Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

স্বাস্থ্যসেবার সকল ক্ষেত্রে নবতর মাত্রা সংযোজন করে লক্ষ্মীপুরকে দেশের শ্রেষ্ঠ মডেল জেলায় পরিণত করব ইনশাআল্লাহ -ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন

‘সকলের তরে
সকলে আমরা,
প্রত্যেকে আমরা
পরের তরে।’

কবি কামিনী রায় তাঁর কবিতায় বলেছেন, পৃথিবীতে কোনো মানুষই চিরস্থায়ী নয়। মানুষ কেবল চিরস্থায়ী থাকতে পারে তার মহৎ কর্মের মাধ্যমে। কর্মই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে দীর্ঘ সময়। যারা শুধু নিজের সুখ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তারা প্রকৃত সুখের সন্ধান পায় না। জীবনে কেউ যদি ভালো কাজ না করে, তবে সে জীবন অর্থহীন। মানবজীবন শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, সবার সুখ তার মধ্যে জড়িয়ে থাকে। অন্যের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে কাজ করার মধ্যেই আত্মা প্রকৃত অর্থে সুখী হয়। পৃথিবীতে কম সংখ্যক মানুষ আছে যারা নিজের কথা চিন্তা না করে অন্যের সুখ-শান্তি তথা কল্যাণের কথা চিন্তা করে। অপরের সুখ-শান্তির মাঝে নিজের পরম সুখের ঠিকানা খুঁজে পায়। এমনই একজন মহৎ হৃদয়ের প্রকৃত মানবকল্যাণকামী মানুষ, আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত উদারপ্রাণ চিকিৎসক লক্ষ্মীপুর জেলা বিএমএ’র সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন।

আজীবন মানবপ্রেমী চিকিৎসক ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন চিকিৎসা পেশাকে জীবনে বেছে নিয়েছেন আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য। আশৈশব তিনি একজন কোমলপ্রাণ মানবতাবাদী। মানুষের দুঃখ-কষ্টে তিনি সদাকাতর। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি অসহায় মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন প্রতিনিয়ত। পেশাজীবনে গরীব রোগীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছেন। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে যোগদানের পরে মানবসেবায় পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেছেন। বলা যায়, তাঁর জীবনে মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করার স্বর্ণদুয়ার খুলে দিয়েছে এই মহান পেশা। দুঃস্থ অসহায় মা ও শিশুদের সেবায় তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, প্রসূতি মায়েদের সেবা, নিরাপদ সন্তানপ্রসবসহ কিশোরীদের বয়োঃসন্ধিকালীন সমস্যার সমাধান এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতন করে তোলার আন্দোলনকে লক্ষ্মীপুর জেলায় বেগবান করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। সেইসাথে অসংখ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- এবং আন্দোলনে তিনি এখনো দুর্বার নেতৃত্ব প্রদান করছেন। শুধু তাই নয়, লক্ষ্মীপুর জেলার মেঘনা পাড়ের দুঃস্থ অসহায় ধীবর ও বেদে সমাজের বঞ্চিত অবহেলিত নিরক্ষর শিশুদের জন্য তিনি গড়ে তুলেছেন ‘মেঘনাপাড় ধীবর প্রাথমিক বিদ্যালয়।’ মেঘনাপাড়ের ভাঙ্গন রোধেও তিনি সদাসোচ্চার ও সদাসক্রিয়। তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছে তিনি একটি অনন্য চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন, যেখানে দুঃস্থ-অসহায় রোগীরা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবে। আজীবন মানবপ্রেমী মহৎপ্রাণ চিকিৎসক ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর বার্তা’র প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর হোসেন লিটনের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় তাঁর মহৎ জীবনের কথামালা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন। লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সম্পাদনা সহযোগী সাইফুল হকের অনুলিখনে সেই আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে অনুভূতি জানতে চাইলে ডায়নামিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন বলেন আমার অনুভূতি অবশ্যই অত্যন্ত আনন্দের ও অপরিসীম গর্বের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশ স্বাধীন করে না দিলে আমার পক্ষে কোনোদিনই এই অবস্থানে আসা সম্ভব হতো না; এ কথা বাস্তবিকভাবে সত্য। আমার বাবা ছিলেন একজন দরিদ্র স্কুলশিক্ষক। একজন দরিদ্র স্কুলশিক্ষক এবং কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও আমি আজ এ অবস্থানে আসতে পেরেছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশ স্বাধীন করে দিয়েছিলেন বলেই। তাই লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে আমার অনুভূতি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আনন্দময়, কেননা নিজের জেলার মানুষের সেবা করার সুযোগলাভ অত্যন্ত সৌভাগ্য ও গর্বের বিষয়।

