প্রতিবেদন

নোয়াখালীর পিঠাপুলির দশকথা

প্রাক-কথন
প্রত্যেক অঞ্চলের মানুষ কোন না কোন কাজের জন্য সুপরিচিত। কি শিল্পে, কি সাহিত্যে, কি সংস্কৃতিতে, কি ঐতিহ্যে, কি খেলাধুলায়, কি সৌন্দর্যে কোন বিশেষ এলাকার জনগোষ্ঠীর চেতনার শৈল্পিক প্রকাশকেই ঐ এলাকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে ধরে নেয়া হয়। তেমনি নোয়াখালীর মানুষের অকৃত্রিম আন্তরিকতা প্রকাশ পায় তাদের আতিথেয়তায়। নোয়াখালীবাসীর কথায়, কাজে, আচার-আচরণে এমনকি মুখের হাসিতেই ফুটে ওঠে আন্তরিকতার ও আতিথেয়তার প্রতিচ্ছবি। নোয়াখালীবাসীর অকৃত্রিম আতিথেয়তার অনেক কিংবদন্তি রয়েছে। আর তাদের আতিথেয়তার অন্যতম উপাদান বা উপকরণ হলো পিঠাপুলি।

শ্রেণীকরণ
নোয়াখালীতে প্রাপ্ত পিঠাপুলি সমূহকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা-
১) তেলে ভাজা পিঠাঃ পুলি পিঠা, পাবন পিঠা, ঝুনঝুনি পিঠা, তালের পিঠা, পানতুয়া ঝাল পিঠা, আলু পিঠা (চিপস্), সুজি পিঠা, পুয়া পিঠা ইত্যাদি।
২) তেলবিহীন পিঠাঃ সানকি পিঠা, নারিকেলের চিড়া, চিতই পিঠা, চাইন্না পিঠা, ভাপা পিঠা, খোলাজালি পিঠা, গাজরের হালুয়া, শশার মোরব্বা, পাটিসাপটা পিঠা প্রভৃতি।
৩) সিরাযুক্ত পিঠাঃ সুজি সিরা পিঠা, হাক্কন পিঠা, খেজুর রসের পায়েস (শিন্নি), চুটকি সেমাই, খান্ডা প্রভৃতি।

তেলেভাজা পিঠার বিবরণ
১) পুলি পিঠাঃ পুলি পিঠা নোয়াখালী অঞ্চলে এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী পিঠা। নারিকেল ও গুড় বা চিনির সংমিশ্রণে এক বিশেষ কায়দায় বিভিন্ন আঙ্গিকে ও নকশায় এ পিঠা তৈরি করা হয়। বিশেষ করে নতুন মেহমানদের আপ্যায়নে এ পিঠা অপরিহার্য। কনের বাড়ি থেকে এ পিঠা বরের বাড়ি পাঠাতে হয়। এই পিঠাকে আবার নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় হুলি হিডা বা হাঁচ হিজ বা নারিকেলের হিডা বলা হয়।
২) পাবন পিঠাঃ ময়দার সাথে ডিম এবং চিনি মিশিয়ে রুটির মত করে ছোট ছোট বিশেষ টুকরো করে এই পিঠা তেলে ভেজে তৈরি করা হয়।
৩) ঝুনঝুনি পিঠাঃ ময়দার কাইকে রুটি করে বিশেষ ভাজ দিয়ে তার ভিতর নারিকেল বা তিল দিয়ে তেলে ভেজে এই পিঠা তৈরি করা হয়। যেহেতু এর ভেতরের দ্রব্য নড়াচড়া করে তাই একে ঝুনঝুনি পিঠা বলা হয়।
৪) পানতুয়াঃ ডিম ভেজে তার আবরণকে ময়দার নরম কাই-এর মধ্যে কয়েকবার ছেঁকে তাকে তেলে ভেজে পানতুয়া তৈরি করা হয়।
৫) ঝাল পিঠাঃ পাতা কপি, ফুল কপি কিংবা বিভিন্ন প্রকার শাক-সব্জির সাথে ময়দার কাই দিয়ে ঝাল পিঠা তৈরি করা হয়।
৬) সুজি পিঠাঃ সুজিকে পানিতে ভিজিয়ে চিনি, ময়দা একসাথে মিশিয়ে তাকে তেলে ভেজে সুজি পিঠা তৈরি করা হয়।
৭) আলু পিঠা (চিপস্)ঃ আলুকে পাতলা পাতলা টুকরো করে তাকে সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে অতঃপর তাকে তেলে ভেজে চিপস্ তৈরি করা হয়।
৮) তালের পিঠাঃ ভাদ্রের অসহ্য গরমে পাকা তালের মৌ-মৌ লোভনীয় ঘ্রাণ ভোজন রসিককে তালের পিঠা খেতে রসিয়ে তোলে। বিশেষ কায়দায় তাল হতে রসালো অংশ বের করে তার সাথে চিনি ও ময়দা মিশিয়ে তাল পিঠা তৈরি করা হয়।
৯) পুয়া পিঠাঃ পুয়া পিঠা একটি অতি পরিচিত ও আকর্ষণীয় পিঠা। অতি সহজেই এ পিঠা তৈরি করা যায়। গ্রামের বৌ-ঝিরা অল্প সময়ে অতিথি আপ্যায়নের জন্য এ পিঠা তৈরি করে থাকে।

