Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

নোয়াখালীর গৌরব ঢাকা মহানগরীর সৌরভ
নয়া মেয়র আনিসুল হক

২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৪ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন বৃহত্তর নোয়াখালীর কৃতী সন্তান, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আনিসুল হক। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নোয়াখালীর আরেক সন্তান তাবিদ আওয়াল পান ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০ ভোট।

আনিসুল হকের জন্ম ১৯৫২ সালে নোয়াখালী জেলায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর ব্যবসার মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। সফল ব্যবসায়ী ও দক্ষ সংগঠক আনিসুল হক ইতিপূর্বে বিজিএমই এর সভাপতি, এফবিসিসিআইর সভাপতি এবং সার্ক চেম্বারের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দক্ষতা ও কর্মকৌশলের কারণে সবার নজর কাড়তে সক্ষম হন।

ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। বছরে তাঁর ব্যক্তিগত আয় ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। আনিসুল হকের নিজ নামে স্থাবর সম্পদ রয়েছে ২২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৪৪ টাকা। আর অস্থাবর সম্পদ আছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ৩০ টাকা।

নির্বাচনের পূর্বে এবার সমাধানযাত্রাশীর্ষক ইশতেহারে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, আলোকিত, স্মার্ট ও মানবিক ঢাকা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন আনিসুল হক। তিনি এও বলেছিলেন নগর পিতা নয়, নাগরিকদের বন্ধু হয়ে থাকতে চাই। নগর পিতা শব্দটির মধ্যেই এক ধরনের নিঃসঙ্গ, কর্তৃত্ববাদী ইমেজ ফুটে ওঠে। মেয়র বলতে তাকেই বোঝায় যিনি নাগরিকদের হয়ে শহরে সাম্য, কল্যাণ আর ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে নিজের জয়কে নগরবাসীর প্রতি উৎসর্গ করে আনিসুল হক বলেছেন, এই জয়ের আনন্দ সবার। এ জয় ঢাকা নগরবাসীর। এই নির্বাচনে অনেক দিন পর মানুষ গণতন্ত্র প্রয়োগের শক্তি দেখিয়েছে। মানুষ তার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই কথা দিচ্ছি, কাজ করব ঢাকাবাসীর উন্নয়নে এটাই প্রধান লক্ষ্য। নির্বাচনে জয়ী হয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এমনই কথা বলছিলেন তারকা ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক।

তিনি বলেন, ভোটাররা তাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে উৎফুল্ল চিত্তে ভোট দিয়েছেন। আমি জনগণের এই রায়ের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। সবাইকে আমার সালাম জানাই। নির্বাচনের দিন যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন, তারা আমার কাছে যতটুকু মূল্যবান অন্যদিকে যারা ভোট দেননি বা ভোট দিতে আসতে পারেননি, তাদের মূল্যও আমার কাছে কম নয়। আমি নগরবাসীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি। এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমার যাত্রা শুরু। সবাইকে নিয়ে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কষ্ট করেছি। বস্তির মানুষের কাছে গিয়ে তাদের কথা শুনেছি। শুধু তাই নয়, নির্বাচনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছি। তাদের বলেছি, নির্বাচিত হলে তাদের উন্নয়নে কাজ করব। প্রকৃতপক্ষে নগরপিতা নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনের আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা হলো। নিজের জীবনের পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঢাকার মেয়র হিসেবে নগরকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, নির্বাচন পর্যন্ত এই লম্বা সফরে আমরা যারা একসঙ্গে দৌড়েছি, নগরীর উন্নয়নে ভবিষ্যতেও আপনারা আমার পাশে থাকবেন এটিই প্রত্যাশা।

নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পরিচ্ছন্ন নগর গড়ার আহ্বান জানিয়ে আনিসুল হক লেখেন আমরা যারা একটি সুন্দর ঢাকা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছিলাম, তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য পোস্টার, ব্যানার, স্টিকার স্থাপন করেছি। নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আমাদের প্রত্যয় ছিল, পরিচ্ছন্ন-সবুজ-পরিবেশবান্ধব ঢাকা। তাই যারা নির্বাচিত হয়েছি ও যারা হইনি, সবারই উচিত হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজেদের এসব ব্যানার-পোস্টার অপসারণ করা। বিশেষ করে বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই পলিথিন ব্যাগের ভেতরে ভরে পোস্টার টানিয়েছেন, জলাবদ্ধতার ঢাকায় যা খুবই বিপজ্জনক। আসুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের পোস্টার অপসারণ করার মধ্য দিয়ে আমাদের পরিচ্ছন্ন-পরিবেশবান্ধব ঢাকা গড়ার কাজে হাত দেই।

দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আনিসুল হক আরও বলেন যে অঙ্গীকার আমি নির্বাচনী ইশতেহারে দিয়েছি, এবার তা পূরণের লক্ষ্যে কাজ করব। এই রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন-সবুজ-নিরাপদ-মানবিক-আলোকিত ও স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ আমার থাকবে। তারুণ্যের জন্য কর্মমুখর ঢাকা, সচল ঢাকা আমার স্বপ্ন। আমি এমন এক ঢাকার স্বপ্ন দেখি যেখানে নাগরিক অধিকার থাকবে সর্বাগ্রে। সেখানে সাম্য আর ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হয়। যেখানে আমি আপনি আমরা সবাই মিলে একটি ঢাকা, একটি ঢাকা একটি পরিবার।