অন্য অনেক পেশা থাকা সত্ত্বেও ডাক্তারি পেশাকে বেছে নিলেন কেন, এই পেশায় আসতে কারো অনুপ্রেরণা পেয়েছেন কি এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নিষ্ঠাবান ও বিচক্ষণ চিকিৎসক ডাঃ মামুন বলেন, আসলে সত্যি কথা বলতে কি আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। শিক্ষকতা একটি মহৎ পেশা। শিক্ষকগণ মানুষ গড়ার এবং সমাজ বিনির্মাণের সুমহান কারিগর। তাই আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাবা শিক্ষক হিসেবে খুব ভালো হলেও আর্থিক দিক দিয়ে তিনি ছিলেন অস্বচ্ছল। তাই তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন ডাক্তার হই। বাবা-মাসহ ভাই-বোন, আত্মীয় স্বজনরাও চেয়েছিলেন আমি যেন ডাক্তার হই; পরিবারের মধ্যে একজন নিজেদের ডাক্তার থাকুক। তাদের কথায় একসময় আমারও মনে হয়েছিল যে, আমি ডাক্তার হব। কেননা ডাক্তারি পেশায় একদিকে সৎ থেকে যেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে, তেমনি মানুষের সেবা করার অনেক সুযোগও আছে। তাই বাবা-মাসহ সবার ইচ্ছে পূরণ করতে আমি এই ডাক্তারি পেশাকে বেছে নিয়েছি।

আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনার স্বাস্থ্যসেবার মান পূর্বের তুলনায় কেমন হয়েছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যসেবার সুদক্ষ উপ-পরিচালক ডাঃ মামুন বলেন, লক্ষ্মীপুর জেলা আমার নিজ জেলা, আমার জন্মস্থান। তাই দায়-দায়িত্বটা আমার একটু বেশিই। অন্য জায়গায় যদি আমি চাকরি করতাম, তাহলে এই দায়-দায়িত্বটা হয়তো আমি একটু কমই অনুভব করতাম। কারণ ছোটবেলায় যখন আমি স্কুলে যেতাম; তখন হয়তো দৌড় দিতে গিয়ে পড়ে কোথাও ব্যথা পেয়েছিলাম। তখন এই এলাকারই কোনো মানুষ হয়তো আমাকে তুলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। ছোটবেলায় একবার সাইকেল চালাতে গিয়ে সত্যি সত্যিই পড়ে হাত ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। তখন এলাকার মানুষ আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাই এলাকার মানুষের প্রতি এখন আমারও দায়িত্ব আছে। সেই মনোভাব নিয়েই আমি এলাকার মানুষের জন্য অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি সবসময়।

তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনার স্বাস্থ্যসেবার মানউন্নয়নে উপ-পরিচালকের দায়িত্ব নেয়ার পর যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণে আমি বেশি চেষ্টা করেছি, তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধের জন্য এমডিজি পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। সেই মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধের প্রথম ও প্রধান শর্তই হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ আগে শুধু বার্থ কন্ট্রোল বা জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করতো, কিন্তু এখন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ শুধু সেই কাজেই আর আবদ্ধ নেই, মাতৃ এবং শিশুস্বাস্থ্যসহ কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও এখন আমরা দেখছি। আমরা এখন প্রত্যেকটা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে সপ্তাহের ৭ দিনই ২৪ ঘন্টা যেন প্রসবসেবা এবং গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা চালু থাকে, সেটা নিশ্চিত করছি।

তিনি বলেন এছাড়া আমরা যখন প্রসবসেবা দিই, তার পরবর্তী পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ধারণা প্রদান করি। যাতে সন্তান প্রসবের পরে বার্থ স্পেস অর্থাৎ একটি সন্তান জন্মদানের পর তিন, চার বা পাঁচ বছর বিরতি দেয়ার বিষয় নিয়ে ধারণা দেয়া হয়। যাতে সে আর অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ না করে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ১৮ বছরের আগে যাতে বিয়ে না হয়, সে লক্ষ্যে আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি। আমাদের সকল কর্মীদেরই বলা আছে যেখানে বাল্যবিবাহ, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে আমাদের জানালে আমরা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এভাবে আমরা বহু বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। আমি মনে করি, এসডিজির যে ১৭টা কম্পোনেন্ট আছে; দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধামুক্ত সমাজ, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী নাগরিক, মানসম্মত শিক্ষা, নারী পুরুষের বৈষম্য হ্রাস ইত্যাদি প্রত্যেকটা কম্পোনেন্টের সাথে আমাদের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানব সমাজের জন্য যা করা দরকার, আমরা তার সব করে যাচ্ছি। লক্ষ্মীপুরে আমাদের ৩২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, সবগুলোতেই প্রসব হয় এবং সকল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সফল প্রসব হচ্ছে। তবে কিছু কিছু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবকাঠামোর পরিস্থিতি এতই খারাপ যে, সেসকল কেন্দ্রে চিকিৎসাসেবা দেয়া খুবই কষ্টকর।

তিনি বলেন বর্তমান জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দ ইতিপূর্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সাথে আমার আলাপ হয়েছে। তিনি তাঁর পূর্ব-অভিজ্ঞতার আলোকে লক্ষ্মীপুরের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পরামর্শ ও আশ্বাস দিয়েছেন।

ডাক্তাররা সেবার চেয়ে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকেই তাদের পেশাকে দেখে থাকেন, এ অভিযোগ অনেকেরই; এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি এমন প্রশ্নের জবাবে মানবতাবাদী চিকিৎসক ডাঃ মামুন বলেন, ডাক্তাররা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপের বাসিন্দা নন, তাঁরা এ সমাজেরই অংশ। নগরীতে আগুন লাগলে দেবালয় রক্ষা পায় না। দেবালয়েও তখন আগুন লাগে। সমাজের সর্বত্রই যখন নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সেখানে শুধু ডাক্তারদের আলাদা করে দেখা সমীচীন নয়। আর সবার মূল্যবোধও সমান নয়। কাজেই সব ডাক্তারদের কাছ থেকে সবরকমের ইতিবাচক আশা করা উচিত নয়। আমরা যারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছি, মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখেছি, আমাদের মূল্যবোধ একরকম; আবার যারা মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেনি, তাদের মূল্যবোধ আরেক রকম। আমরা মানুষের দুঃখ-কষ্টে কাতর হয়ে পড়ি। আর যারা দুঃখ-কষ্ট দেখে বড় হয়নি, তারা মানুষের দুঃখ-কষ্ট কখনো উপলব্ধি করতে পারবে না; মানবিকতাকে মূল্যায়ন করতে পারবে না। তারা তখন মানবসেবার চেয়ে অর্থমূল্যকেই বেশি গুরুত্ব দেবে। আবার যিনি সেবা গ্রহণ করবেন তার আচরণও ভালো হতে হবে। আমরা নিজেদের কথা না ভেবে শুধু ডাক্তারদের কাছ থেকেই ভালো ব্যবহার আশা করি, এটা অত্যন্ত অসমীচীন।

তিনি বলেন, করোনাকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সকলে আমরা একযোগে কাজ করেছি। আমরা করোনাকালে ব্যাপকভাবে মানুষকে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসেবা দেয়ার চেষ্টা করেছি। যখন ঢাকার বড় বড় হাসপাতালে এবং জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে করোনাকালে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়নি, তখন আমরা আমাদের ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করেছি। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর সদর আসনের এমপি শাহজাহান কামাল, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র এম এ তাহের ও লক্ষ্মীপুর জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন এর সার্বিক সহযোগিতায় আমাদের লক্ষ্মীপুর জেলায় করোনাকালে প্রসবসেবাসহ মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা পূর্ণগতিতে চলমান ছিল। আমাদের প্রত্যেক চিকিৎসক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। সিভিল সার্জন মহোদয়সহ আমরা বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহের সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমরা তাঁর সর্বোত্তম স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করেছি। প্রাক্তন জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পালকেও আমরা সর্বোত্তম চিকিৎসাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করেছি। তিনি পুরো ফ্যামিলিসহ করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। আমরা সবাইকে চিকিৎসাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। করোনায় সাধারণ মানুষের সার্বিক চিকিৎসাসেবা সুনিশ্চিত করেছি।

জন্মস্থানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আপনার ব্যক্তিগত কোনো উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে কি এমন জিজ্ঞাসার জবাবে ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন বলেন, জন্মস্থানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমার অনেক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আছে। জন্মস্থানের প্রতি মমত্ববোধ মানুষের জন্মগত স্বভাব। মা-মাটি ও মানুষের জন্য টান প্রতিটি মানুষের মধ্যেই থাকে। আমারও জন্মস্থানের প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধ রয়েছে। আমি লক্ষ্মীপুরের সন্তান। লক্ষ্মীপুরের ভালো দেখলে আমার নিজেরও ভালো লাগে। তাই লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নের জন্য আমার সুদূরপ্রসারী বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে। আমার অবসরের পরে যাতে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া যায়, এমন একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আমি তৈরি করতে চাই। স্বাস্থ্যসেবা যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ খুব সহজে পায়, সে সুব্যবস্থা আমি সুনিশ্চিত করতে চাই।

তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকে। জনবল সংকট থাকে, চিকিৎসক অনুপাতে রোগীর ভিড় অনেক বেশি থাকে। সে কারণে আমি আমার জন্মস্থানে এমন একটি আধুনিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করতে চাই, যেখানে চিকিৎসাসেবার সকল সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকবে। যে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সুদক্ষ চিকিৎসক থাকবে, অত্যাধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকবে। মানুষ যেন স্বল্পমূল্যে সুউন্নত চিকিৎসাসেবা পায়, আমি সে বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে চাই। প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপে আমি এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করতে চাই। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মুসলেহ উদ্দিনের সাথে আমার আলাপ হয়েছে। তাঁর একটি এনজিও আছে। তিনি এ ধরনের একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করতে সম্মত হয়েছেন। আমরা সামান্য কিছু সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবার অনন্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে চাই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্মীপুর নদীভাঙ্গন পীড়িত এলাকা। মেঘনার পাড় প্রতিবছরই ভাঙ্গছে। মজুচৌধুরির হাটে মেঘনার পাড়ে আমাদের একটা স্কুল আছে ‘মেঘনাপাড় ধীবর প্রাথমিক বিদ্যালয়’। আমরা বেশ কয়েকজন মিলে এই মেঘনাপাড় ধীবর প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পরিচালনা করি। বর্তমানে আমি এই বিদ্যালয়ের সভাপতি। আমাকে এই বিদ্যালয়টি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা পরম শ্রদ্ধেয় উপ-সচিব শ্যামলী আপা। এই বিদ্যালয়ের সাথে জড়িত আছেন কলেজের অধ্যাপক আখতার হোসেন এবং এসেনসিয়াল ড্রাগ লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক; তাঁরা সবাই লক্ষ্মীপুরের কৃতিসন্তান। সবাই মিলে আমরা অবহেলিত জনগোষ্ঠী বেদে ও ধীবর শিশুদের জন্য এই মেঘনাপাড় ধীবর প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পরিচালনা করি। মজুচৌধুরী হাটে বেদেদের প্রায় ২০০ ফ্যামিলি আছে। এই ২০০ ফ্যামিলির প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থী মেঘনাপাড় ধীবর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে।

ছাত্র-যুব সমাজের বিপথগামিতা রোধে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে একজন ডাক্তার হিসেবে মতামত জানতে চাইলে ডাঃ মামুন বলেন, ছাত্র-যুব সমাজকে আগে নিজেদের লেখাপড়ায় মনোযোগী হতে হবে; ভালোভাবে লেখাপড়া করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তারপর মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। আমরা ছাত্রজীবনে অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- করেছি। বর্তমানের তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- করার অনেক ভালো প্রবণতা আছে। এই করোনাকালের শুরুতে তার প্রমাণও পাওয়া গেছে। অবশ্য এর উল্টোদিকও আছে। অনেক তরুণ ছাত্র-যুব সমাজ আজ বিপথগামী। এর প্রধান কারণ পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাব। মানুষ নৈতিক শিক্ষা শেখে মূলত পরিবার থেকেই। আমাদের শিক্ষক সমাজও শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে দেন। একজন মানুষ ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হলেই তার জীবন সফল হয় না। অনেক টাকার মালিক হলেও জীবন সফল হয় না। মানুষের জন্য বিশেষতঃ অসহায় আর্তমানুষের জন্য যদি সে কিছু করে যেতে পারে, তাহলেই তার জীবন সফল এবং সার্থক। সকল সার্থক মানুষই সফল কিন্তু সকল সফল মানুষই সার্থক নয়। আমি আল্লাহর কাছে হাত তুলে লক্ষ-কোটিবার দোয়া করি হে আল্লাহ, আমাকে ততদিন বাঁচিয়ে রাখেন, যতদিন আমি মানুষের জন্য সেবা করতে পারি। মানুষের জন্য কাজ না করে আমি একদিনও বেঁচে থাকার ইচ্ছে পোষণ করি না।

পরিবার পরিকল্পনা লক্ষ্মীপুর-কে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে ডাঃ মামুন বলেন আমাদের অনেক পরিকল্পনা আছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার লামচরী গ্রামে পরিবার পরিকল্পনার লক্ষ্মীপুর জেলা ও উপজেলা অফিস ভবন নির্মাণ করছি। বর্তমানে আমরা ভাড়া বাসায় থেকে পরিবার পরিকল্পনার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। আমরা যখন নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করবো, তখন স্বাস্থ্যসেবাসহ সকল ক্ষেত্রেই ব্যাপক গতি সঞ্চারিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। আমরা তখন স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে নতুন উদ্যমে কাজ করবো। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে লক্ষ্মীপুর জেলাকে দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ একটা মডেল জেলায় পরিণত করা, যাতে আমাদের অগ্রগতি একটা অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে সারাদেশে পরিগণিত হয়।

তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে লক্ষ্মীপুর জেলাকে সারাদেশে একটি মডেল জেলায় পরিণত করতে আমরা সর্বাগ্রে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেব। সেইসাথে কিশোর-কিশোরীদের বয়োঃসন্ধিকালীন সমস্যার সমাধানে বেশি গুরুত্ব দেব। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির ক্যাম্পেইন করবো। অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ রোধে কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে জন্মনিরোধক ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা ও মাতৃত্ব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আরও বেশি যতœশীল হওয়ার জন্য আমাদের স্বাস্থ্য কর্মীদের উন্নতমানের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এভাবে স্বাস্থ্যসেবার সকল ক্ষেত্রে নবতর মাত্রা সংযোজন করে লক্ষ্মীপুর জেলাকে দেশের দৃষ্টান্তমূলক সর্বশ্রেষ্ঠ একটা মডেল জেলায় পরিণত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগকে ঘিরে কোনো উন্নয়ন সম্ভাবনা আছে কি, যা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এমন জিজ্ঞাসার জবাবে লক্ষ্মীপুরের সুসন্তান ডাঃ মামুন বলেন, লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগকে ঘিরে অনেক উন্নয়ন সম্ভাবনা আছে। এখন লামচরীতে যে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, তা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের লক্ষ্মীপুর জেলার প্রধান কার্যালয় এবং উপজেলা কার্যালয়। জেলা প্রশাসন থেকে সেখানেই জমি অধিগ্রহণ করে দেয়া হয়েছে। আমরা সেখানে চারতলা বিশিষ্ট ভবন করছি। সেখানে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের লক্ষ্মীপুর জেলার প্রধান কার্যালয় ও উপজেলা কার্যালয় এবং একটি মিলনায়তন (সভাকক্ষ) থাকবে। আমাদের লক্ষ্মীপুর জেলায় ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হচ্ছে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করার। পরবর্তী সময়ে আমাদের লক্ষ্মীপুরের কৃতিসন্তান অতিরিক্ত সচিব জনাব হেলালুদ্দিন সাহেব পরিদর্শনে এলে আমরা তাঁকে বলেছি যে, ১২ তলা না হলে কেবিন করা যায় না। আমরা তাঁর কাছে ১২ তলার দাবি করেছি, তিনি তা যুক্তিসঙ্গত বলে সাথে সাথে সেই দাবি মঞ্জুর করেছেন। এই ১২ তলা ভবনটির কাজ অচিরেই সুসম্পন্ন হবে। আর তা হলে লক্ষ্মীপুর জেলায় স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা হবে বলে বিশ্বাস করি।

লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী -এই তিন জেলাকে এক চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বৃহত্তর নোয়াখালীর চৌকস ও কীর্তিমান চিকিৎসক ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন বলেন, এই তিন জেলাকে এক চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে অনেক পদক্ষেপ নেয়ার অবকাশ আছে। লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী এই তিন জেলাকে আমি কিন্তু এখনো আলাদা মনে করি না। আসলে সারা বাংলাদেশ আজও একই ছাতার নিচে আছে বলেই আমি মনে করি। তারপরও নিজ এলাকা বৃহত্তর নোয়াখালী বা লক্ষ্মীপুর জেলার সন্তান হিসেবে আমি অত্যন্ত গর্ববোধ করি। আমি আমার হোস্টেলের রুমে ‘চির উন্নত মমশির নোয়াখালীবাসী’ লিখে রেখেছিলাম। বৃহত্তর নোয়াখালীর মানুষ আসলে কোনোদিন কারো কাছে নতজানু হয় না। বৃহত্তর নোয়াখালীর মানুষ সৎ, কর্মঠ এবং প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী। সব জায়গায় ডায়নামিক নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত একটা ক্ষমতা বৃহত্তর নোয়াখালীর মানুষের আছে বলে আমি মনে করি। বৃহত্তর নোয়াখালীর অনেক প্রথিতযশা মানুষ আছেন, যাঁদের সারা দেশের মানুষ এক নামে চেনে। বৃহত্তর নোয়াখালীর অনেক মানুষ আছে, যাঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে বাংলাদেশকে পরিচালনা করেছেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আছেন বৃহত্তর নোয়াখালীর, যাদের নাম বলে শেষ করা সম্ভব হবে না। বর্তমানে বিদ্যুৎ সচিব, সেতু সচিব, এডিশনাল সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারিসহ অন্ততপক্ষে দশজনের নাম আমি বলতে পারবো, যারা বৃহত্তর নোয়াখালীর গর্বিত সুসন্তান। তাঁরা সবাই মিলে সাহায্য-সহযোগিতা করলে বৃহত্তর নোয়াখালীর ব্যাপক উন্নয়ন-অগ্রগতি সাধিত হবে। লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী- এই তিন জেলাকে এক চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে সকলকে সম্মিলিত হয়ে একযোগে বৃহত্তর নোয়াখালীর উন্নয়নে কাজ করতে হবে।