Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
রোহিঙ্গা ইস্যুতে লক্ষ্মীপুরে স্বেচ্ছাসেবী ও মানবাধিকার সংগঠনের মানববন্ধন  লক্ষ্মীপুরে সরকারের সাফল্য অর্জন ও উন্নয়ন ভাবনা বিষয়ক মহিলা সমাবেশ  বর্ণাঢ্য আয়োজনে লক্ষ্মীপুরে সোনাপুর ছাত্র উন্নয়ন পরিষদের ঈদ পুনর্মিলনী  শিক্ষিকাকে গণধর্ষণের প্রতিবাদে কোম্পানীগঞ্জে সহকারী শিক্ষক সমিতির মানবন্ধন  লক্ষ্মীপুরে ৪ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকার কাজের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল 

নোয়াখালীর ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান

নোয়াখালী জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। বর্তমান নোয়াখালী জেলা আগে ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং নোয়াখালী জেলা নিয়ে একটি বৃহত্তর অঞ্চল ছিল, যা এখনও বৃহত্তর নোয়াখালী নামে পরিচিত। এই জেলার ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরিঃ নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৫ সালে (বাংলা ১৩০২) নোয়াখালী পুরান শহরে। ১৯৪৪ সালে যখন নোয়াখালী পুরান শহর মেঘনার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল তখন লাইব্রেরিটি স্থানান্তরিত হয়ে নোয়াখালীর প্রধান শহর মাইজদী কোর্টে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহ্যবাহী এ লাইব্রেরিতে বর্তমানে প্রায় ২০,০০০ বই আছে। সংগ্রহ ভান্ডারে রয়েছে ব্রিটিশ ভারতের অনেক দুর্লভ বইও। শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে এ লাইব্রেরি এখনও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বসাধারণের মাঝে।
নোয়াখালী জামে মসজিদঃ নোয়াখালী শহরের প্রাণকেন্দ্রে এক অপূর্ব স্বর্গীয় ভাবাবেগ নিয়ে অবস্থান করছে মাইজদী জামে মসজিদ। প্রতিদিন শত শত ধর্মপ্রাণ মুসল্লী নিয়মিত এই মসজিদে নামাজ আদায় করেন। ১৯৪১ সালের পুরাতন নোয়াখালী শহরের মরহুম ইমাম উদ্দিন সওদাগর নিজের জমিতে জামে মসজিদটি স্থাপন করেছিলেন। মূল নোয়াখালী শহর মেঘনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবার সময় সেই মসজিদটিও নদীগর্ভে চিরতরে হারিয়ে যায়। পুরাতন নোয়াখালী শহরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবার পরে মাইজদীতে নতুন শহর গড়ার সময়েই ১৯৫০ সালে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
এই মসজিদটির মূল এলাকা প্রায় ৩ একর ৮০ ডিসিমেল। মসজিদটি তৈরির সময় ছোট এক তলা ভবনে অপরূপ মুসলিম ও দেশি লোকজ শিল্প-সৌন্দর্য লতাপাতা আর কোরআনের নানা আয়াত ও উপদেশ বাণী উৎকীর্ণ করে নির্মাণ করা হয়। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৩০ ফুট ও প্রস্থ ৮০ ফুট আয়তনে মূল ভবনে তিনটি সুদৃশ্য গম্বুজ ও নয়টি সুউচ্চ মিনার ইসলামী স্থাপত্যে নির্মিত হয়।
নিঝুম দ্বীপঃ নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালী তথা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র। নোয়াখালী জেলার দক্ষিণে মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত হাতিয়া উপজেলার সর্বদক্ষিণে নিঝুম দ্বীপের অবস্থান। ১৯৪০ এর দশকে এই দ্বীপটি বঙ্গোপসাগর হতে জেগে উঠা শুরু করে। চর গঠনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ৪০ এর দশকের শেষ দিকে নিঝুম দ্বীপ তৃণচর বা গোচারণের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। মাছ ধরতে গিয়ে হাতিয়ার জেলেরা নিঝুমদ্বীপ আবিষ্কার করে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি নিঝুমদ্বীপে জনবসতি শুরু হয়। মূলত হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়ন হতে কিছু জেলে পরিবার প্রথম নিঝুম দ্বীপে আসে। সমস্ত নিঝুম দ্বীপের প্রায় ৩০০০ একরে মানুষের বসতি রয়েছে এবং জনগণের নিকট নিঝুম দ্বীপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও হরিণ পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। উর্বর চরাঞ্চলঃ মেঘনা নদী বিধৌত নোয়াখালীতে জেগে ওঠা চরে বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ বেশ প্রশংসনীয় ও কৃষকদের সাফল্যমন্ডিত করে তুলেছে। এই সকল উর্বর চরাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের ফসলের মধ্যে মৌসুমী ফসল ও শাক-সবজি যেমন: তরমুজ, ধান, বাদাম, ডাল, আলু, ভ্ট্টুা ইত্যাদি প্রচুর উৎপন্ন হয়। কমলার দীঘিঃ কমলার দীঘি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে অবস্থিত। এ দীঘি নিয়ে অনেক পুরানা কাহিনী এ এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। দীঘির আকার ও বিশালত্ব একে অন্যরকম মর্যাদা দিয়েছে।
