Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শফিউল বারী বাবুর ইন্তেকাল  ফেনী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আর নেই  করোনা ক্রান্তিকালে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল ও পুলিশ সুপার  এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের প্রতিবাদে কোম্পানীগঞ্জে ছাত্রদলের মানববন্ধন  ফেনী জেলা পরিষদ শিশু পার্ক থেকে বিমুখ স্থানীয়রা 

পাপুলের উত্থান যেভাবে

কুয়েতে মানব পাচারে অভিযুক্ত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের (রায়পুর-লক্ষ্মীপুর সদরের আংশিক) সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলকে ২০১৬ সালের ঈদুল আজহার আগে গ্রামের মানুষ চিনতেন না। গ্রামের বাড়ির সামনে মায়ের নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে এলাকাবাসীর নজরে আসেন তিনি। দুই হাতে দেদার বিলিয়েছেন টাকা। এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন।

শহিদ একা নন, স্বামী-স্ত্রী দুজনই সাংসদ হয়েছেন। তিনি নির্বাচিত আর তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সংরক্ষিত আসনের সাংসদ। দুজনই সাংসদ হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতার ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন মনে করছেন। শহিদ ইসলাম কুয়েতে গ্রেপ্তার হন মানব ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগে। তার আগে লক্ষ্মীপুরের মানুষ তাকে দানবীর হিসেবেই জানতেন। এলাকার লোকজন জানান, ১৯৮৯ সালে একটি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার (শ্রমিকদের তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে চাকরি নিয়ে কুয়েত যান তিনি। তখন তিনি ছিলেন অনেকটা নিঃস্ব। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখলের কারণে তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কাজী শহিদ আবার কুয়েতে যান। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেন বড় ভাই কাজী মঞ্জুরুল আলম। মঞ্জুরুল কুয়েত বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

রায়পুরের মধ্য কেরোয়া গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ শামসু বলেন, ৩০-৩২ বছর আগে গ্রাম ছাড়েন শহিদ। তখন তার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বিদেশে গিয়ে আদম ব্যবসা শুরু করার পর হঠাৎ তার উত্থান হয়েছে। এক বছর আগে গ্রামবাসীর কাছে তিনি দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সেই পরিচয় এখন আর নেই।

রায়পুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষকে চাকরি দেবেন বলে কুয়েতে পাঠানো শুরু করেন কাজী শহিদ। কুয়েতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আদম ব্যবসায় নামেন তিনি। মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপ অব কোম্পানির নামে তিনি জনশক্তি রপ্তানি শুরু করেন। একসময় এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মী ছিলেন তিনি। রায়পুর সরকারি কলেজ-সংলগ্ন তাউয়া পট্টি এলাকায় জাকির হোসেন নামের এক বৃদ্ধ একটি মসজিদ দেখিয়ে দিয়ে বলেন, সংস্কারের জন্য এমপি সাহেব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এমপি হওয়ার পর তিনি সব ভুলে গেছেন। একই এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ভোটের আগে কাজী শহিদ দুই হাতে টাকা খরচ করেছেন। আওয়ামী লীগের লোকজন বেশি সুবিধাভোগী। এলাকার কিছু ছেলেকে মোটর সাইকেলও কিনে দেন। তিনি প্রায়ই হেলিকপ্টারে চড়ে এলাকায় আসতেন।

রায়পুর পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খোকন বলেন, আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসনটি জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভোটের ৯ দিন আগে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। তখন জোট নেতাদের নির্দেশে আমরা স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী শহিদ ইসলামের জন্য কাজ করি। এমপি হওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন শহিদ। এমপি হওয়ার পর তার সঙ্গে আমাদের বনিবনা আর হচ্ছে না।

যেভাবে এমপি হলেন কাজী পাপুল ও তার স্ত্রী
দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটিয়ে নির্বাচনের মাত্র বছর দুয়েক আগে দেশে ফেরেন পাপুল। কী রাজনৈতিক অঙ্গন, কী এলাকা- কোথাও তেমন পরিচিতি ছিল না তাঁর। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়ে গেলেন তিনি। শুধু তাই নয়, তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামও সংরক্ষিত (নারী) আসনে এমপি হয়ে গেলেন। রাজনীতিতে এসেই তারা বাজিমাত করলেন। জানা যায়, ২০১৬ সালের শেষের দিকে কুয়েত প্রবাসী কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে আসেন। ওই সময়ে তিনি রায়পুর পৌর শহরের আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক জামশেদ কবির বাকি বিল্লাহের হাত ধরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সভায় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করাসহ মানব সেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার ঘোষণা দেন তিনি। পরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে ব্যাপক আর্থিক অনুদান দেয়া শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে সর্বমহলে দানবীর ও ধনকুবের হিসেবে পরিচিতি করাতে সক্ষম হন। তিনি বিভিন্ন সভায় নিজেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মালিক দাবি করে বলেন, নিতে আসিনি মানব কল্যাণে দিতে এসেছি। তার সহধর্মিণীও নিজের স্বামীর গুণের কথা তুলে ধরেন। এক সভায় তিনি বলেন, সাগরের পানি শুকিয়ে গেলেও পাপুলের টাকা শেষ হবে না। এরপর একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চান পাপুল। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। এ আসনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পাওয়া জাতীয় পার্টির তৎকালীন এমপি হঠাৎ আত্মগোপনে চলে যান। তখন অভিযোগ ওঠে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান নোমান। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থনপুষ্ট হয়ে নির্বাচনে জয় লাভ করেন পাপুল।

সংরক্ষিত (নারী) আসনে স্বতন্ত্র এমপিদের গ্রুপ থেকে শহীদ ইসলাম পাপুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। এ কোটায় তারও সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া নিশ্চিত হয়ে যায়। সেলিনার পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায়। তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।