তেলবিহীন পিঠার বিবরণ
১) সানকি পিঠাঃ কলা পাতার মোড়কে এ পিঠা তৈরি করা হয়। শীতের সকালে খুব ভোরে উঠে এ পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা।
২) নারিকেলের চিড়াঃ নোয়াখালীর জলবায়ু নারিকেল চাষের অত্যন্ত উপযোগী। নতুন অতিথি আপ্যায়নে নারিকেলের চিড়া প্রস্তুত করা হয়। বিশেষ পারদর্শী মহিলাগণ নারিকেলের চিড়া তৈরি করেন।
৩) চিতই পিঠাঃ চাউলের গুড়ার নরম কাইয়ের সাথে ডিম মিশিয়ে তাকে এক চামচ এক চামচ করে মাটির গরম পাতিল বা খোলার ওপর দিয়ে চিতই পিঠা তৈরি করা হয়।
৪) চাইন্না পিঠাঃ নোয়াখালীর কোন কোন অঞ্চলে এ পিঠার প্রচলন খুব বেশি। হাতের তালুতে ঘঁষে ঘঁষে বড় বড় গোল গোল অনেকটা লাটিমের মত এ পিঠা তৈরি করে গরম পানিতে ভাপ দিয়ে এই পিঠা তৈরি করা হয়।
৫) ভাপা পিঠাঃ ভাপা পিঠাও নোয়াখালীর একটি অতি পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী পিঠা। চাউলের গুড়ার সাথে খেজুরের গুড় এবং নারিকেল মিশিয়ে ছোট ছোট বাটিতে রেখে বিশেষ ভাজ করে পরে গরম পানিতে ভাপ দিয়ে ভাপা পিঠা তৈরি করা হয়। শীতকালে এ পিঠা বেশি তৈরি করা হয়। এটি অত্যন্ত মজাদার পিঠা।
৬) খোলাজালি পিঠাঃ নোয়াখালী অঞ্চলে এটি অতি পরিচিত ও সুস্বাদু পিঠা। সাধারণতঃ শীতকালেই এ পিঠা তৈরি করা হয়। শীতের ভোরে খেজুর রসের সাথে নারিকেল মিশিয়ে এ পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা। উল্লেখ্য, চিতই পিঠার তুলনায় খোলাজালি পিঠা আকারে অনেকটা পাতলা। এ পিঠার পুরোটাই ছিদ্রযুক্ত, অনেকটা জালির মত।
৭) গাজরের হালুয়াঃ গাজরকে সিদ্ধ করে তার সাথে চিনি মিশিয়ে এই হালুয়া তৈরি করা হয়।
৮) শশার মোরব্বাঃ গাজরের হালুয়ার মত শশাকেও সিদ্ধ করে তার সাথে চিনি মিশিয়ে শশার মোরব্বা তৈরি করা হয়।
৯) পাটিসাপটা বা পাটিবরণ পিঠাঃ নোয়াখালীর কোন কোন অঞ্চলে এ পিঠাকে ‘হাডি বড়া হিডা’ বলা হয়। চিনিযুক্ত ময়দার কাইকে অতি অল্প তেলের কড়াইয়ে ঢেলে প্রথম চেপ্টা গোল করে তারপর এ পিঠ ও পিঠ করে অনেকটা আয়তাকার করে এই পিঠা তৈরি করা হয়।

