Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

বৃহত্তর নোয়াখালীর গর্বিত সন্তান আমার প্রিয় শিক্ষক বোস প্রফেসর আব্দুল মতিন চৌধুরী

॥ প্রফেসর মাহফুজা খানম ॥
১৯৬৩ সাল। আইএসসি পাস করেছি ইডেন কলেজ থেকে। আব্বার ইচ্ছা Nuclear Physics নিয়ে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ করি। তখন আমার ছোট কাকুর সহপাঠী ড. মতিন চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গেই মতিন স্যার ভর্তির ফরম দিলেন, পূরণ করে রেজিস্ট্রার অফিস গিয়ে টাকা জমা দিয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগের অনার্সের ছাত্রী হলাম। সেই শুরু। মতিন স্যারের মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়েছিল। স্যারের একমাত্র কন্যা নাজমা চৌধুরী লাকী আমার ছোটবেলার অর্থাৎ স্কুলের সহপাঠী ছিল বাংলাবাজার স্কুলে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ও অর্থনীতিতে এমএ এবং আমি পদার্থবিদ্যায় এমএসসি করি।
স্যার দেখতে পোশাকে একেবারে কেতাদুরস্ত সব সময়। লম্বা, স্বাস্থ্য ভাল, দারুণ গাম্ভীর্য সম্পন্ন মানুষ। তার অফিসিয়ালি পোশাক ছিল স্যুট-টাই। এ স্যুট-টাই ছাড়া স্যারকে দেখিনি কখনও। স্যার ৩য় বর্ষে Nuclear Physics ও তখন X-ray পড়াতেন এবং এমএসসির যারা X-ray group এ কাজ করত, তাদের guide ছিলেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রফেসর ড. সত্যেন বোস যে ঘরে বসে বোস আইনস্টাইন পার্টিকেল আবিষ্কার করেছেন অর্থাৎ যে ঘরে প্রফেসর সত্যেন বোস বসতেন, সেই ঘরেই তিনি বসতেন। তাঁর হাঁটার একটা ছন্দ ছিল। ক্লাসে যখন পড়াতেন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করত। তাকে অধ্যাপক হিসেবে ও বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দেখেছি, কিন্তু কখনও উত্তেজিত হতে দেখিনি। ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী সবার কাছেই তিনি নির্ভরতার জায়গায় স্থান করে নিয়েছিলেন, কারণ ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী তাঁর কাছে যে কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে তিনি তা সাধ্যাতীতভাবে সমাধান করার চেষ্টা করতেন। ৩য় ও চতুর্থ শ্রেণির কোনো কর্মচারী আর্থিক সাহায্যের কথা বলা মাত্র পকেট থেকে মুঠো করে পকেটের যত টাকা উঠত তা দিয়ে দিতে বহুবার দেখেছি। তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের প্রভোস্ট ছিলেন, কতছাত্র যে বাড়ি থেকে টাকা আসেনি অথবা আর্থিক সমস্যার কথা স্যারকে বলে মওকুফ করিয়ে নিয়েছে, তার সংখ্যা অনেক। ষাট দশকে আমি পদার্থবিদ্যা বিভাগে ১৯৬৩-’৬৭ ছাত্র। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আমরা ছাত্রছাত্রীরা দুর্বার আন্দোলনে সম্পৃক্ত। স্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানসিক ও আর্থিক সাহায্য করেছেন। ১৯৬৬-’৬৭তে ৬ দফার আন্দোলন, আমি ‘ডাকসুর’ ভিপি, এমএসসির ছাত্রী ৬ দফা আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে ‘ডাকসুর’ এক অনবদ্য ভূমিকা ছিল। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় ছুটে বেড়িয়েছি। অসংখ্য সভা-সমাবেশ করেছি, হুলিয়া, গ্রেফতারি পরোয়ানা, কেস ইত্যাদি নিয়ে পদার্থবিদ্যার থিসিস গ্রুপে Atomic Energy Centre এ থিসিস করেছি। এ সবই করতে পেরেছি শিক্ষকদের আশীর্বাদে, সমর্থনে। অধ্যাপক মতিন চৌধুরী এই শিক্ষকদের অন্যতম। তিনি গভীর দেশপ্রেমিক এক শিক্ষক ছিলেন। স্নেহপ্রবণ, আদর্শ শিক্ষক ছিলেন তিনি।
এই উপমহাদেশে ভারতে বিজ্ঞানী সিভি রমনের পরে বিজ্ঞানে স্মরণীয় অবদান রাখার স্বীকৃতি পান পাকিস্তানের কৃতী পদার্থবিদ অধ্যাপক আব্দুস সালাম। তাঁর এই দুর্লভ সম্মান প্রাপ্তির সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের সম্পর্কসূত্র আরও নিবিড় হয়। কারণ সুইডিস বিজ্ঞান একাডেমি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের কৃতীবিজ্ঞানী বোস প্রফেসর আব্দুল মতিন চৌধুরীকে একজন সুপারিশকারী সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছিল। আর অধ্যাপক মতিন চৌধুরী সুপারিশ করেছিলেন অধ্যাপক আব্দুল সালামের নাম। সুতরাং পাকিস্তানী বিজ্ঞানীর এই দুর্লভ সম্মানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিবিড় হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর এবং একই বছর ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতার হত্যার বিরুদ্ধে এই মহান বিজ্ঞানীর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সোচ্চার হয়েছিল ফ্যাসিবাদী সামরিক স্বৈরশাসক ও হত্যার রাজনীতির প্রশ্রয়দানকারী সরকারের বিরুদ্ধে। যার জন্য পরবর্তীকালে তাঁকে দীর্ঘ ১৭ মাস কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছিল।
অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ১৯২১ সালের ১ মে লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থানার দক্ষিণ হামছাদী ইউনিয়নের নন্দনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বজলুর রহমান চৌধুরী।
ছোটবেলা থেকেই আব্দুল মতিন চৌধুরী অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১ম শ্রেণি থেকে ১০ শ্রেণি পযন্ত প্রতিটি শ্র্রেণিতেই তিনি প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে নোয়াখালীর অরুণ চন্দ্র হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বাংলা ও অসমের প্রায় ৫০ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪র্থ স্থান অধিকার করেন আব্দুল মতিন চৌধুরী। ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধা তালিকায় ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করেন। ১৯৪২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে বিএসসি অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালে এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে তৃৃতীয় স্থান অধিকার করেন। এমএসসিতে তাঁর থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থ বিজ্ঞানী অধ্যাপক সত্যেন বসু।
এমএসসি পাস করার পর আব্দুল মতিন চৌধুরী দু’টি চাকরির জন্য আবেদনপত্র পাঠান। একটি শুল্ক বিভাগের উপপ্রধান, অন্যটি উপ-ম্যাটিওরোলজিস্ট পদে। দুটিতেই মনোনীত হলেন তিনি। কিন্তু শুল্ক বিভাগে (ঘুষের ব্যাপার স্যাপার আছে বলে ঘৃণা করে সেখানে) গেলেন না। তিনি গেলেন আবহাওয়াবিদদের প্রশিক্ষণের জন্য। তারপর এলাহাবাদের বামরুলী বিমানবন্দর অফিসে যোগদান করেন। এর পরে তিনি কিছুদিন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
আব্দুল মতিন চৌধুরী সরকারী বৃত্তি নিয়ে ১৯৪৬ সালে আমেরিকা যান। সেখানে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবহাওয়া বিজ্ঞানে ১৯৪৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। শিকাগো থেকে দেশে এসে আবহাওয়া অফিসে যোগদান করেন। এরপর তিনি ১৯৫০ সালের ১ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে রিডার পদে যোগদান করেন। পরে তিনি একই বিভাগের অধ্যাপক হন এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী সরকারি বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড যান। সেখানে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেক কলেজে জে.ডি. বার্নালের অধীনে রঞ্জনরশ্মি বিষয় নিয়ে প্রায় দুই বছর গবেষণা করার পর স্বাস্থ্যগত কারণে দেশে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় অধ্যাপনায় যোগদান করেন। লন্ডনের অসমাপ্ত গবেষণাটি সমাপ্ত করে ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অত্যন্ত কৃৃতিত্বের পরিচয় দেন বিভাগীয় অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে। তাঁর সময়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ড. আব্দুল মতিন চৌধুরীই পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করেন। ঐ বিভাগে তখন বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছিল। তাঁর অনুপ্রেরণায় গবেষণার ক্ষেত্র প্রসাারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ শিক্ষাপ্রাপ্ত সুযোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তিনি সবসময় তাঁর বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের অকুণ্ঠ প্রশংসা, অকৃত্রিম স্নেহ, অসীম উৎসাহ ও আন্তরিক অনুপ্রেরণা দান করতেন। তাঁর স্নেহ আর ভালবাসার অভিব্যক্তি পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে আকর্ষণীয় পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেখানে তিনি বেশিদিন থাকতে পারেননি, পাকিস্তানী সরকারের বিরোধিতার কারণে। ১৯৬৬ সালে কুখ্যাত মোনেম খানের বিরোধিতা ও সমালোচনা করায় তাঁকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষণার চক্রান্ত শুরু হয়। তাঁর দেশত্যাগে ইচ্ছা ছিল না। তবু তাঁকে করাচী যেতে হয় এবং আণবিক শক্তি কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন ১৯৬৭ সালে। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে নিয়োজিত ছিলেন। কিছুদিন তিনি আণবিক শক্তি কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও ছিলেন।
অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান সরকারের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান নিযুক্ত হন। তিনিই প্রথম কোনো বাঙালি ঐ পদ লাভ করেন। তাও এক দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সর্বদা তিনি বিচলিত থাকতেন। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর সদর দফতরে তাঁর অফিস। তারপর তিনি বাংলাদেশে আসবেন বলে অপশন দিলেন। কিন্তু সরকার তাঁর প্রতি কড়া মনোভাব গ্রহণ করে। যার জন্য তিনি বহু কষ্ট করে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে কাবুল ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে। স্বাধীন দেশে এসে তিনি বিজ্ঞান সংস্থায় যোগ দেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৩ সালে ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। এ পদে তিনি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোস অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্যানেলে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই বছরই তিনি নোবেল কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলোশীপ লাভ করেন। তিনি নেহেরু শান্তি পুরস্কার নির্বাচনী কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি গত শতকের ষাট এবং সত্তরের দশকে বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতি, বিজ্ঞান প্রচার সমিতি, পদার্থ বিজ্ঞান সমিতি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী বিজ্ঞানীদের বহু সম্মেলন এবং বহু বৈজ্ঞানিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন দেশ-বিদেশে। উপমহাদেশের বহু পত্রপত্রিকায় এবং আমেরিকা, হল্যান্ড, সুইডেন, রাশিয়া, জার্মানীর বিভিন্ন জার্নালে তাঁর বহু মূল্যবান প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এসব প্রবন্ধ বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট অবদান রেখেছে।
অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী অধ্যাপক সত্যেন বসু, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক জে.ডি বার্নাল, নোবেল বিজয়িনী ডেউম ডরোথী হজজকীন, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক আব্দুস সালাম, এসআর খাস্তগীর প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত মনীষীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন জ্ঞান তাপস, একজন বিজ্ঞান সাধক, একজন নির্ভীক দেশপ্রেমিক। তিনি ছিলেন বুদ্ধিজীবীদের নেতা, জনগণের পথপ্রদর্শক, ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষক। আর যে বিরল গুণের জন্য তিনি সবার সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, সেটা হলো তাঁর নির্ভীক ব্যক্তিত্ব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন একজন আপোসহীন যোদ্ধা। তাই অন্যায়কারীদের হাতে তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন, কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর তাঁর ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী চক্রের আহবানে সাড়া দিয়ে অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী প্রিয় মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেননি। তিনিই বঙ্গবন্ধু পরিষদ প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। তাই তাঁর মতো গুণী শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীর ওপর নেমে আসে বিপর্যয় ও নির্যাতন। তাঁকে ভোগ করতে হয় কারা নির্যাতন। তিনি দীর্ঘ ১৭ মাস কারা নির্যাতনের পরও তাঁর আদর্শ থেকে সরে দাঁড়াননি। তিনি বার বার স্বৈরসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন। কোনো সময় তিনি সামরিক স্বৈরশাসনের কাছে মাথা নত করেননি। তাঁর এই অনমনীয় মনোভাব ও আপোসহীন সংগ্রামী চেতনা চিরদিনই অগণতান্ত্রিক সামরিক স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষকে অনুপ্রেরণা যোগাবে। ১৯৮১ সালের ২৪ জুন অনন্য প্রতিভার অধিকারী, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।