বজরা শাহি মসজিদঃ ৩০০ বছরের মোঘল স্থাপত্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন বজরা মসজিদ। ১৭৪১ সালে মোঘল স¤্রাট মুহাম্মদ শাহর রাজত্বকালে তাঁর নির্দেশে ও অর্থে মিয়া আন্বরের সহযোগিতায় জমিদার আমান উল্যাহ খান দিল্লির শাহি মসজিদের অনুকরণে এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। জমিদার আমান উল্যাহ তাঁর বাড়ির সম্মুখে ৩০ একর জমির উপর উঁচু পাড় যুক্ত একটি বিশাল দীঘি খনন করেন। এ দীঘির পশ্চিম পাড়ে মনোরম পরিবেশে আকর্ষণীয় তোরণ বিশিষ্ট প্রায় ১১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ৭৪ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ২০ ফুট উঁচু ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট এ ঐতিহাসিক মসজিদখানা নির্মাণ করেন। এ মসজিদকে মজবুত করার জন্য মাটির প্রায় ২০ ফুট নীচ থেকে ভিত তৈরি করা হয়। সুদৃশ্য মার্বেল পাথর দ্বারা গম্বুজগুলো সুশোভিত করা হয়। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে ৩টি ধনুকাকৃতি দরজা। মসজিদের প্রবেশ পথের উপর রয়েছে কয়েকটি গম্বুজ। কেবল দেওয়ালে ৩টি কারুকার্য খচিত মিহরাব আছে।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরঃ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যগণ কর্তৃক দানকৃত ০.২০ একর জমিতে সরকারের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে একটি সুপরিসর এবং সুসজ্জিত পাঠকক্ষ ছাড়াও অভ্যর্থনা কক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক ও লাইব্রেরিয়ানের জন্য আলাদা কক্ষ রয়েছে।
মেঘনা মোহনাঃ মেঘনা মোহনা স্থানীয়ভাবে চেয়ারম্যানঘাট নামে বহুল পরিচিত। জেলার মোট ৯টি উপজেলার একটি হাতিয়া যেখানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই মোহনার অংশবিশেষ পাড়ি দিতে হয়। এ জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালে প্রাকৃতিক পরিবেশ আর অকৃত্রিম বিশুদ্ধ বাতাসে দেহ প্রাণ যেন জুড়িয়ে যায়।
গান্ধী আশ্রমঃ ১৯৪৬ এর শেষ ভাগে সারা ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। তখন পশ্চিম বঙ্গের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব এসে পড়ে নোয়াখালীতে। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানায় সাম্প্রদায়িকতার তান্ডবলীলা দেখা দেয়। আগুনে পুড়ে যায় বহু সাজানো সংসার। শান্তি মিশনের অগ্রদূত হয়ে নোয়াখালীতে ছুটে আসেন মহাত্মা গান্ধী। চৌমুহনীতে মহাত্মা গান্ধী জনসভায় প্রথম বক্তৃতা করেন। তারপর জনসেবা করেন দত্তপাড়া গ্রামে। ধারাবাহিকভাবে চলে তাঁর পরিক্রমা। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি জয়াগ গ্রামে এসে পৌঁছেন। সেদিনই নোয়াখালী জেলার প্রথম ব্যারিস্টার জয়াগ গ্রামের কৃতী সন্তান হেমন্ত কুমার ঘোষ তাঁর জমিদারির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জনকল্যাণ খাতে ব্যয়ের উদ্দেশ্যে মহাত্মা গান্ধীর নামে উৎসর্গ করেন। আশ্রম পরিচালনার ভার দেয়া হয় গান্ধীজীর স্নেহভাজন শ্রীযুক্ত চারু চৌধুরীর ওপর।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ঃ নোয়াখালী জেলা শহর থেকে আট কিলোমিটার দক্ষিণে সোনাপুর-চরজব্বার সড়কের পশ্চিম পাশে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় অবস্থিত। দেশের একটি অন্যতম আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় ১০১ একর জায়গার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। এটি বাংলাদেশের ২৭তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫ম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে ২০০৬ সাল থেকে। শুরুতে এই বিশ^বিদ্যালয় ৪টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এখানে দশটি বিভাগ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
মহিষের দধিঃ নোয়াখালীর অনেকগুলি ঐতিহ্যের মধ্যে একটি মহিষের দধি। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও সুবর্ণচর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মহিষের দুধ দিয়ে দধি তৈরি করা হয়। উৎপাদিত মহিষের দধি খুবই সুস্বাদু এবং এই এলাকায় খুবই জনপ্রিয়। সুপারি ও নারিকেলঃ নোয়াখালী জেলার মাটি সুপারি ও নারিকেল চাষের উপযোগী, তাই প্রাচীন কাল থেকে এই এলাকায় সুপারি ও নারিকেল গাছের আধিক্য দেখা যায়। সমগ্র নোয়াখালী জেলা নারিকেল সুপারির জন্য দেশব্যাপী বিখ্যাত।