Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

বিজয় ভাবনায় লক্ষীপুরের ব্যক্তিত্বগণ

সমগ্র জাতিই বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হয়। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অনন্য দিন। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে; মা-বোনেরা হারিয়েছে তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ- ইজ্জত-আব্রু। তবে বীর বাঙালি দমেনি, জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গেছে, তবু মাথা নোয়ায়নি। তারা ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতার লাল সূর্য, ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে রক্তে রঞ্জিত লাল-সবুজের পতাকা।
বিজয় দিবস আমাদের দেয় অফুরন্ত প্রেরণা, চলারপথের দিশা। প্রতিবছর আমরা নতুন করে শপথ গ্রহণ করি, নবচেতনায় উদ্দীপ্ত হই। প্রতিবছর বিজয় দিবসের স্মৃতি আমাদেরকে জাগিয়ে দিয়ে যায় দেশ গড়ার মহাকর্মযজ্ঞে সামিল হতে। অগণিত মানুষের রক্তদান আর শত-সহস্র মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষা করাই নয়, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত এবং বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের সারিতে স্থান করে দিতে জাতিকে আরও উদ্যোগী ও উদ্যমী হতে হবে।
বৃহত্তর নোয়াখালীর দর্পণ লক্ষ্মীপুর বার্তা বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ আয়োজন করেছে। লক্ষ্মীপুর বার্তা’র নিউজ এডিটর জাহাঙ্গীর হোসেন লিটন এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্তরের কীর্তিমানদের বিজয়ের ভাবনা জানার চেষ্টা করেন যা লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সহকারী সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তফার অনুলিখনে এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে যা জানতে চাওয়া হয়
১। বিজয় দিবসকে ঘিরে আপনার অনুভূতি জানতে চাচ্ছি।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল কী? থাকলে একটি স্মৃতির কথা বলুন?
২। যে চেতনায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল, দীর্ঘ ৪৪ বছরে সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
৩। বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হয়েছে -এ অভিযোগ অনেকের। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানাবেন কী?
৪। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যাহত হলেও বর্তমান সরকারের আমলে উন্নয়নের গতি ফিরে এসেছে
মোঃ জিল্লুর রহমান চৌধুরী
জেলা প্রশাসক, লক্ষ্মীপুর

বিজয় দিবসকে ঘিরে অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে লক্ষ্মীপুরের জনদরদী জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন আমরা মুক্ত, আমরা স্বাধীন, এ আমাদের সর্ব্বোচ্চ প্রাপ্তি। মহান বিজয় দিবসের এ মাহেন্দ্রক্ষণে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি ৩০ লক্ষ শহীদ, ২ লক্ষ মা-বোনসহ সে সব অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের এই মহান স্বাধীনতা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ৬-৭ বছর। সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারলেও এর কম্পন অনুভব করেছি। আমাদের বাড়িতে রাতে মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন। তাঁদের একজন ছিলেন আমাদের আত্মীয়। যে ঘরে তাঁরা লুকিয়ে থাকতেন, আমার মা রান্না করে তাঁদের জন্য আমাকে দিয়ে সে ঘরে খাবার পাঠাতেন। আমাকে মা বলতেন ‘এদের কথা কাউকে বলবে না’। চুপ করে খাবার দিয়ে আসতে বলতেন। বড় হয়ে বুঝেছি, তাঁরাই সম্মুখ সমরে এ দেশ স্বাধীন করেছেন। তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা।
যে চেতনায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল, দীর্ঘ ৪৪ বছরে সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে সুদক্ষ জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমি আশাবাদী মানুষ। মহান স্বাধীনতার চেতনা আমার বুকে ধারণ করি। সে চেতনা বহন করে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে অনেক অগ্রসর হয়েছে। আমরা স্বপ্ন দেখি এ দেশ একদিন সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় পরিণত হবে। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যহত হলেও বর্তমান সরকারের আমলে উন্নয়নের গতি ফিরে এসেছে, দেশ দ্রুতগতিতে উন্নয়ন-সড়কে এগিয়ে চলেছে। বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হয়েছে, এ অভিযোগ অনেকের। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানাবেন কী এমন প্রশ্নের জবাবে সমাজ সচেতন চৌকস প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, মহান স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস এ দেশের মানুষ জানেন। এটি বিকৃত করার অপচেষ্টা সবার কাছে অনাকাঙ্খিত। আমাদের সন্তানদের সঠিক ইতিহাস জানার অধিকার রয়েছে। এ অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না। ইতিহাস-সচেতন মানুষ ইতিহাসের বিকৃতি স্বীকার করবে না।
স্বধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী এমন প্রশ্নের জবাবে আশাবাদী মানুষ জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করে সত্য-ন্যায় ও সমৃদ্ধির পথে জাতি এগিয়ে চলুক; শান্তি-স্বস্তির পরিবেশ গড়ে উঠুক, দেশ মধ্যম আয়ের দেশে ও আরও এগিয়ে উন্নত দেশের সারিতে স্থান করে নিক এ কামনা করি।
যার যতটুকু অবদান, তা স্বীকার করে নিলেই ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়
চৌধুরী খোরশিদ আলম
সাবেক সংসদ সদস্য এবং লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান
বিজয় দিবসকে ঘিরে নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করে চৌধুরী খোরশিদ আলম বলেন, বিজয় দিবসকে ঘিরে সাধারণত মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়। বিজয় দিবস নতুন শপথ গ্রহণেরও দিন। কিন্তু সেই চেতনাকে ধারণ করে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছি কিনা, সেটাও ভেবে দেখতে হবে। এ দেশের মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছে, ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রক্ত দিয়েছে, লাখো মানুষ শহীদ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে; তবু মানুষ হতাশ হয়নি, প্রত্যাশা করেছে সুদিনের। আমার অনুভূতিও এর বাইরে নয়, যে রাজনৈতিক মতাদর্শেই বিশ্বাস করি না কেন, দেশকে নিয়ে আমার প্রত্যাশা অনেক বড়।
যে চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, দীর্ঘ ৪৪ বছর পর তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে চৌধুরী খোরশিদ আলম বলেন, এ ব্যাপারে সমাজে মিশ্র অভিমত রয়েছে। কেউ বলছে দেশ দ্রুতগতিতে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে; কেউ বলছে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সাধিত হয়নি, ধনী-গরিবের ব্যবধান এখনও ব্যাপক। ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেও অভিমত ব্যক্ত করা হয়। এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, সমাজে ধনিক শ্রেণির শোষণ বন্ধ হয়নি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। যে উদ্দেশ্য নিয়ে, রক্ত দিয়ে, প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন হলো; তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা দেখে বোঝার উপায় নেই।
অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছে; এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী এমন প্রশ্নের জবাবে চৌধুরী খোরশিদ আলম বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে; তিনি স্বাধীনতার স্থপতি। পাক আমলে স্বাধিকার আন্দোলনে ২৫ বছর বাঙালিরা লিপ্ত ছিল; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা দিয়েছেলেন ও, সধলড়ৎ তরধ যবৎবনু ফরপষধৎব ঃযব রহফবঢ়বহফবহপব ড়ভ ইধহমষধফবংয ড়হ নবযধষভ ড়ভ ড়ঁৎ মৎবধঃ ষবধফবৎ ইধহমধনধহফযঁ ঝযরবশ গঁলরনঁৎ জধযসধহ. জিয়ার এ ঘোষণা জনমনে আশার সঞ্চার করেছিল। এজন্য জিয়াউর রহমানকেও সম্মান ও স্বীকৃতি জানাতে হবে। দেশের জন্য জাতির জন্য যার যেটুকু অবদান, তা স্বীকার করে নিলেই আর সমস্যা থাকে না; ইতিহাস বিকৃতিও হবে না বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের প্রত্যেককে সংকীর্ণ মনোভাব ত্যাগ করে উদারচিত্ত হতে হবে।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী এমন প্রশ্নে চৌধুরী খোরশিদ আলম বলেন, মানুষের প্রত্যাশা অনেক; আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে আছে। দেশ স্বাধীন করার উদ্দেশ্যের কথাই আবার বলতে হয়। যেকোনো মূল্যে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে কিনা, ধনী-গরিবের ব্যবধান হ্রাস হবে কিনা, পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে কিনা, উন্নয়নের সুফল গরিব-দুঃখীরা ভোগ করতে পারবে কিনা এটাই চিন্তার বিষয়। তবু আমি আশাবাদী; দেশ কাঙ্খিত উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে, শ্রেণি-বৈষম্য হ্রাস পাবে, সমগ্র জাতি সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে, শান্তি-স্বস্তির সাথে সমাজে জীবনযাপন করতে পারবে এটি আমার প্রত্যাশা।
বিজয়ের অনুভূতি আমার দু’রকম; একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অপরদিকে হারানোর বেদনায় মুহ্যমান
এম আলাউদ্দীন
লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি

