Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

লক্ষ্মীপুরে জেলে পরিবারের জীবন-সংগ্রাম

আধুনিক যুগে মানুষ স্বপ্ন দেখে চাঁদে কিংবা বহুতল ভবনে বসবাস করার। ঠিক এ সময়েও নৌকায় বসবাস করছে এক শ্রেণির মানুষ। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর হাট ঘাট এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে ভাসমান অবস্থায় প্রায় শতাধিক জেলে পরিবার নৌকায় বসবাস করছে। নৌকাতেই জন্ম আর নৌকাতেই মৃত্যু তাদের। মাঝখানের সময়টুকুও পার করেন নৌকায়। খাওয়া-দাওয়া, বিয়ে, বাজনা সব কিছুই চলে নৌকাতেই।
এসব অসহায় জেলেরাও মানুষ, সার্বভৌম একটি স্বাধীন দেশে বসবাস করে নাগরিক হিসেবে সব রাষ্ট্রীয় অধিকার ভোগের কথা থাকলেও এ অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। ভাসমান জেলেদের বেশিরভাগেরই নাম নেই ভোটার তালিকায় কিংবা জন্মনিবন্ধন রেজিস্টারে। সরকারের একটু সহযোগিতা পেলে বদলে যেতো তাদের জীবন চিত্র। প্রকৃতি অনুকূলে থাকলেই তারা সপরিবারে ছুটে যায় মেঘনা নদীতে। মাছ শিকারের পর আবার তারা নদীর কিনারায়েই ফিরে আসে। দিনরাত নৌকা ও নদীর মধ্যে ঘরবসতি তাদের। ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রকৃতির মতো বসবাস করছে তারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, নৌকায় বসবাস হলেও বিনোদনে তাদের ঘাটতি নেই। প্রায় নৌকায় রয়েছে ব্যাটারি চালিত টেপ রেকর্ডার। আবার বহরের কয়েকটি নৌকায় সৌরবিদ্যুৎ। যার মাধ্যমে ২/৩টি লাইট জ্বালিয়ে থাকে।
ভাসমান জেলে পরিবার কল্পনার বাইরে বসবাস করে আসছে। এখানকার প্রায় সব জেলে পরিবারই জিম্মি মহাজনের কাছে। নদী থেকে ফিরে ঝুড়িভর্তি মাছ তুলে দেয়া হয় কিনারায় অপেক্ষায় থাকা মহাজনের হাতে। মহাজন বাজারে মাছ বিক্রি করেন। মাছ বিক্রির টাকা কখনো গুনে দেখেনি জেলেরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে, কয়েকজন জেলে জানান, সারাবছর মহাজন পুলিশের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করেন, যখন নদীতে মাছ থাকে না তখন মহাজন আমাদের সওদা চাল, ডাল, লবণ কিনে দেন। তাই মহাজনই আমাদের সব। বিপদের সময় বন্ধু সেজে মহাজন সওদার নামে ওই জেলেদের দাদন দিয়ে থাকেন। ওই দাদনের বিনিময়ে নিজেকে জিম্মি করেন জেলেরা। জেলে পুনর্বাসন কর্মসূচির তালিকায়ও নাম নেই ভাসমান জেলেদের। মহাজনের নির্দেশে বাধ্য হয়ে নদীতে মাছ শিকার করতে যাওয়ায় ভাসমান জেলে পরিবারের শিশুরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। নিয়মিত বাবা-মায়ের সাথে জাল টানতে সহায়তা করছে শিশুরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ শিকার করতে গিয়ে প্রায়ই জলদস্যুর হামলার শিকার হতে হয় এসব জেলেদের। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কিংবা বাল্যবিয়ে সম্পর্কে ধারণা নেই ভাসমান জেলে পরিবারগুলোর।
জেলেরা আরও জানান, মাথা গোঁজার স্থান নেই তাদের। তাই তারা ঝুঁকি নিয়ে জীবনযুদ্ধে লড়ছেন প্রতিকূল আবহাওয়ায়। নৌকায় তাদের জীবন, নৌকায় তাদের মরণ। হাসি-কান্না আর আনন্দ-বেদনা সবকিছুই ঘটে এ নৌকায়। আবার এ জেলেদের কেউ কেউ বলেন, সংসদ নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচন আসলে কদর বাড়ে তাদের, আর নির্বাচনের পর কেউ তাদের খবর রাখেন না।
এই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহকালে হঠাৎ নৌকা থেকে বেরিয়ে এলেন ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, পূর্ব পুরুষ থেকে প্রথমে ভোলা, পরে মজুচৌধুরীরহাট দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে বৃষ্টিতে ভেজা আর রোদে জ্বলা আমাগো নিত্যদিনের চিত্র এ রকমই। নদীতে মাছ ধরা, থাকা, খাওয়া, বিয়ে বাজনা সব কিছুই চলে নৌকায়।
তাদের দাবি তারাও এ স্বাধীন দেশের নাগরিক কিন্তু নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত তারা। মায়ের কোলে বেড়ে ওঠা কোমলমতি এসব শিশুর ভবিষ্যৎ রয়েছে অনিশ্চয়তায়। তাই সরকারের একটু সহযোগিতা পেলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টিতে এসব পরিবার সুন্দর জীবনযাপন করবেন -এমনই প্রত্যাশা মেঘনা পাড়ের ভাসমান জেলেদের।