Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
সরকারের সচিব হলেন লক্ষ্মীপুরের সুসন্তান মোঃ হাবিবুর রহমান  অতিরিক্ত আইজিপি হলেন লক্ষ্মীপুরের কৃতী সন্তান মোহাম্মদ ইব্রাহীম ফাতেমী  লক্ষ্মীপুরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব দিবস পালিত  সকলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চাই -মোহাম্মদ মাসুম, ইউএনও, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা  ফেনী জেলা পরিষদ শিশু পার্ক থেকে বিমুখ স্থানীয়রা 

নারী-পুরুষের অসমতা হ্রাস, স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার, মানুষের সক্ষমতা
 বাড়ানোই জেমস’র লক্ষ্য -আসাদুজ জামান চৌধুরী

নন গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন (এনজিও) জেমস এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলে আসাদুজ জামান চৌধুরী বলেন আমি নিজেকে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দেখি না; নিজেকে একজন উন্নয়ন কর্মী এবং মানবাধিকার কর্মী তথা জনগণের সেবক হিসেবে দেখি। লক্ষ্মীপুর এবং নোয়াখালী জেলার হতদরিদ্র মানুষদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে জেমস সংস্থার মাধ্যমে সম্পৃক্ত হতে পেরে গর্ববোধ করছি। আল্লাহর কাছে আমি দোয়া চাই, যেন নিজেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে পারি। জেমস সংস্থায় কাজ করি বিধায় একজন রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং দাতা সংস্থার অনেক কর্মকর্তার সাথে কাজ করার সুযোগ থাকে, যা অন্য কোনো কর্মক্ষেত্রে থাকে না। তাই এ সুযোগদানের জন্য আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করি।

অন্যান্য এনজিওর তুলনায় আপনার সংস্থার কোনো বিশেষত্ব আছে কি এমন প্রশ্নের জবাবে জনকল্যাণে নিবেদিত উদার মনের অধিকারী আসাদুজ জামান চৌধুরী বলেন, আমাদের সংস্থার পুরো নাম হচ্ছে জেন্ডার এন্ড এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি (জেমস)। জেমস সংস্থা মূলত জেন্ডার এবং এনভায়রনমেন্ট এই দুইটি বিষয়কে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কাজ করে আসছে। জেমস সংস্থার লক্ষ্য হচ্ছে নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাজমান অসমতা হ্রাসকরণ, স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থায় জন-স্বাস্থ্য উন্নয়নের মাধ্যমে বঞ্চিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কার্যকরভাবে সহায়তা করা। সংস্থাটি ২০০৬ সালে সামাজিক বনবিভাগ, লক্ষ্মীপুরের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ফরেষ্ট্রি সেক্টর প্রকল্পএর আওতায় লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন বেড়িবাঁধ ও বড় বড় রাস্তাগুলোর দুই পাশে বনায়ন শুরু করে। এই বনায়ন করতে গিয়ে রাস্তা এবং বেড়ি বাঁেধর দুই পাশে হতদরিদ্র নারী-পুরুষ উভয়কে সম্পৃক্ত করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হয়। জেমস সংস্থার আরেকটি মূল বিশেষত্ব হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন, জেমস সংস্থা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে দরিদ্র মার জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান কার্যক্রমএর আওতায় লক্ষ্মীপুর জেলার মাতৃত্বকাল ভাতা-ভোগীদের ১৮টি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করে; যেমন ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি, আয়বর্ধক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ উৎসাহিতকরণ, যৌতুক, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, জন্ম নিবন্ধন, মা ও শিশুর পরিচর্যা, দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ মাতৃত্ব ও গর্ভবতী মায়ের পরিচর্যা, শিক্ষা, জেন্ডার ও নারীর অধিকার, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃদুগ্ধ পানের গুরুত্ব, খাদ্য ও পুষ্টি। তাছাড়া নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ প্রকল্প (ইউজিআইআইপি) এর আওতায় হত-দরিদ্র নারীদের দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব বিকাশসহ অসংখ্য বিষযের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। যাতে করে তারা নিজের এবং দেশের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারে।



লক্ষ্মীপুরসহ বৃহত্তর নোয়াখালীতে আপনার এনজিও এর শিক্ষা এবং সমাজসেবামূলক কোনো কার্যক্রম রয়েছে কি এমন জিজ্ঞাসায় বেসরকারি খাতে উন্নয়ন-কনসেপ্টে বিশ্বাসী সমাজসেবী আসাদুজ জামান চৌধুরী বলেন, জেমস সংস্থা নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নতিকরণ প্রকল্প (ইউজিআইআইপি) এর আওতায় ২০০৬ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম ৪টি স্কুলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে আসছে। হত-দরিদ্র পরিবারের শিশুদেরকে পড়ালেখা করানো হতো, যাতে তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে এবং কোনো শিশু যাতে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। প্রকল্পটি ২০১০ সালে শেষ হলে পরবর্তীতে জেমস সংস্থা নিজস্ব অর্থ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমটি চালিয়ে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে বিদেশি দাতা সংস্থা Ernest & Ernest Ltd T/A  হতে Pre Primary Education of Urban Slum Children in Bangladesh এই প্রকল্পের আওতায় ৪টি স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়।

