Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
সরকারের সচিব হলেন লক্ষ্মীপুরের সুসন্তান মোঃ হাবিবুর রহমান  অতিরিক্ত আইজিপি হলেন লক্ষ্মীপুরের কৃতী সন্তান মোহাম্মদ ইব্রাহীম ফাতেমী  লক্ষ্মীপুরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব দিবস পালিত  সকলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চাই -মোহাম্মদ মাসুম, ইউএনও, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা  ফেনী জেলা পরিষদ শিশু পার্ক থেকে বিমুখ স্থানীয়রা 

অশিক্ষায় বেড়ে উঠছে লক্ষ্মীপুরের মেঘনাপাড়ের শিশুরা

লক্ষ্মীপুরের মেঘনাপাড়ের শিশুরা জীবন ও বাস্তবতার তাগিদে নরম হাতে কঠিন কাজ করছে। শিক্ষা না পেয়ে তারা বেড়ে উঠছে অশিক্ষায়। কথা হয় লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বিবিরহাট গ্রামের সাত বছর বয়সি জেলে শরিফের সঙ্গে। স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু সংসারে অভাব-অনটনের কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। তার বাবা শুধু মাছ ধরার কথা বলেন, লেখাপড়ার কথা বলেন না। শরিফ দ্বিতীয় শ্রেণিতে কিছুদিন ক্লাস করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণি পাস করা হয়নি তার। এখন সে নদী ও নদীর পাড়ে থাকে। দিন-রাত জোয়ার-ভাটায় মেঘনা নদীতে জাল বেয়ে তার দিন কাটে।
রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডারে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, নদী থেকে শরিফ কাঁধে জাল নিয়ে উপরের দিকে উঠে আসছে। সে সময় নদীতে জাল টেনে মাছ ধরছিল একই এলাকার শিশু রাসেল (১২), বেলাল (১০), মিতুসহ নাম না জানা অর্ধশত শিশু।
কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা জানায়, অর্থের অভাবে লেখাপড়া করার ইচ্ছা থাকলেও তাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের ছাড়াও কথা হয় নদীতে নৌকায় থাকা রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার সেবা গ্রামের তাজল ইসলামের ছেলে আব্দুল মান্নানের সঙ্গে। মান্নানের দু’ভাই ও চার বোনসহ আট সদস্যের সংসার। চার বছর আগে থেকে সংসারের ব্যয় মেটাতে নদীতে যেতে হয় তাকে। এ কারণে রাত-দিন নদীতে কাটে তার। ওইদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৮০০ গ্রাম ওজনের মাত্র দুটি ইলিশ ধরা পড়েছে তার জালে। এ কারণে তার মন ভালো নেই। মান্নান বলে, মাছ পাইলে ভালো লাগে। না পাইলে কী করমু? সন্ধ্যায় আবার নদীতে মাছ ধরতে নামমু। হারাদিন এত কষ্ট ভালো লাগে না। তীরে ফিরে মাছ বিক্রি করা এবং দুপুরে দুমুঠো খাবারের পর আবার সন্ধ্যায় মাছ ধরার ধান্ধা মান্নানকে ভাবিয়ে রাখে সবসময়। মান্নান বলে, আমাগো জমি নাই। ধান-চাউল নাই।
পানি ছাড়া আমরা সব কিন্যা খাই। বাপ-মায় চাইর-পাঁচ বচ্ছর বয়স পর্যন্ত খাওনের পর কাম কইররা খাইতে কয়। ইশকুলে যামু আর কবে? আনন্দ-ফুরতি করমু কোনকালে? ডরাইয়া (ভয়ে) নদীতে যদি না যাই তাহেলে কী খামু? চরের সব পোলাপাইনের (ছেলেমেয়ে) জীবন এইরোমই। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর আরেক শিশু জামালের (১০) সঙ্গে দেখা হয়। সেও নদীতে মাছ ধরে বাড়ি ফিরছিল। আলেকজান্ডার গ্রামের রুস্তম আলীর ছেলে সে। বলে, আমাগো বাপ-দাদার পেশা। হেরাও ছোডকাল অইতে নদীতে মাছ ধরছে, অ্যাহন আমরাও ধরি। আমাগো গরিবের এইডাই কাম। প্যাডে মানে না এই লইগ্যা নদীর তুহান (তুফান) ডরাই না আমরা। এর আগে দুইবার নৌকা ডুবে গিয়েছিল। তখন সাঁতার কেটে বেঁচে যায় সে। স্থানীয়রা জানান, এখানকার শিশুরা ছয় থেকে সাত বছর বয়স হলে পরিবারের সহযোগী হিসেবে মাছ ধরার কাজে ঝুঁকে পড়ে। এটাই তাদের প্রধান পেশা। এছাড়া কখনও ধানের ছড়া কুড়ানো, দিনমজুরিও করতে দেখা যায় শিশুদের।
এই শিশুদের মতো রায়পুরের চরজালিয়া, চরগাসিয়া, সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাটসহ নদনদী-তীরবর্তী এলাকার সিংহভাগ শিশু নদীতে মাছধরাসহ নানা শিশুশ্রমের কাজে নিয়োজিত। মজুচৌধুরীর মেঘনা নদীতে মেয়ে-শিশুদেরও চিংড়ি ধরার কাজে দেখা গেছে। তারা জাল ফেলে মাছ ধরে তা বিক্রি করে সংসারে আয়ের জোগান দেয়।
এসব চিত্র দেখা মিললেও কথা হয় রামগতি আলেকজান্ডারের মেঘনা-তীরবর্তী চরগোসাই গ্রামের এক শিশু জেলের বাবা নিজাম উদ্দিনসহ নদী পাড়ের জেলে দিনবন্ধু জলদাস, দুর্জয় চন্দ্র দাস, ননী গোপাল জলদাস ও কারিমুল হকের সঙ্গে। তারা জানান, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ইচ্ছার কমতি নেই তাদের; কিন্তু অভাব-অনটনের কারণে তারা সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারেন না। সংসার চলা তো দূরের কথা, সপ্তাহে তিনটি কিস্তি বারশ’ থেকে তেরশ’ টাকা। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, সন্তানদের নদীতে যেতে মানা সত্ত্বেও তা তারা মানতে পারছেন না সংসারের টানাপড়েনের কারণে।
রামগতির ইউএনও এসএম শফি কামাল জানান, চরাঞ্চলের শিশুরা যাতে শিশুশ্রম থেকে বেরিয়ে এসে স্কুলমুখী হতে পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
রামগতি উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াহেদ জানান, অচিরেই শিশুশ্রম বন্ধে নদী এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অভিভাবকদের নিয়ে অবহিতকরণ সভা করা হবে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল আজিজ জানান, স্কুলে না গিয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা নদীতে মাছ ধরার কাজে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।