দক্ষিণ এশীয় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন সার্ক চেম্বারের সাবেক সভাপতি আনিসুল হক আরও বলেন, নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে মেয়রকে সরকারের ৫৬টি সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। সিটি করপোরেশন এবং এসব সংস্থা একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল সর্বোচ্চ নাগরিকসেবা দেয়া সম্ভব। ঢাকার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে পারব বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

আনিসুল হক বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই ঢাকার সমস্যা সমাধানে বহু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণসহ বহু নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এরপরও নগরীতে নানা সমস্যা আছে যার সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আমি এগুবো।

আনিসুল হক আরও বলেন, ঢাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত। শহরের সমস্যাগুলো আমরা সবাই কম-বেশি জানি। আমাদের জানার বাইরেও যদি কিছু থেকে থাকে, সেগুলো জানার চেষ্টা করছি। জনগণের সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে সব ধরনের সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি আমরা এমন একটি নগর   ব্যবস্থা   গড়ে   তুলতে   চাই,   যেখানে

কর্মমুখরতা-প্রাণচাঞ্চল্য থাকবে সবার ওপরে; হতাশার স্থান হবে সবার নিচে।

তিনি বলেন, নগরবাসীর দুর্ভোগ নগরবাসীকে নিয়েই তাড়াব। নাগরিকরাই আমাদের মূল শক্তি। তাদের সেবা দিতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ। ফলে দুর্ভোগ যত তীব্রই হোক, বাধা যত কঠিনই হোক;

নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাব। নগর ও নাগরিকদের কল্যাণে আমাদের সাধ্যের মধ্যে, শক্তির মধ্যে যা করণীয় তার সবটুকু করব। আশা করি, আপনারা এই শহরের দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবেন।

আনিসুল হক বলেন, আমি নাগরিকদের কথা শুনতে নগর সভা করব। মেয়রের সঙ্গে নাগরিকরা দেখা করার কিংবা কথা বলার সুযাগ না পেলে কে পাবে! নাগরিকদের সব সমস্যার সমাধান হয়তো আমার হাতে নেই, কিন্তু তাদের কথা শুনতেতো কোনো বাধা নেই।

দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক এই সভাপতি বলেন, আমি অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দিই না। বেআইনি কিছু করি না। পেশিশক্তি যাদের আছে, তাদের সাথে আমার আলাপ নেই, ঘনিষ্ঠতাও নেই। আমি কোনো মাস্তানকেও চিনি না। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে এগুলো চলবে না। দুর্নীতির সঙ্গে আমার চিরকালের শত্রুতা। এ বিষয়ে আমি কোনো আপোশ করব না; অতীতে করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। এই সিটি করপোরেশনের সব সেবামূলক পর্যায়কে দুর্নীতিমুক্ত করব।

তিনি বলেন দুর্নীতি বন্ধ করতে কর্পোরেশনের সব সেবা, দরপত্রকে পর্যায়ক্রমে ই-সেবা বা ই-টেন্ডারিংয়ের আওতায় আনা হবে। কর্পোরেশনের নেতা হিসেবে আমি নিজে দুর্নীতি না করলে অন্যরাও করতে খুব একটা সাহস পাবে না। আর জনগণের অংশগ্রহণ যত বাড়বে, ততই প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কার্যকরী, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমূলক হয়ে উঠবে।

বিতার্কিক থেকে মঞ্চ মাতানো তারকা উপস্থাপক হিসেবে খ্যাতি পাওয়া আনিসুল হক নগরবাসীর পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আরও বলেন, আমার পরিবার বা আত্মীয়স্বজন কেউ সিটি কর্পোরেশনে যাবে না এটা আমি জোর গলায় বলতে পারি। দল-মত নির্বিশেষে সবাই আমার কাছে সমান। আমি কাজে বিশ্বাসী, দলবাজি-স্বজনপ্রীতিতে নই। আমি একা কিছু করতে পারব না। আমার হাতে জাদুর কাঠি নেই, যার ছোঁয়ায় রাতারাতি এই শহর বদলে যাবে। আমি শুধু বলব, সবকিছু গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় দিতে হবে। এক্ষেত্রে নগরবাসীর সহযোগিতা খুব জরুরি। নাগরিকরা অব্যাহত সমর্থন দিলে, পাশে থাকলে অবশ্যই তাদের অনেক চাওয়া পূরণ করা সম্ভব হবে। আপনারা আমাকে সহযোগিতা করুন বন্ধুর মতো, ভাইয়ের মতো। একটু সময় দিন। আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন। আমি নিশ্চয়ই আপনাদের সবচেয়ে ভালো সেবা দিতে পারব। অন্তত ইশতেহারে যেসব অঙ্গীকার করেছিলাম, সেগুলো বাস্তবায়ন করবই ইনশাল্লাহ।

নির্বাচনী ইশতেহারে আনিসুল হক রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রচারের শুরু থেকেই তিনি বলে আসছিলেন ঢাকার সমস্যা চিহ্নিত, এখন সমাধান করতে হবে। সেই অনুসারে নির্বাচিত হওয়ার পর এখন শপথ নেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের সমাধান যাত্রা