দাতা সংস্থা যদি প্রকল্পের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করে, তাহলে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি চরাঞ্চলের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদেরকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব।

জেমস সংস্থা সাইট সেভার ইন্টারন্যাশনালবিসিসি প্রকল্পের আওতায় ০-১৮ বৎসরের ছানিজনিত অন্ধদের নির্বাচন করে, হতদরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেয়া হতো। এই প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর জেলা ও নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৭৫০ জন শিশুকে বিনামূল্যে অপারেশনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরেয়ে দেয়া হয়। 

হাইসাওয়া ফান্ডএর অর্থয়ানে হাইজিন, স্যানিটেশন এন্ড ওয়াটার সাপ্লাই (হাইসাওয়া) কর্মসূচিএই প্রকল্পের আওতায় লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ইছাপুর ও করপাড়া ইউনিয়নে ৬৭৮টি গভীর নলকূপ, ৫টি কমিউনিটি ল্যাট্রিন এবং দুই ইউনিয়ন করপাড়া ও ইছাপুরকে ১০০% স্যানিটেশান কভারেজ এর আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে একই প্রকল্পের আওতায় নোয়াখালী জেলায় সদর উপজেলার আন্ডারচর এবং দাদপুর ইউনিয়নে সংস্থার কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ২০১৫ সালের অক্টোবরে দাদপুর ইউনিয়কে ১০০% স্যানিটেশান কভারেজ এর আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা প্রদান করা হয়।

আপনার জন্ম-এলাকার যুবকদের বেকারত্ব দূরীকরণে আপনার এনজিওর কোনো পরিকল্পনা আছে কি এমন প্রশ্নের জবাবে সমাজকর্মী আসাদুজ জামান চৌধুরী বলেন, জেমস সংস্থায় যারা কর্মরত আছেন তাদের মধ্যে ৯০% হচ্ছেন, নোয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুর জেলার যুবক-যুবতীরা। সংস্থায় যদি ভবিষ্যতে আরো কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়, সেখানেও বৃহত্তর নোয়াখালীর যুবক-যুবতীদের অগ্রাধিকার থাকবে। জেমস সংস্থায় প্রকল্পের আওতায় যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যেমন হাঁসমুরগী পালন, শাকসব্জী চাষ, মৎস্য চাষ, গরু মোটাতাজাকরণ এবং ক্ষুদ্রব্যবসা, আর যুবতীদের সেলাই প্রশিক্ষণ, বল্ক-বাটিক, টুপি বানানো, মাসরুম চাষ এই বিষয়গুলোর ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যাতে নিজেকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে নিজের উন্নয়ন, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। ইতোমধ্যে জেমস সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন চরাঞ্চলে ছোট ছোট যৌথ খামার গড়ে তোলা হয়। বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান গড়ে তোলা এবং জেমস সংস্থায় বিভিন্ন প্রকল্পে বেকার যুবক-যুবতীদের চাকরির মাধ্যমে কিছুটা হলেও বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য পরিকল্পনা রয়েছে।

আপনার কর্মজীবনের কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে কি, যা যুব-সমাজকে অনুপ্রাণিত করবে এমন জিজ্ঞাসায় তারুণ্যদীপ্ত যুবকর্মী আসাদুজ জামান চৌধুরী বলেন, কর্মজীবনে মানুষ কী হবে, ছোট বেলা থেকে তার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বড় হতে হতে সেই স্বপ্ন বাস্তব জীবনের সাথে তেমন মেলে না। ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে গেলে কেউ বিজ্ঞান বিভাগ, কেউ মানবিক বিভাগ, আবার কেউ বাণিজ্য বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা করে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা করুক না কেন, খুব অল্প সংখ্যক মানুষের বাস্তবের সাথে মিল থাকে। আমি সমাজ বিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স, কিন্তু কখনই ভাবিনি আমি একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে এনজিও-তে কাজ করব। আমি যখন অনার্স পর্ব শেষ করি, তখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করি।

ভাবলাম বেকার না বসে একটা কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকি। এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত থেকে আজ অবধি সেই এনজিও কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত। পরিবার, সমাজ এবং নিজেও অনেকসময় ভাবি, কেন আমি এনজিও কাজের সাথে সম্পৃক্ত হলাম? উত্তরটা পেলাম এভাবেই কাজটাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। কাজটাকে আমি নিষ্ঠা, কর্মোদ্যোগ, সততা এবং বিশ্বস্ততার সাথে দেখে আসছি। তাই যুব-সমাজের কাছে আমার একটা ব্যক্তিগত আবেদন এই যে তোমরা নিজ নিজ যে কর্মই কর না কেন, যেমন চাকরি কিংবা ব্যবসা যেটাই হোক না কেন, নিজের মধ্যে নিষ্ঠা, কর্মতৎপরতা, বিশ্বস্ততা, আত্মবিশ্বাস এবং স্বচ্ছতা থাকা একান্ত প্রয়োজন। আমি যেমন সমাজ উন্নয়নে সম্পৃক্ত হয়ে এমনভাবে জড়িয়ে গেছি, যা থেকে নিজেকে আলাদা করা কঠিন এখনকার যুব-সমাজ তা অনুধাবন করতে পারবে বলে আশা করি।