বিজয় দিবসের অনুভূতি সম্পর্কে এম আলাউদ্দীন বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ’৭১ সালে ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের এক পর্যায় ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর ৯৫ হাজার সশস্ত্র সদস্য অস্ত্র সংবরণ করে। তারা ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার ল্যাঃ জেঃ এ এ কে নিয়াজীর নেতৃত্বে মিত্র বাহিনী ও মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার লেঃ জেঃ অরোবার নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে আমাদের অর্জিত হয় কাক্সিক্ষত বিজয়। এতে আমরা আনন্দিত ও উদ্বেলিত। অপরদিকে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মউৎসর্গ, ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে এবং ৭ কোটি বাঙালির অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার কষ্টে মর্মাহত। অর্থাৎ একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অপরদিকে হারানোর বেদনায় আমরা মর্মাহত।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্ট ছিলাম। অনেকগুলো স্মৃতির মধ্যে একটি মর্মান্তিক স্মৃতির কথা মনে পড়ে, তা হলো ’৭১ এর ডিসেম্বরের ৫ তারিখ, ছোত্তাখোলা ক্যাম্প থেকে আমিসহ ৮/১০ জন মুক্তিযোদ্ধা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন মিশ্র এর নেতৃত্বে একটি গাড়িতে সামরিক বাহিনীর রসদাদি বহন করে ফেনী জেলার পরশুরাম থানার বিলোনিয়া সীমান্তের নিকট গিয়ে বেলা ২ টায় পৌঁছি। ৩টার সময় পাক বিমান বাহিনী পরশুরাম থানার বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি বিমান হামলা চালিয়ে এয়ার শেলিং করে। এসময় এয়ার শেলিং এ ক্যাপ্টেন মিশ্র আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। বিকাল ৪ টার দিকে এয়ার শেলিং বন্ধ হয় এবং হানাদার বাহিনীর বিমান তাদের গন্তব্যে চলে যায়। আমি ও আমার সাথীগণ ক্যাপ্টেন মিশ্র এর ইউনিফর্ম পরা লাশ দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি। আর স্মরণ করি ভারতীয় যে সামরিক অফিসার আমাদেরকে ক্যাম্প থেকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে এনেছিল, সে ক্যাপ্টেন মিশ্র আর নেই। যুদ্ধের পরবর্তীতে জানতে পারি, ক্যাপ্টেন মিশ্রের মতো ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৪ হাজার অফিসার ও জোয়ান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছিল।
’৭৫ এর পর সামরিক স্বৈরসরকার বারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতার চেতনায় বাংলাদেশ গড়তে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা, সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করে স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধের কাক্সিক্ষত বাস্তবায়নে অনেকটা এগিয়ে গেছেন।
’৭৫ এর মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের পর যেসকল সামরিক সরকার ও তাদের দোসররা ক্ষমতায় এসেছিল তারাই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করেছে, যা ক্ষমার অযোগ্য। স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হলে স্বাধীনতার পক্ষে সার্বজনীন ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়তে হলে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, নিরক্ষরমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাস ও গুপ্তহত্যামুক্ত একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধী মানবতা বিরোধী, ’৭৫ এর বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকারী, ২০০৪ এর গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচার করে ফাঁসির দন্ডাদেশ কার্যকর করতে হবে এবং বাংলাদেশকে কলংকমুক্ত করতে হবে।
বিজয় দিবস একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে বেদনার; কারণ এ দিনকে অর্জনের জন্য আমাদেরকে বিশাল আত্মত্যাগ করতে হয়েছে
মোঃ আবু তাহের
মেয়র, লক্ষ্মীপুর পৌরসভা

