মেদ এবং মাতা মরহুমা মাহে আলেম মোনাব্বেরা চৌধুরী; তিনি পরিবারের বড় সন্তান। জন্ম তার ১৯৫০ খৃ. ল,’ইয়াস কলোনী, মাইজদী কোর্ট, নোয়াখালীতে। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। আর তার কর্ম এবং ধ্যানজ্ঞান ছিল একমাত্র নাট্যচর্চা। এ নাট্যজন ১৯ জানুয়ারি ২০১৪ সালে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ইহধাম ত্যাগ করেন।
পারিবারিক কথামালা
এক কন্যা, তিন পুত্র সবাই শিক্ষিত, আয় উপার্জন, জীবিকার অন্বেষণেকর্মে সক্রিয়। পরিবারের সকল সদস্যকে উপেক্ষা করে তিনি নাট্যচর্চা করেছেন। তবুও তার সন্তানরা পিতার কর্মে আনন্দিত। তারা জানে নাট্যকর্ম একটি সু-কর্ম । তাই পরিবারের সদস্যরা কখনো উৎসাহ যোগাতে কার্পণ্য করেনি। স্ত্রী তার নাট্যকর্মে সহায়তা করেছিলেন। বিশেষ করে শুভ পরিণয়ের পর হতে মৃত্যুর পূর্ব দিন পর্যন্ত উৎসাহউদ্দীপনা দিয়েছিলেন।
তার অনুপ্রেরণা
মায়ের আশীর্বাদ ও অনুপ্রেরণায় স্বাধীনতার পূর্বে নাটকের অনিয়মিত কর্মী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পরে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন যখন গঠিত হয় তখন তিনি নাটকে আগ্রহী হন। তিনি নোয়াখালী শহরের প্রাণকেন্দ্রে নাট্যদল ‘চারণিক’ নিয়ে মূলত দর্শক সৃষ্টির জন্য গ্রুপ থিয়েটার গড়ার মানসে মনযোগী হন এবং নাটককে জনপ্রিয় করে তোলেন। ঢাকার মঞ্চে নাটকের সাথে প্রতিযোগিতামূলক নাটক মঞ্চায়নে সক্রিয় ছিলেন শাহ ফরহাদ। আন্তর্জাতিক নাট্যব্যক্তিত্ব আই টি সভাপতি রামেন্দু মজুমদারের আন্তরিকতায় নাট্য চর্চায় তার গতি বৃদ্ধি পায়।
তার সাথে ড. সেলিম আল দ্বীনের সম্পর্ক
ড. সেলিম আল দ্বীনের গ্রাম থিয়েটার নিয়ে কাজ করার জন্য শাহ্ ফরহাদকে আমন্ত্রণ জানান। গ্রাম থিয়েটার নিয়ে আলাপআলোচনা করেন। সেই আশির দশক শেষে ৮৭‘তে শাহজাহান ও সাইফুল ইসলাম খোকনসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে শাহ ফরহাদ গ্রাম থিয়েটার সৃষ্টি করেন। তার সৃষ্ট গ্রাম থিয়েটারগুলো হলোঃ নোয়াখালী থিয়েটার, ল’ইয়ার্স কলোনী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী , উজ্জ্বলপুর থিয়েটার, হরিনারায়ণপুর থিয়েটার, রাজগঞ্জ থিয়েটার, লক্ষ্মীনারায়ণপুর থিয়েটার, মাইজদী থিয়েটার, একলাশপুর থিয়েটার। এরপর সৃষ্টি করেন লক্ষ্মীপুর থিয়েটার, খাগড়াছড়ি থিয়েটার, রাঙ্গাঁমাটি থিয়েটার। ৮৮‘র নাট্য উৎসবে ফেনী সুবচন (বর্তমান জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত গিয়াস উদ্দীন সেলিম’র দল), রয়েল বেঙ্গঁল টাইগার মঞ্চায়ন করে। শাহ ফরহাদ অনেক কাজে সেলিম আল দ্বীনকে কাছে পেয়েছেন। নোয়াখালী জেলায় প্রথম নাট্য কর্মশালা আয়োজনে উদ্যোগী হয়েছিল নোয়াখালী থিয়েটার। ঐ কর্মশালার মধ্যে প্রথম নাটক ‘কাকলাস’ তৈরিতে সেলিম আল দ্বীন, বাবু, সাইমুন, শিহাবউদ্দিন শাহীন (বর্তমানে নাট্য টিভি পরিচালক) সক্রিয় সহযোগিতা করেন। ড. সেলিম আল দ্বীন শাহ ফরহাদের পারিবারিক সদস্যের মত ছিলেন। ড. সেলিম আল দ্বীনের সুবচন নাট্যদলও ৭দিনের নাট্যউৎসব আয়োজন করে। সে সময় ‘এখনও ক্রীতদাস’ মঞ্চস্থ হয়। এভাবেই এক এক বছর যায় আর শাহ ফরহাদের সময় কেটে যায়। দেখতে দেখতে কখন ৬২/৬৩’তে পা পড়েছিল তা তিনি নিজেও টের পাননি।
তার নির্দেশিত নাটক
