Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

ভূমিদস্যুদের দখলে নোয়াখালীর খালগুলো

দখলে-দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নোয়াখালীর খালগুলো। মেঘনা নদী ও সাগর বিধৌত নোয়াখালী অঞ্চলের ভূমি অত্যন্ত উর্বর। পানি মাটি সমৃদ্ধ ও উর্বর অঞ্চলে দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি ফসল ফলে। রাসায়নিক সারের ব্যবহারও এ অঞ্চলে অনেক কম। পূর্বে মুহুরী সেচ প্রকল্প, পশ্চিমে চাঁদপুর সেচ প্রকল্প, দক্ষিণে উপকূলীয় বাঁধ বেষ্টিত এলাকার চাষাবাদ এবং বসবাসযোগ্য ভূমির পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ একর। জলাবদ্ধতা, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস এ অঞ্চলের মানুষের অন্যতম সমস্যা। এক শ্রেণির অবিবেচক মানুষ নোয়াখালী খালসহ বিভিন্ন খালের ওপর অবৈধ দোকানঘর নির্মাণ করে দখলে নিয়েছে খালগুলো। ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা দেখা দিচ্ছে। কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে নৌপথ। অথচ গ্রামীণ অর্থনীতির সিংহভাগ দখল করে আছে এই নৌ-বাণিজ্য।
বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো অনুন্নত এবং ব্যয়বহুল। সে কারণে সর্বসাধারণ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৌপথে ভ্রমণ কিংবা পণ্যসামগ্রী পরিবহন অধিক জনপ্রিয়। নৌপথে সড়কপথ অপেক্ষা প্রায় ত্রিশ শতাংশ খরচ কম পড়ে। অন্যদিকে বর্ষাকালে গ্রামগঞ্জের জনপদ পানিতে টইটুম্বর। তাই নৌকা দিয়ে একেবারে দোরগোড়ায় চলে যাওয়া যায়। কিন্তু গত ক’বছর থেকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চৌমুহনী খাল ও বিভিন্ন খালের ওপর বিপুল সংখ্যক দোকানপাট গড়ে ওঠায় নৌযানগুলো ঘাটে ভিড়তে পারছে না। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক নৌঘাট। এখন আর চৌমুহনী বাজারের চারপাশে দেখা যায় না নৌকার সারি। এ কারণে অসংখ্য মাঝি-মাল্লা বেকার হয়ে পড়েছে। অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছে।
কেউ কেউ পৈত্রিক পেশায় টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে উদ্বাস্তের মতো দিন কাটাচ্ছে। চৌমুহনী খালের ওপর গড়ে ওঠা দোকান-পাটের কারণে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় চৌমুহনী বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক বিঘœ ঘটছে। চৌমুহনী বড় পুল এলাকাটি তিনটি খালের সংযোগস্থলে অবস্থিত। পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে চৌমুহনী-ফেনী, উত্তরে চৌমুহনী-ছাতার পাইয়া, দক্ষিণে নোয়াখালী খাল। এই তিনটি খাল হচ্ছে বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। খালের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে অসংখ্য শাখা খাল। বর্ষা মৌসুমে ফেনীসহ নোয়াখালীর পূর্বাঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের চাপ পড়ে ঐ খালগুলোর ওপর। খালগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে লক্ষ্মীপুরের রহমতখালী খালের। আবার রহমতখালী খালের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রয়েছে মেঘনার। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো অর্থাৎ ফেনী-চেীমুহনী-ছাতারপাইয়া ও চৌমুহনী-নোয়াখালী খাল ভরাট করে অবৈধভাবে দোকানপাট-বাড়িঘর গড়ে উঠেছে। ফলে ফেনী ও ছাতারপাইয়ার পানির চাপে বর্ষা মৌসুমে বেগমগঞ্জ ও সেনবাগ ডুবে যায়। ডুবে যায় হাজার হাজার একর জমির ফসল, বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট।
নোয়াখালী খাল সংস্কার ও পুনর্খনন করলে জেলার ৯০ হাজার একর জমি জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে রক্ষা পাবে এবং অতিরিক্ত ১৫ হাজার টন খাদ্য শস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। এক সময় প্রমত্তা খরস্রোতা এই খালটি বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের প্রধান দ্বার ছিল। পঞ্চাশের দশক থেকে এখানে পলিমাটি জমে এর তলদেশ ও উজানের মুখ ভরাট হয়ে যায়। ফলে আগের মতো পানি সরতে না পারায় নোয়াখালীর ব্যাপক অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। খালে পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বর্ষার পানি উপচে উঠে ব্যাপক এলাকা বন্যায় তলিয়ে যায়। আবার শুকনো মৌসুমে পানি সঙ্কটের জন্য শীতকালীন বোরো ধানের চাষ হয় না। ফলে এ অঞ্চলের মানুষজন এক সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে নিপতিত হয়েছে। অনেকেই কৃষি কাজ ছেড়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কেউ কেউ ভাগ্যান্বেষণে নিজের ভিটে-মাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। বিরাণ হয়ে পড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা।