বিজয় দিবসের অনুভূতি ব্যক্ত করে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র মোঃ আবু তাহের বলেন বিজয় দিবস একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে বেদনার দিন। কারণ এ দিনকে অর্জন করার জন্য আমাদেরকে বিশাল আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। অনেক তরুণ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে আবু তাহের বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ৩ মাস ভারতে ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরে অন্যান্য সাথীদের নিয়ে কোম্পানিগঞ্জে দখলদার পাঞ্জাবী সৈন্যদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছি। এরপর শাহপুর, রামগঞ্জ এবং রায়পুরেও হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর মোকাবেলা করি। লক্ষ্মীপুর শত্রুমুক্ত হবার ৩ দিন আগেই আমরা চন্দ্রগঞ্জ দখলমুক্ত করেছি। সেখান থেকে নোয়াখালীর তৎকালীন মুজিব বাহিনী প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েত ভাই খবর পাঠালেন যে, নোয়াখালী কেন্দ্র এখনও শত্রুমুক্ত হয়নি। তাদেরকে মোকাবেলা করার দায়িত্ব যাদের দেয়া হয়, আমিও তাদের মধ্যে ছিলাম। আমরা দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ করে বেগমগঞ্জ মুক্তি করি এবং নোয়াখালী ফিরে আসি। বিজয়ের দু’দিন পর লক্ষ্মীপুরে এসে বাবা-মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করি। কোনোদিন ভাবিনি, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারব। তবে এ বিশ্বাস ছিল যে যতদিনই লাগুক, বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা এখানে উড়বেই!
যে চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের বলেন, স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে ৩ বছর পর দেশি-বিদেশি কুচক্রি মহল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশের অগ্রগতি নস্যাত করে, উন্নয়নের চাকা ঘুরিয়ে দেয় পেছনের দিকে। ক্ষমতালোভী, উচ্চাভিলাষী কিছু সামরিক অফিসার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে ভেবেছিল যে, আওয়ামীলীগ আর কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে গণতন্ত্রের সংগ্রামে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অচিরেই দেশে স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়িত হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
স্বাধীনতার ইতিহাস-বিকৃতি সম্পর্কে নিজ মতামত ব্যক্ত করে এম এ তাহের বলেন যিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন, সেই জিয়াউর রহমান নিজেই বলেননি, তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। পরবর্তীতে কিছু অতিউৎসাহী লোক তাঁকে ঘোষক বানিয়েছেন। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের কাছে প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের বলেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দারিদ্র্য বিমোচন করতে যাচ্ছেন, বাংলাদেশকে রাইজিং টাইগার হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত করতে আন্তরিকভাবে নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের সারিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা দেশনেত্রী শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়াব, তাঁর ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে জীবনের ঝুঁকি আসলেও তা উপেক্ষা করব।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন
প্রফেসর মাহবুব মোহাম্মদ আলী
অধ্যক্ষ, অক্সফোর্ড মডেল কলেজ, লক্ষ্মীপুর