সিরাযুক্ত পিঠার বিবরণ
১) সুজি সিরা পিঠাঃ সুজি, চিনি এবং ময়দা একসাথে মিশিয়ে তেলে ভেজে তারপর তাকে চিনির সিরার মধ্যে ঢেলে সুজি সিরা পিঠা তৈরি করা হয়।
২) হাক্কন পিঠাঃ চিতই পিঠাকে টুকরো টুকরো করে নারিকেল ও চিনির সাথে মিশিয়ে তাকে রান্না করে হাক্কন পিঠা তৈরি করা হয়। নবজাতকের জন্মের পাঁচ বা সাত দিনের মাথায় নাম রাখার সময় এই পিঠা তৈরি করে তা পাড়াপড়শির বাড়িতে পরিবেশন করা হয়।
৩) খেজুর রসের পায়েস (শিন্নি)ঃ নোয়াখালীতে এর নাম শিন্নি। সাধারণতঃ শীতকালের সকাল বেলা খেজুর রস ও চাউল দ্বারা এই শিন্নি তৈরি করা হয়। খেজুর রসের মৌ-মৌ গন্ধের সেই অপরূপ দৃশ্যের দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। গ্রামের সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছে না গ্রাম্য বধূরা। বিলুপ্ত হতে চলেছে খেজুর রসের পায়েস বা শিন্নি, গুড় এবং রস দ্বারা তৈরি বিভিন্ন উপকরণসহ পিঠা-পায়েসের আনন্দ।
৪) চুটকি পিঠাঃ কেউ কেউ এই পিঠাকে ছেঁইয়া পিঠাও বলে। এ পিঠা সবাই তৈরি করতে পারে না। বিশেষ প্রক্রিয়ায় দু’আঙ্গুলের মাঝে আটা রেখে ঘঁষা দিয়ে খুব ছোট ছোট আকারে এই পিঠা তৈরি করা হয়। এ পিঠা সাধারণতঃ রমযান মাসে তৈরি করা হয় এবং ২৭ রমযানের রাতে বা ঈদের দিন রান্না করা হয়। এ পিঠা তৈরিতে যারা পারদর্শী তাদেরকে অন্য পরিবারে নাইউর নেয়া হয়।
৫) খাডাঃ শক্ত কদু কিংবা শক্ত শশার ভিতরের অংশ ছোট ছোট টুকরা করে তার সাথে চিনি এবং নারিকেল মিশিয়ে খাডা তৈরি করা হয়।

প্রতিফলন
শীতের পিঠাপুলি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। পিঠাপুলি শুধু ভোজন বিলাসের ব্যাপার নয়, এটা আমাদের সামাজিক বন্ধনেও ভূমিকা রাখে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ায়। পিঠাকে কেন্দ্র করে চলে এক ধরনের শিল্পচর্চা। নানা আকার ও আকৃতিতে কারুকার্যময় পিঠাপুলি নোয়াখালীবাসীর সৃজনশৈলীর প্রকাশ ঘটায়। শীত মৌসুমে নোয়াখালী অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে চলে পিঠাপুলি তৈরির আয়োজন।

শেষ কথন
সংগ্রাম করে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। দরকার উদ্যম, শক্তি আর সহযোগিতা। সবার সহযোগিতাই পারে নোয়াখালীর পুরনো ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে।

-এ কে এম গিয়াস উদ্দিন মাহ্মুদ
 
     
lbheading