Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
সরকারের সচিব হলেন লক্ষ্মীপুরের সুসন্তান মোঃ হাবিবুর রহমান  অতিরিক্ত আইজিপি হলেন লক্ষ্মীপুরের কৃতী সন্তান মোহাম্মদ ইব্রাহীম ফাতেমী  লক্ষ্মীপুরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব দিবস পালিত  সকলের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চাই -মোহাম্মদ মাসুম, ইউএনও, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা  ফেনী জেলা পরিষদ শিশু পার্ক থেকে বিমুখ স্থানীয়রা 

নোয়াখালীর উন্নয়ন ভাবনা

॥ ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ॥
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জেলা নোয়াখালীর রয়েছে সমৃদ্ধ অতীত এবং প্রাণচঞ্চল ও কর্মমুখর বর্তমান। দেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নে নোয়াখালী অব্যাহতভাবে অবদান রেখে চলছে। শুধু দেশে নয় সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নোয়াখাইল্যা বিশ্ব অর্থনীতিতেও অবদান রেখে আসছে। কিন্তু আসলেই কি নোয়াখালীর আপামর মানুষ ভালো আছে? সম্ভবত অতটা ভাল নেই। কারণ ক্রমাগতই নোয়াখালী পিছিয়ে পড়ছে দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায়। নোয়াখালীর উন্নয়নে সম্ভাব্য করণীয় সম্পর্কে আমি সংক্ষিপ্ত আলোচনার অবতারণা করব।
নোয়াখালী জেলার আয়তন ৩৬৮৫ বর্গ কিলোমিটার। প্রশাসনিক দিক থেকে এতে ৯টি উপজেলা, ৯১টি ইউনিয়ন, ৯৬৭টি গ্রাম এবং ৮টি পৌরসভা রয়েছে। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নোয়াখালীর লোক সংখ্যা প্রায় ৩১ লক্ষ ৮ হাজার। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও নোয়াখালীর মূল ভূখন্ড ক্রমাগত কৃষি জমি কমে যাওয়ার ফলে নোয়াখালীবাসীর সমস্যা আরো তীব্রতর হবে। এ প্রেক্ষিতে নিম্নলিখিত কয়েকটি ক্ষেত্রে কতিপয় পদক্ষেপের সুপারিশ করা হলো।
শিক্ষা
শিক্ষাক্ষেত্রে নোয়াখালী মোটামুটি এগিয়ে থাকলেও জেলার মূল সীমানায় যতটা না ভালো করছে তার চাইতে ভালো করছে রাজধানী ঢাকা এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামসহ অন্যান্য স্থানের শিক্ষারত শিক্ষার্থীরা। জেলায় মানসম্মত শিক্ষার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ টেক্সটাইল কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় ভাবে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক এবং উপকরণের দারুণ অভাব রয়েছে। বেগমগঞ্জ কৃষি ইনস্টিটিউট এবং টেকনিকেল স্কুলকে সামান্য একটু চেষ্টা করলেই কলেজে রূপান্তর করা যায়। ঐতিহ্যবাহী চৌমুহনী এস এ কলেজসহ জেলার অন্যান্য কলেজসমূহের জীর্ণদশা। স্কুল মাদ্রাসাগুলোর অবস্থাও তাই। এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রদক্ষেপ প্রয়োজন।
যোগাযোগ
আমি যোগাযোগ সচিব থাকাকালে বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করি। লালমাই-লাকসাম-মাইজদী সড়ককে ডাবল লেইন করা হয়। যদিও কাজটি মানসম্পন্ন হয়নি বলে আমার ধারণা। ক্রমবর্ধমান যান চলাচলের কারণে এখন সময় এসেছে এটিকে আঞ্চলিক থেকে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করা অর্থ্যাৎ চার লেইনে উন্নীত করা। একই সঙ্গে ফেনী-নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর-রায়পুর সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন। গত ২০০৬-০৭ সালে লক্ষ্মীপুর-রামগতি- নোয়াখালীর সোনাপুর-কবিরহাট তারপর ফেনী নদী হয়ে সোনাগাজী হয়ে জোরারগঞ্জ দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত একটি সড়কের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছিল। এটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যায়। চৌমুহনীর যানজট