বিজয় দিবসকে ঘিরে অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে প্রফেসর মাহবুব মোহাম্মদ আলী বলেন, অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয় দিবসে সবার মনে আনন্দ জাগে। এ দিনটি জাতির জীবনে গর্ব ও গৌরবের। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখা যায় এতে মনে হয়, বিজয় দিবসে মানুষ প্রাণ খুলে মনের কথা প্রকাশ করতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক মুক্তিও প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ্বঅঙ্গনে বাংলাদেশকে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করা। সেটা পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি বলে মনে আনন্দের স্ফুরণ নেই।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি করেছে সন্দেহ নেই; কিন্তু সমাজে যেভাবে হানাহানি হত্যা, জঙ্গি তৎপরতা চলছে; তাতে মনে স্বস্তি লাভ করা যায় না। মানুষ শংকামুক্ত হয়ে শান্তিতে ঘুমাতে চায়, নিরাপত্তার সেই নিশ্চয়তা কি তারা পেয়েছে? বিজয় দিবসে এটিও আমাদের মনে রাখা উচিত। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রফেসর মাহবুব মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনোটাতেই ভূমিকা রাখার আমার সুযোগ হয়নি। আমি সেসময় সরকারি চাকরিতে চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। আমার বয়সের কাছাকাছি বড় ভাই খালেদ মোহাম্মদ আলী পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এম এন এ) ছিলেন। এজন্য আমাদের বাড়িঘর, সহায়-সম্পদ সবকিছু পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর, আল-শামস্, রাজাকার ও জামায়াতিরা ধ্বংস করে দিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে অন্যকোনো দিকে যাওয়া বা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। শুধুমাত্র ছাত্র-ছাত্রী, তরুণদের উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা ছাড়া আমার পক্ষে বিশেষ কোনো কাজ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
যে চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নে শিক্ষাবিদ মাহবুব মোহাম্মদ আলী বলেন, বঙ্গবন্ধু যে উদ্দেশ্য-আদর্শ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন -তা বাস্তবায়ন করতে আমরা এখনও পারিনি। জাতীয় জীবনে যে বিভাজন চলছে, তার পেছনে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে; তা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তাদের মত প্রতিষ্ঠা বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সহিংসতার আশ্রয় নিতে হবে।
স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে দূরদর্শী শিক্ষাবিদ প্রফেসর মাহবুব মোহাম্মদ আলী বলেন স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৩ বছরে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় ছিল, তাদের মধ্যে ইতিহাস বিকৃতির একটি মানসিকতা লক্ষ্য করা গেছে। এ ধরনের কর্মকান্ড দুর্ভাগ্যজনক, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের মধ্যে দেশের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রবণতা দেখা গেছে। ইতিহাসবিদদের সত্য ইতিহাস রচনায় এগিয়ে আসতে হবে।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে মাহবুব মোহাম্মদ আলী বলেন, রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রত্যাশা একটিই দেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে শুধু শক্তিশালীকরণ নয়, একে একটি মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে উন্নত বিশ্বের সারিতে নিয়ে যাওয়া। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও আমরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে যেখানে প্রয়োজন সেখানে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলব।
শিক্ষা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি শাখায় আজ ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে
প্রফেসর মোহাম্মদ সোলায়মান
অধ্যক্ষ, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ, লক্ষ্মীপুর

কবির ভাষায় বলতে গেলে ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়’। আসলে বিজয় দিবসের অনুভূতি ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। আজকে বাংলার নীল আকাশে দিগন্ত প্লাবিত আমরা মুক্ত মনে উড়ে বেড়াই। স্বাধীনতার তৃপ্তিই আলাদা। আজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি ত্রিশ লক্ষ শহীদকে, যাঁরা তাঁদের সর্বাধিক প্রিয় জীবনকে উৎসর্গ করেছেন লাল সবুজের পতাকা অর্জনের জন্য। বিশেষ করে স্মরণে পড়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের; যাঁরা স্বাধীনতার উষালগ্নে বর্বর আলবদর, আলশাম্সদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। অবনত মস্তকে স্মরণ করি বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের জনক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে; যাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁরই তনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নানাবিধ কারণে দীর্ঘ ৪৪ বছর আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি এ কথা সত্য। তবে অনেক দূর এগিয়েছি, এগিয়ে যাব এ কথা অনস্বীকার্য। আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, চাল রপ্তানি করছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার, মাথাপিছু আয় ১১২৫ মার্কিন ডলার, সুপেয় পানি ব্যবহারকারী মোট জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশ, বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৩০০০ মেগাওয়াট, জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়মিতভাবে ৬.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশ যা যুক্তরাষ্ট্র, চীনের প্রবৃদ্ধির কাছাকাছি। শিশু মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে আশাব্যঞ্জকভাবে। ঘোষিত এমডিজির প্রায় সকল লক্ষ্যই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পূরণ হয়েছে, চরম দারিদ্র্যের হার কমে বর্তমানে ১৫ শতাংশ, শিক্ষা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি শাখায় আজ ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে। ইতোমধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।মধ্যেম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। আমি মনে করি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দুর্নীতিরোধ করতে পারলে সেদিন বেশি দূরে নয় বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা।
দলকানা, স্বার্থান্ধ লোকদের কলমের নির্মম, নিষ্ঠুর আঘাতে স্বাধীনতার ইতিহাস ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে এ ব্যাপারে সন্দিহান করে ফেলা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মোটামুটি আশার আলো দেখাচ্ছে হাসান হাফিজুর রহমান রচিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র (১ম থেকে ১৫ তম খন্ড) এবং বঙ্গবন্ধুর ‘‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’’। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী লিখিত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, একটি যুগান্তকারী বই হিসাবে আমার লেখাও স্থান পেয়েছে। প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে আবশ্যিকভাবে পড়তে হয়।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে আমার অকৃত্রিম আশা ও প্রত্যাশা হলো বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যেন সমৃদ্ধি লাভ করে। বাংলাদেশ যে মুক্তিযুুদ্ধের মৌলিক চেতনায় প্রোজ্জ্বল হয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে পৃথিবীতে যেন নেতৃত্ব দেয়। তাহলে নিঃসন্দেহে অচিরেই বাংলাদেশে হবে বিশ্বকবির ‘সোনার বাংলা’ নজরুলের ‘বাংলাদেশ’, জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’ রূপের যে তার নেইকো শেষ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি উন্নত রাষ্ট্র এবং একটি আলোকিত জাতি গঠন হবে এতে সন্দেহ নেই
এড. মোঃ নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন
সাধারণ সম্পাদক, লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগ

বিজয় দিবসকে ঘিরে অনুভূতি ব্যক্ত করে এডভোকেট মোঃ নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস বাঙালি জাতির গর্ব ও গৌরবের দিন। অপরিসীম ত্যাগ, আত্মদান, ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে জাতি বিজয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়েছে। ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মদান, ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল; এজন্য সকল বেদনা, দুঃখকষ্ট অতিক্রম করে জাতির কাছে দিনটি আনন্দের, গৌরবের, গর্বের, উজ্জীবনের দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৬ ডিসেম্বরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সারাদেশে জাতি বিজয় দিবস উদযাপন করে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সকল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এ দিবসের আনন্দে অংশীদার হয়।
তিনি বলেন, বিজয় দিবস জাতির জীবনে স্থায়ী আসন লাভ করবে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে বিজয় দিবসের আনন্দ-উচ্ছ্বাস বজায় থাকবে, উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমার বয়স ছিল ৪ বছর। পরবর্তীতে জেনেছি চরমন্ডলে আমাদের গ্রামের বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পারিবারিকভাবে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। আমরা তাদেরকে খাদ্য, আশ্রয়, নৈতিক সমর্থন দিয়েছি। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, দীর্ঘ এতদিনে তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, দীর্ঘ ৪৪ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি। এর কারণ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর যারা ক্ষমতায় আসে, তারা এ চেতনার বিরোধী ছিল। তারা স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধী একাত্তরের ঘাতক-দালালদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিল, স্বাধীনতা, মানবতা-বিরোধী অপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী নিয়োগ করে বিএনপি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা করেছিল।
মুক্তিযুদ্বের চেতনাকে তারা ভূলুণ্ঠিত করে। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি যখন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে একটি উন্নত দেশ ও আলোকিত জাতি গড়ে উঠবে- এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি সম্পর্কে এডভোকেট নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় থাকাকালে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঠ্যপুস্তক, পত্র-পত্রিকায় প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতির ন্যক্কারজনক কাজ করতে কেউ সাহসী হবে না।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রত্যাশা হলো এ দেশটি একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র হবে; যা হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। মানুষের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান নিশ্চিত হবে; দারিদ্র্য দূর হয়ে মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াবে, এগিয়ে আসবে দেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে, জনগণের মুখে হাসি ফুটে উঠবে; সেদিন মনে করব, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণতালাভ করেছে।
ইতিহাস কারো আদেশে চলে না, সহজ-সরল তার গতিপথ
এডভোকেট শৈবাল কান্তি সাহা
জজকোর্ট, লক্ষ্মীপুর

বিজয় দিবসকে ঘিরে আপনার অনুভূতি কি এবং মুক্তিযুদ্ধে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছিল কি এমন প্রশ্নের জবাবে এডভোকেট শৈবাল কান্তি সাহা বলেন, ১৯৭১ সনে আমি লক্ষ্মীপুর মডেল হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। ঐ সময় আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অগ্রণী ভূমিকা থাকত। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর লক্ষ্মীপুর শহরের বাসা হতে উত্তর মজুপুর গ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করি। মে মাসের প্রথম সপ্তাহের ভোরবেলায় স্থানীয় কিছু স্বাধীনতা বিরোধীর সহযোগিতায় উত্তর মজুপুর গ্রামে পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। দৌড়ে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পাই। ঐ সময় প্রায় ১৩ জন হিন্দু মুসলমান নিহত হয়। বহু বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়। তারপর আমরা দুই ভাই ভারতে চলে যাই। ইচ্ছে ছিল মুক্তিযুদ্ধে যাব। শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে লক্ষ্মীপুর এসে বিজয়ের স্বাদ পেয়েছি। সেকি আনন্দ উচ্ছ্বাস! মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারার দুঃখ অনেকটা ভুলে যাই। দেশ গড়ার স্বপ্ন জাগে।
যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল দীর্ঘ ৪৪ বছর পর তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নে এডভোকেট শৈবাল কান্তি সাহা বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছেন তা আজও পূর্ণাঙ্গরূপ লাভ করেনি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর ক্ষমতায় এসেছিল ভিন্ন চিন্তাধারার মানুষ। এজন্য বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ চলছে। আমরা এ ব্যাপারে আশাবাদী। তবে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিয়ে কিছুটা হলেও লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে। স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে এডভোকেট শৈবাল কান্তি সাহা বলেন কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, দল সমর্থিত ব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবীগণ তাদের দলীয় স্বার্থে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করছে। জাতির জনকই স্বাধীনতার ঘোষক। ইতিহাসের সত্য চাপা দিয়ে রাখা যায় না, এটা একসময় না একসময় ফুঠে উঠবেই। ইতিহাস কারো আদেশে চলে না, সহজ-সরল তার গতিপথ। বিকৃত ইতিহাস, মিথ্যা ইতিহাস কালের কষ্টি পাথরে টিকবে না।
স্বাধীন সার্বভৌম দেশের কাছে প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে প্রতিশ্রুতিশীল আইনজীবী শৈবাল কান্তি সাহা বলেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে আমার প্রত্যাশা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার পূর্ণ বাস্তবায়ন। সকল শ্রেণির নাগরিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত হোক; তাই প্রত্যাশা করি। দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত করে গড়ে তোলা সেটিই হবে সবার প্রত্যাশা।
বিজয় দিবস সামনে আসলে আমাদের অর্জনগুলো স্বাভাবিক কারণে মানসপটে ভেসে ওঠে
ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন
সভাপতি, বিএমএ, লক্ষ্মীপুর