নোয়াখালী খালের সঙ্গে প্রায় বিশটি সংযোগ খাল রয়েছে। খালগুলোর মধ্যে রয়েছে চৌমুহনী-ছাতারপাইয়া, বগাদিয়া-বসুরহাট, চৌমুহনী-নদনা, গাবুয়া-ছয়ানী, নদনা-গজারিয়া, বালুয়া-চৌমুহনী, থানারহাট-কাঁচিহাটা, থানারহাট-আমকীতুয়ী, বীরেন্দ, নোয়াখালী-মল্লিকা দীঘি, হাজিনি চৌধুরী, সেনবাগ, বজরা শখজবির ও ছাতারপাইয়া মাকিন চরা খাল। সত্তর দশকে ১৯৬১ সালে উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের আওতায় নোয়াখালী সদর, কোম্পানীগঞ্জ, বেগমগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুর জেলার বিপুল পরিমাণ জমি লবণাক্ত পানি, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষার জন্য দু’টি পোল্ডারের কাজ শেষ করা হয়। এই দুইটি পোল্ডারের মাঝামাঝি স্থানে নোয়াখালী খালটি খোলা রাখা হয়। ১৯৬৫-১৯৬৬ সালে মেঘনা ক্রস ড্যামের কাজ শেষ করা হলে বিরাট ভূখন্ড মেঘনা মোহনা থেকে জেগে ওঠে। ফলে নোয়াখালীর দক্ষিণ অঞ্চলের মানচিত্র পরিবর্তন হয় অবিশ্বাস্য রকম। জেলার আগের অবস্থায় পরিবর্তন হয়ে অনেক দূর সরে যায় এবং দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। ফলে খালে প্রতিনিয়ত পলিমাটি জমার কারণে ভাটি অংশ উজান অংশের চেয়ে উঁচু হয়ে জলাবদ্ধতা ক্রমশ দীর্ঘস্থায়ী রূপ লাভ করে। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে চৌমুহনী-চন্দ্রগঞ্জ পূর্ববাজারের খালের উপর বড় সেতুর গোড়ায় একটি ওয়াটার ড্যাম নির্মাণ করা এখন একান্ত জরুরি। এদিকে ৫৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নোয়াখালী অনেকগুলো খাল এবং ভাটা এলাকার বিভিন্ন পোল্ডারের খালগুলোর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। সুধারাম, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ এবং বেগমগঞ্জ পানি নিষ্কাশনের জন্য নোয়াখালী খালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮২-৮৩ সাল থেকে ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের অধীনে খালের কিছু অংশ পুনর্খনন করা হলেও তা মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতে পারেনি। অন্যদিকে ভাটিতে রেগুলেটর নির্মাণ না করায় পলিমাটিতে খালটি ভরাটের কারণে জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের মারাত্মক আঘাতে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বাড়ছে। জনজীবনে নেমে এসেছে এক অনাকাক্সিক্ষত দুর্যোগ। এই দুর্যোগ থেকে নোয়াখালীকে বাঁচানোর তাগিদে এবং নোয়াখালী খালের সমস্যা সমাধানের জন্য কমপক্ষে ২০ ভোল্টের একটি রেগুলেটর এবং ৩.০৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও একটি ক্লোজার ড্যাম নির্মাণ এবং কমপক্ষে ২৫৪ কিলোমিটার খাল পুনর্খনন করা অত্যাবশ্যক। এ খাল পুনর্খনন করলে ৯০ হাজার একর জমি বন্যা ও জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে রক্ষা পাবে এবং সামুদ্রিক লোনাপানি প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে প্রতিবছর নোয়াখালীতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার মেট্রিকটন খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। এছাড়াও খননকৃত খালের মাটিতে বাঁধ নির্মিত হলে বন্যার পানি থেকে ব্যাপক ফসল রক্ষা পাবে। নির্মিত বাঁধে জনগণের চলাচলের রাস্তা এবং বনাঞ্চল গড়ে উঠবে। বেকার সমস্যা সমাধান হবে। বাড়বে যোগাযোগ। দিনমজুরদের কর্মসংস্থান হবে। সাধারণ মানুষের আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। নোয়াখালীর দুঃখ নোয়াখালী খাল অভিশাপ না হয়ে জনজীবনে আশীর্বাদরূপে অবতীর্ণ হবে।
এদিকে খালের ওপর ভূমিদস্যুদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩-৮-২০১৪ তারিখের ১১১৭ নং স্মারকে নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে পত্র প্রেরণ করা হলেও তিনি কোনো কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে জেলা প্রশাসককে অবহিত করেননি। পরবর্তীতে ভূ-সম্পত্তি জবর-দখলের বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণ এবং তদন্ত কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য গঠিত জেলা কমিটির ১২ জানুয়ারির সভার কার্যবিবরণী উল্লেখ করা হয়েছে যে, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে পুনরায় সভার কার্যবিবরণীসহ উচ্ছেদের আদেশ প্রেরণ করেন। এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করায় মাসিক সভাগুলোতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক। একই সাথে উচ্ছেদ কার্যকর করার জন্য প্রতিমাসেই তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন জেলা প্রশাসক। অদ্যাবধি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী কোনো কর্ণপাত করেননি।
-কবির আহমদ ফারুক