শাহ ফরহাদের নির্দেশিত নাটকগুলো হলঃ শিল্পীর মৃত্যু নাই, জনৈকের মহাপ্রয়াণ, জীবন মানে যুদ্ধ (এটি রেডিওতে প্রচারিত হয়েছিল), হুজুর যখন মরবে, সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ¦ীগণ, বাজপাখি, সেনাপতি, এখন দুঃসময়, এখনও ক্রীতদাস, ইবলিশ, রাজারবাড়ি কতদূর, উজান চরের ব্লাড প্রেসার, ছুটি, কাবলিওয়ালা, কাকলাস, অবাক জলপান, তপু এলো ফিরে, ক্ষুধা, চরম, দাস, চোর চোর, উদয়নালা, শাহাজাদীর কালো নেকাব, অরক্ষিত মতিঝিল, এখানে নোঙ্গঁর, ওরা কদমআলী, স্বাধীনতার গল্প, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, শান্তি, পূর্ববাংলা ডট, দেশ ও নিরুপমার গল্প অন্যতম।
তার সময়ে নারী চরিত্র
শাহ ফরহাদ তার সময়কালে নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য যাদের কাছে পেয়েছিলেন তারা হলেনঃ বাণী সাহা, মিনু সাহা, সিবানী সাহা, এনজেলা পিনারু, জিতা পিনারু, মাধুরী ভূঁঞা, স্মৃতি ভূঁঞা, নাসরিন, পামেলা, শাহীন আক্তার, উমা ভারতী১, উমা ভারতী২ প্রমুখ। এছাড়াও রয়েছে রক্সি, ফেন্সী, শারমিন আক্তার প্রিয়া, রাবেয়া সুলতানা সুমি, পিংকীসহ আরো অনেকে।
তার পছন্দ-অপছন্দ
নাট্যদল গঠনে তিনি বেশ আগ্রহী ছিলেন। অভিনয় ছাড়াও নির্দেশনায় বেশ পটু ছিলেন। তার পছন্দ ছিল লাল চা, নাটকের আড্ডা, শিল্পকলা, ভ্রমণ, গান শোনা এবং স্বাভাবিক জীবন। আর অপছন্দ করতেন ভন্ডামী, প্রতারণা এবং অহমিকা।
তার উপদেশ-পরামর্শ
নাট্যকর্মীদের একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। নিজে টিকেট ক্রয় করে অন্য দলের নাটক দেখতে হবে। ঘরে ঘরে গিয়ে দর্শককে দাওয়াত নয় টিকেট ক্রয়ে আগ্রহী করতে হবে এবং দর্শক হলে এলে ভালো নাটক দেখাতে হবে। পন্ডশ্রম দিয়ে লাভ কি? কমিটমেন্ট ছাড়া মঞ্চ নাটক করার দরকারটা কি? কমিটেড হতে হবে, বড়দের শ্রদ্ধা করতে হবে, তা হলে শ্রদ্ধা পাওয়া যাবে। শিল্প বাঁচাতে হলে শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নাট্যকর্মে কমিটেডদের খোঁজখবর নিতে হবে। নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নারীর অভাব পূরণে উদ্যোগী হতে হবে।
তার একটি সাক্ষাৎকার
এক সাক্ষাৎকারে শাহ ফরহাদ বলেন, “নাটক একটি সুকঠিন কর্ম। যা জেনে শুনেই করতে হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে দর্শককে ফাঁকি দিয়ে মঞ্চ নাটক হবে না। দর্শক তো নেই যারা আছে তারাও যাবে, মঞ্চ হবে অন্ধকার। আমি মঞ্চ শ্রমিক, নাট্যকর্মী কাজেই মঞ্চের আলো জ্বেলে রাখার জন্য আমাদেরই দায়িত্ব বেশি। তাই বলব আগ্রহী প্রজন্মকে ত্যাগী হতে হবে। শিক্ষার সাথে সাথে নাটকের শিক্ষার জন্য নাটকের বই পড়তে হবে। কর্মশালা করতে হবে। যারা জানে তাদের উপদেশ মানতে হবে। বর্তমান নাট্যধারা পুরনো ধাঁচে নেই। অর্থশালীগণের টাকায় নিজের মেরুদন্ড বিক্রি করে সাহসী নাটক হয় না। ছাপোষা জীবন মৃতের সমান। তাই বলব, দর্শক সৃষ্টির চেষ্টায় নতুন নতুন সুন্দর সুন্দর নাটক আধুনিক মঞ্চায়ন প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করতে হবে। শুধু সংখ্যা গুনলে চলবে না, একদিকে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে যে দর্শক সৃষ্টি করেছিলাম তারা এখন নেই কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেবার মতো মানানসই সংলাপ হয়তো কারো জানা নেই। নাটক হারিয়েছে দর্শক আমাদের কারণে। আমাদের অযোগ্যতা, অক্ষমতা, অজ্ঞানতার জন্যেই এমন পরিণতি। নাটক করতে হলে নীতিনিষ্ঠ এবং আদর্শবান হতে হবে।