বিজয় দিবসকে ঘিরে নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করে ডাঃ আশফাকুর রহমান মামুন বলেন সুদীর্ঘ গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমাদের অন্তরে যে অনুভূতি ছিল স্বাধীনতার পর অনেক উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে দেশ এগিয়ে গেছে; আমরা মুক্তিযুদ্ধ তথা বিজয়ের অনুভূতির অনেকটা বাস্তবায়ন লক্ষ্য করছি। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি; এটাও একটি অর্জন। বিজয় দিবস সামনে আসলে আমাদের অর্জনগুলো স্বাভাবিক কারণে মানসপটে ভেসে ওঠে।
তিনি বলেন শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে, মাতৃ ও শিশু উন্নয়নে আমরা বিশ্ব স্বীকৃতি লাভ করেছি। গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা ধরিত্রী কন্যা আখ্যায়িত হয়ে চ্যাম্পিয়ন অব আর্থ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ৪ লেন সড়ক নির্র্মাণ এগুলো প্রত্যেকটিই বিজয়ের স্বাক্ষর। বিভিন্ন উন্নয়নে সাফল্যের বিজয়ের সাথে অনুভূতির বিজয় একাকার হয়ে যায়। এজন্য বিজয় দিবসে আমি অন্যরকম অনুভূতি অনুভব করি।
মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা, দেশের মানুষের জন্য মোটা ভাত, মোটা কাপড়ের ব্যবস্থা করে এবং পর্যায়ক্রমে উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষির উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন কার্যক্রম পরিচালনা করে আমরা কিছুটা হলেও মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছি, আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ডাঃ মামুন বলেন, সদ্য-স্বাধীন দেশ বলে আর আমাদের পরিচয় দেয়া যাবে না; আমরা ৪৪ বছরের শক্ত-সমর্থ যুবক। আমাদের কর্ম উদ্যোগ, আমাদের লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী হতে হবে। মাঝে অনেকগুলো বছর লক্ষ্যহীনভাবে চললেও বিগত ১০ বছর সময় একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে দেশ এগুচ্ছে। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারব।
স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে ডাঃ আশরাফুর রহমান মামুন বলেন ভাষা, কৃষ্টি, আচার-আচরণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি সব মিলিয়ে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী; নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চিরন্তন সত্যকে অস্বীকার করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ চালুর চেষ্টা হয়েছে, স্বাধীনতাযুদ্ধে যাদের অবদান বিশ্বস্বীকৃত, তা অস্বীকার করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্বীকার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ইতিহাস-বিকৃতি। আমরা আশা করব স্বাধীনতার ইতিহাসে যেক্ষেত্রে বিকৃতি হয়েছে, তা সংশোধন করে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা হবে। আগামী প্রজন্ম যাতে এসব বিভ্রান্তিতে না পড়ে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা বাঙালি, বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করি এটা আমাদের সবসময় স্মরণে রাখতে হবে।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাঙলাদেশের কাছে আমার প্রত্যাশা হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য কৃষক-শ্রমিক-মেহনতী মানুষ রক্ত দিয়েছে, তাদের স্বপ্ন সার্থক হোক; যে ছাত্র-তরুণ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, যেসব মা-বোন সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছে, তাদের আত্মদান যেন বৃথা না যায় সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে; তাদের স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে হবে। এ হোক আমাদের বিজয় দিবসের শপথ, নতুন প্রত্যাশা।
স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে আসতে হবে
এ কে এম আবদুল্লাহ
অধ্যক্ষ, লক্ষ্মীপুর দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা

বিজয় দিবসের অনুভূতি ব্যক্ত করে অধ্যক্ষ এ কে এম আবদুল্লাহ বলেন, ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে গৌরবোজ্জ্বল দিন। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা এ দিবস পালন করি। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশকে উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছে দেয়ার জন্য মহান বিজয় দিবসে আমরা শপথ গ্রহণ করি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানা এবং তা থেকে প্রেরণা লাভ করতে পারি।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কোনো ঘটনার কথা জানতে চাইলে অধ্যক্ষ আবদুল্লাহ বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যবাহী টুমচর ফাজিল মাদ্রাসার আলিম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। ক্লাসে ফার্স্টবয় হিসেবে আমি সবার আদরণীয় ছিলাম। এ যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হতে না পারলেও মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছি। এ বিষয়ে একটি ঘটনা এখনও আমার স্মৃতিপটে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সে সময়কার এক সন্ধ্যায় আমরা মোহাম্মদনগর সরকারি প্রাইমারি স্কুল মাঠে কয়েকজন বন্ধু মিলে এলাকাকে কীভাবে শত্রুমুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এ সময় এক বন্ধু এসে খবর দিল যে, রাজাকারদের একটি দল আমাদেরকে পাকড়াও করার জন্য এ দিকে আসছে। আমরা ভয় না পেয়ে রাজাকারদের প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত নিই। সম্ভবত রাজাকাররা আমাদের প্রস্তুতির খবর পেয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে সমাজ সচেতন শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আবদুল্লাহ বলেন, শোষণমুক্তির মহান লক্ষ্যে দেশ স্বাধীন হলেও দেশকে আমরা এখনও দারিদ্র্যমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করে গড়ে তুলেতে পারিনি; এখনও অনেক কিছু করার রয়েছে। স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ আবদুল্লাহ বলেন, ইতিহাস তার নিজ গতিতেই চলে। ইতিহাসের সত্যকেও কেউ চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। শুধু ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধই স্বাধীনতার ইতিহাস নয়, দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাঙালি জাতিকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতি স্বাধীনতার চেতনায় এগিয়ে গেছে, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে।
স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের কাছে তাঁর প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে অধ্যক্ষ আবদুল্লাহ বলেন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চেতনায় শোষণ ও দুর্নীতিমুক্ত, আধুনিক, উন্নত দেশ আমাদের প্রত্যাশা। ডিজিটাল বাংলদেশ গড়ার যে কর্মযজ্ঞ চলছে, দেশের ছাত্র-তরুণদের তাতে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হোক এটি আমাদের কাম্য। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া এখন সময়ের দাবি। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশকে ডিজিটাল হিসেবে গড়ে তোলা অপরিহার্য; নইলে আমাদের তরুণ সমাজ বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
স্বাধীনতা রক্ষা করতে প্রয়োজনে ’৭১ এর চেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হবে
এড. আজগর হোসেন মাহমুদ
ভাইস-প্রিন্সিপাল, লক্ষ্মীপুর আইডিয়াল ল’কলেজ