নিরসনে চার লেনের সাড়ে চার কিলোমিটার ডাবল লাইন তৈরির প্রকল্পটি এখনো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। চৌমুহনী রেলক্রসিং এর উপর একটি ফুট ওভার ব্রীজ প্রয়োজন। এছাড়া সোনাইমুড়ি রামগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ এবং অন্যান্য স্থানের ছোট ও সংকীর্ণ সড়কগুলো প্রশস্ত করা প্রয়োজন। সোনাপুর থেকে স্টিমার ঘাট পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশন থেকে অনুমোদন করা হয়েছিল। এটিকে বাস্তবায়নের দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এই রুটে অতিরিক্ত ট্রেন দেয়ার দরকার হবে।
শিল্প
সেই কবে ডেল্টা জুট মিল স্থাপিত হয়েছিল তাও প্রায়ই এটি থাকে বন্ধ। বৃহৎ শিল্প কারখানা স্থাপনে সরকার এবং স্থানীয় শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আশা প্রয়োজন। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য নোয়াখালী একটি সম্ভাবনাময় স্থান। নোয়াখালী একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে গঠিত উর্বর ভূমি। দেশের অন্যান্য জেলা থেকেও বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। চরাঞ্চলে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ জোন (ইপিজেড) গড়ে তোলা যায়। চরবাটার স্টিমার ঘাট অথবা হাতিয়ায় একটি নদী বন্দর গড়ে তোলা সম্ভব। নোয়াখালীর উদ্যোক্তা ও শিল্পপতিরা যাতে বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা পেতে পারেন সে ব্যাপারে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
পর্যটন
নোয়াখালীর উপকূলে অবস্থিত নিঝুম দ্বীপ একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এলাকা। যাকে খুব স্ন্দুর পর্যটন রিসোর্ট হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এছাড়াও অন্যান্য পর্যটন আকর্ষণীয় স্থানগুলোকে গড়ে তোলা সম্ভব।
অন্যান্য
নোয়াখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য একটি যাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগটি নেয়া হলে পরবর্তীতে সরকারি অর্থ এবং জনগণের সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে।
আমি ”কনকর্ড” কে নিয়ে এসেছিলাম বেগমগঞ্জে একটি দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় শিশুপার্ক তৈরির জন্য। কিন্তু নানা বাধায় সেটি হয়ে ওঠেনি। এখনো সম্ভবতঃ সে সুযোগটি নেয়া যায়। সরকারের অর্থমন্ত্রী বলেছেন ভবিষ্যতে জেলা ওয়ারী বাজেট প্রণয়ন ও বরাদ্দ দেয়া হবে। ভালো কথা; তবে আশংকা হচ্ছে, জনসংখ্যা অনুযায়ী বরাদ্দ না হলে নোয়াখালী বঞ্চিত হবে। দুঃখজনক হচ্ছে অভিশপ্ত কোটা প্রথার ফলে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নোয়াখালী বঞ্চিত হয়ে আসছে। এই কোটা বিলোপ না হলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি হতে আরো বঞ্চিত হতে হবে। আর উঁচু পদে নিজ জেলার কর্মকর্তা না থাকলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা পেতে সমস্যা হয়। সরকার নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলা নিয়ে নতুন বিভাগ করতে যাচ্ছেন। আশা করি, নোয়াখালী বিভাগ হবে।
পরিশেষে আবারো বলব- আসুন, আমরা যেখানেই থাকি না কেন প্রাণের টানে অতীতকে স্মরণ করে এবং ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্নের আশায় নোয়াখালীর উন্নয়নে যার যার অবস্থান থেকে যথাযথ ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। প্রত্যাশা করি বৃহত্তর কুমিল্লা ও বৃহত্তর নোয়াখালী নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে যে বিভাগ গঠিত হবে, তার নাম হবে নোয়াখালী বিভাগ।
লেখকঃ বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব