কবিতা

লাইট পোস্টের কাছে
পারভিন আক্তার

রাত্রি চিরে চিরে এই যে দাঁড়িয়ে
দহনের আলোয় নিজেকে নিঃসঙ্গ
করছো ক্ষরণ
পথচারী বিলাসে
পথ কি জানে পথিক ঠিকানা?
ঐ যে রহস্যের পাড়ে
মগ্ন আঁধার আড়ষ্ট আকাশ
মাতাল বাতাসে জোনাকীর নাচ
এলোমেলো পথ
ঝিঁঝির নূপুরে
কার গোপন নীড় মেতে ওঠে উৎসবে?
পথের দু’ধারে
এতো যে আঁধার
কৃষ্ণ-কালো নিশুতি পাথার
নৃত্যের মাদলে
কে নাচে রেশমী আঁচলে
গন্তব্য গহীন আলোর ওপারে
পথিক কি জানে পাথেয় তার?


কবিতা ঝরে বৃষ্টি ঝরে
ওমর আলী

কবিতা ঝর ঝর করে ঝরে, সাদা নুড়ির মতো
ঝর্ণা
টি এস এলিয়ট, মালার্মে, রবীন্দ্রনাথ, ওমর আলীর হাতের ওপরে কবিতা ঝরে বৃষ্টি ঝরে
কবিতা মনের মধ্যে এক খ- সীমানা চৌহদ্দির জমির ওপরে
ঝরে যায় বহুক্ষণ ঝরে যায় বৃষ্টি
ওপরে মেঘ বিজলির চমক বজ্রপাত হতে থাকে
বিরহী যক্ষ কৈলাসগিরি থেকে মেঘদূত প্রেরণ করেন প্রিয়ার উদ্দেশ্যে
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
কবিতা ঝর ঝর করে ঝরে শিশির মুক্তা হোমারের মনের ওপর
অন্ধ হোমার গেয়ে যান ইলিয়াড ও ওডিসি
সুন্দরী হেলেনকে নিয়ে যান প্যারিস প্রিয়ামের পুত্র
ট্রয়ের যুদ্ধ হয় কাঠের ঘোড়া তৈরি হয় হেক্টর মারা যান
অ্যাকিলিস মারা যান
পৃথিবী কোটি কোটি বছর ঘুরতে থাকে নিয়মমতো
এক মুহূর্তের জন্যও থামে না।
মানুষের জন্ম হয় মৃত্যু হয় কবি স্যাফোর জন্ম-মৃত্যু হয়
খলিল জিবরানের জন্ম-মৃত্যু হয়
কবিতা ঝর ঝর করে ঝরে শাদা নুড়ির মতো
ঝর্ণা
টি এস এলিয়ট, মালার্মে, র্যাঁবো, বোদলেয়র, রবীন্দ্রনাথ,
কালিদাস, ওমর আলীর হাতের ওপর
কবিতা ঝরে... বৃষ্টি ঝরে...


রোদ
তপু রায়হান

মেঝেতে মৃত বাতাসের মতো পড়ে আছে
রেওয়ারিশ রোদ
কেউ এসে কুড়িয়ে পকেটে রাখে না খুচরো
পয়সার মতন
অথচ রোদপর্ব সমাপ্তিতে আলো নিয়ে সে কি
কাড়াকাড়ি!

কে বলে বসন্তে রোদের বাজার ভীষণ সস্তা,
সহজলভ্য
কিন্তু মনে মনে শীতকাল ভাবলেই রোদের বাজার
চড়া হয়ে যায়!


ডানাঅলা কবিতা
টোকন ঠাকুর

জানা নেই, ডানা থাকলে আমি কী করতাম?

বেরিয়ে পড়বার প্রস্তুতি ছাপিয়ে ঢাকা শহরে নেমে আসত ভোর, প্ররোচক হাওয়া এসে ডাকনাম ধরে ডাকত: যা তুই... খুঁটে খুঁটে নিয়ে আয় খড়কুটো-ভালোবাসা। হঠাৎ ফিসফিসিয়ে হাওয়া হয়তো কানে কানে সেই প্রাচীন নিয়মাবলিই বলে দিত-একাকিত্বের অসুখ ভেঙে ভালো হয়ে যা। যা তুই বাবুই বংশের ছোট ছেলে হয়ে যা। ওড়াউড়ি বাদ দিয়ে বাসা বুনে বসে থাক, যা। উড়ে আসবে অন্য কেউ, বন্য ঢেউ, যা তুই তার জন্য অপেক্ষা হয়ে যা...

ডানা থাকলে সীমানা ভাঙার উৎসাহব্যঞ্জনা থাকত বেশি। একদিন, আমি হয়তো আর বাবুই থাকতাম না। হয়তো শালিক থাকতাম। এই বর্ষায় ভিজে ভিজে বৃষ্টির জলকণা দিয়েই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে টক্কর দিয়ে কবিতা লিখতাম... যদিও, শালিক কোনো কবিতাই লেখে না, কিন্তু শালিক কবিতা হয়ে তুমুল ভিজতে থাকে তরুণ কবির খাতার ভেতর, মাথার ভেতর, সে কবিতা ছাপা হতে পারে লিটল লিটল ম্যাগে, সেই ম্যাগ অনুবাদপূর্বক পড়তে পড়তে মুগ্ধ কোনো কুরঙ্গবালিকার চোখে এক ফ্রেমে চিকচিক করে ওঠা দুপুরবেলার নদী একটা গল্প হয়ে উঠত...

কিন্তু ডানা থাকলে হয়তো আমি একদিন আর শালিকও থাকতাম না। আত্মপ্রকাশের তরঙ্গে অনেক আথালি-পাথালি আর দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ সম্পর্কের অনেক টানা-হ্যাঁচড়ার একটা সফল পরিণতি হতে পারত। এই মনস্তাত্ত্বিক মেটাফর প্রযোজিত ভাবনাচিত্রে শেষ পর্যন্ত আমি ঈগল হয়ে উঠতাম কি না! চরিত্রে দস্যুবৃত্তির অভিযোগ নিতাম কিনা! বুনোপ্রাণে আমি গোত্রচ্যুত, সব সময়। নিঃসঙ্গতার আততায়ী উপস্থিতি নিয়েও তুলনামূলক দূরত্বসঞ্চারী ঈগলের চোখে এত বিষাদ কেন থাকবে -এর উত্তর লেখা থাকবে না। কোনো কবিতায়, পক্ষীগবেষণায়। মোটামুটি সব্বাই জানে ঈগলের কোনো অভিমান থাকতে পারে না, ঈগলকে এড়িয়ে গেলেই অন্যান্যের ভালো থাকা হয়। কর্নেল ঈগলকে কেউ চিঠি লেখে না। ঈগল শুধু ঈগল হয়েই ওড়ে, দূরে, ডানা থাকলে আমিও যেতাম উড়ে।

আরও কত নামহীন পাখি আছে, ডানা থাকলে আমার হয়তো কোনো নামই থাকত না, অপেক্ষা-বিষাদ দূরত্ব থাকত না...
 
 
lbheading