বিজয় দিবসকে ঘিরে অনুভূতি ব্যক্ত করে এডভোকেট আজগর হোসেন মাহ্মুদ বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র ছিলাম। যুদ্ধের প্রথম অবস্থায় চট্টগ্রাম, ফেনী হতে বহু নারী পুরুষ শিশু ২/৩ দিন পায়ে হেঁটে অনাহারে অর্ধাহারে পিপাসার্ত হয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ির পাশ দিয়ে মজু চৌধুরীর হাট হয়ে ভোলা-বরিশালে যেত। তখন আশেপাশের বাড়ির লোকজন যার যা ছিল, যেমন খাবার, পানি ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করত। তখন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ মানুষের প্রতি সহানুভূতি-সহমর্মিতা দেখাতো। তা যদি আজও আমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকত, তাহলে সমাজে এত হানাহানি সংঘাত হতো না।
যে চেতনায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল, দীর্ঘ ৪৪ বছরে সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট আইনজীবী আজগর হোসেন মাহ্মুদ বলেন, প্রকৃতপক্ষে যে উদ্দেশ্য ও আদর্শে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল তা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর ক্ষমতায় আসা সরকার সে ধারা বদলে দেয়। এজন্য স্বাধীনতার উদ্দেশ্য-আদর্শ পরিপূর্ণভাবে বাস্তাবয়িত হয়নি।
বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হয়েছে, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি এমন প্রশ্নের জবাবে স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব আজগর হোসেন মাহ্মুদ বলেন, বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হয়েছে -এ অভিযোগ সত্য। আমরা আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে এবং যখন যে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন থাকে, তখন সেই দলকে তুষ্ট করার জন্য আমাদের বুদ্ধিজীবীগণ সেইভাবে স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা করে; যা কোনো মতেই কাম্য নহে। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের সামনে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সমাজসচেতন আইনের শিক্ষক আজগর হোসেন মাহ্মুদ বলেন, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ। জীবনের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধারা দিয়ে গেছেন স্বাধীন মানচিত্র, লাল সবুজের পতাকা। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, পেশাজীবী তথা সর্বস্তরের জনগণ ১৯৭১ সালে জীবন বাজি রেখে এই দেশকে স্বাধীন করেছেন। তার কতটুকু রক্ষা হয়েছে তা আজ সতের কোটি বাংলাদেশির প্রশ্ন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর শুধুমাত্র এইটুকু প্রাপ্তি যথেষ্ট নয়। ১৭ কোটি বাংলাদেশির প্রত্যাশা সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপদ জনজীবন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আইনের সুশাসন। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আছে, আইনের চোখে সবাই সমান। এই অনুচ্ছেদের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই পারে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশকে সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। আমরা যে আদর্শে বিশ্বাসী হই না কেন, স্বাধীনতা রক্ষা করতে প্রয়োজনে ৭১ এর চেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। সাধারণ মানুষের মতো আমিও সে প্রত্যাশাই করি।
অর্ডার দিয়ে ইতিহাস রচনা করা যায় না; ইতিহাসকে নিজের পথে চলতে দিতে হবে
এড. মহসিন কবির
লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক

বিজয় দিবসকে ঘিরে তাঁর অনুভূতির কথা জানতে চাইলে এডভোকেট মহসিন কবির বলেন বিজয় দিবস আমার অহংকার, জাতির গর্ব ও গৌরবের দিন। এ বিজয় দিবস কারুর দয়ার দান নয়, কেউ শালিসের মাধ্যমে এ বিজয় দিবস আমাদের দেয়নি। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত-সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা বিজয় দিবসের এ গৌরব ছিনিয়ে এনেছি। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আমরা যদি হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে না পারতাম, তাহলে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতাম না। যারা প্রাণ দিয়ে এ দেশকে স্বাধীন করেছেন, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কি এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযোদ্ধা আইনজীবী মহসিন কবির বলেন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় আমরা নেতৃত্বে পেয়েছিলাম হাজার বছরের শ্র্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি ও রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাঙালি জাতির ‘ম্যাগনা কাটা’ ৬ দফা জাতিকে পাকিস্তানের শাসন-শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে জড়িত করে তাঁকে ফাঁসি দেয়ার ষড়যন্ত্র বীর বাঙালি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নস্যাত করে দিয়েছিল। এসব ক’টি আন্দোলনে আমার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র হিসেবে আন্দোলনে শরিক হয়েছিলাম। আমি তখনকার ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এর আবাসিক ছাত্র ছিলাম। ইকবাল হলে তখন ছাত্রসমাজের বিভিন্ন আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ইকবাল হলেই জাতীয় ছাত্র নেতারা অবস্থান করে জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে ছিলেন আ স ম আব্দুর রব, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, খালেদ মোহাম্মদ আলী প্রমুখ। তাঁদের দিকনির্দেশনায় জাতীয় ছাত্র আন্দোলন বিকশিত হতে থাকে, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের রূপলাভ করে। তারা আমাদের নেতৃত্বে ছিলেন, আমাদেরকে আন্দোলন-সংগ্রামে পরিচালিত করেছিলেন। ইকবাল হলে আমার রুমমেট ছিলেন এম এ হাসান; তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ল পাকিস্তান-আর্মি ইকবাল হল আক্রমণ করবে গণআন্দোলন থামাতে। আমি আর হাসান আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে। আমি হাসানকে নিয়ে রায়ের বাজারে বড় ভাইয়ের বাসায় উঠলাম। পরদিন খবর পেলাম পূর্বদিন রাতেই পাকিস্তান বাহিনী ইকবাল হলে আক্রমণ-অভিযান চালিয়ে বহু ছাত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এরপর হাসান চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার গ্রামের বাড়িতে এবং আমি বৃহত্তর নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরের গ্রামের বাড়িতে চলে গেলাম। লক্ষ্মীপুরে আসার পর মরহুম আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধের কার্যক্রম শুরু করি। সেসময় আখতারুজ্জামান, রফিকুল্লাহ মাস্টার প্রমুখ নেতৃত্ব দিয়েছেন। তখন ১৩০ বছরের পুরাতন আইনজীবী ভবনের দো-তলা ছিল ছাত্র নেতৃবৃন্দের নিয়ন্ত্রণে। তখন তারেক উদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী, বর্তমান এমপি শাহাজান কামাল, গিয়াস উদ্দিন- সবাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পর্যায়ক্রমে আমরা অফিসের দায়িত্ব পালন করেছি, আন্দোলনরতদের সম্পর্কে খবর আদান-প্রদান করতাম, পাকিস্তানী সৈন্যদের গতিবিধির উপর নজর রাখতাম। পাকিস্তান আর্মি লক্ষ্মীপুরে আক্রমণ চালিয়ে শহরটিকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নে দেশপ্রেমী সমাজসেবী মহসনি কবির বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জন, সেটি আমরা পেয়েছি। বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে বাংলা ভাষা বিশ্বদরবারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেত না, বাঙালির অস্তিত্বই থাকত না। স¦াধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন, রাষ্ট্রীয় ৪ মৌলনীতির বাইরে চললো দেশের শাসন ব্যবস্থা, অর্থনীতি। দীর্ঘ ২৫ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করেছে। রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি ফিরে এসেছে; বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে; আন্তর্জাতিক মানের ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ’৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তার রায় কার্যকর হচ্ছে।
স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে এডভোকেট মহসিন কবির বলেন স্বাধীনতার পরপরই স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধী শক্তি, গণহত্যাকারীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ বিচার না করার ফলে পরবর্তী সময়ে এরা এ অপকর্ম করার সুযোগ পেয়েছে। তবে সঠিক ইতিহাস রচনার দায়িত্ব ইতিহাসবিদদের। যেটি তারা করবেন বলে আশা করি। ইতিহাসকে তার পথেই চলতে দিতে হবে। অর্ডার দিয়ে ইতিহাস রচনা করা যায় না।
এডভোকেট মহিসন কবিরের প্রত্যাশা একটি সন্ত্রাসমুক্ত, শোষণমুক্ত, পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমার কাম্য। এখানে হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, রাজনৈতিক সহিংসতা থাকবে না, দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকুক, আমলাতান্ত্রিক শাসন যেন না থাকে এমন একটি দেশ আমার কাম্য। দেশের মানুষও তা-ই কামনা করে।
আজো স্মৃতিতে ভাসে মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্মীপুর জয়ের কথা, আমাদের স্বাধীনতার কথা
তারেক উদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী
লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি

বিজয় দিবসে তাঁর অনুভূতির কথা জানতে চাইলে প্রবীণ আইনজীবী এডভোকেট তারেক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিজয় মানেই আনন্দ। আমাদের এই প্রজন্মের সকলের আনন্দ হলো দেশের স্বাধীনতা দেখা, বিজয় দেখা, বিজয়ের আনন্দে অভিভূত হওয়া। ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝিতে আমার ল’পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় এবং আমি ঐ পরীক্ষায় যথারীতি উত্তীর্ণ হই। আশা নিয়ে বসে আছি, আইনজীবী সনদের জন্য, বার কাউন্সিল পরীক্ষা দেয়ার জন্য। ঐ আশার মাঝে শুরু হয় স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা লক্ষ্মীপুরে আমাদের পুরানো বার লাইব্রেরিতে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করি। আমার আজও মনে আছে জনাব আক্তারুজ্জামানের নেতৃত্বে এডভোকেট মহসিন কবিরসহ আমরা প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই। আমার দুর্ভাগ আমার মা ১৯৭১ সনের ১৯ জুন পরলোকগমন করেন। ঐ কারণে আমার মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করা সম্ভব হয়নি। আজো আমার স্মৃতিতে ভাসে মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্মীপুর জয়ের কথা, আমাদের স্বাধীনতার কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের কথা।
যে চেতনায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, যে চেতনায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল তা আজও সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমরা বর্তমানে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে চলছি, তা বাস্তবায়িত হলেই স্বাধীনতার সুফল আমরা পাব। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে নিজ মতামত ব্যক্ত করে সচেতন ব্যক্তিত্ব এডভোকেট তারেক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশ স্বাধীন হবার পর পরাজিত শত্রুরা স্বাধীনতার ইতিহাস বিভিন্নভাবে বিকৃত করে। তাদের সেই প্রচেষ্টা অদ্যাবধি চলছে। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি একত্রিত হলেই এ অপতৎপরতা রোধ করা সম্ভব হবে।
স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে গণতন্ত্র সচেতন ব্যক্তিত্ব তারেক উদ্দিন চৌধুরী বলেন আমার প্রত্যাশা বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, শিক্ষিত ও ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ। আমার জন্ম বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী দেশ চিরজীবী হোক আমার স্বাধীন বাংলাদেশ। গড়ে উঠুক শোষণহীন, সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ।
মহান বিজয়ের শুভ দিনে একটি দুর্নীতিমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ জাতির প্রত্যাশা
অধ্যক্ষ এম জায়েদ হোছাইন ফারুকী
হাজিরহাট হামেদিয়া ফাযিল ডিগ্রি মাদরাসা

বিজয় দিবসের অনুভূতি ব্যক্ত করে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ এম জায়েদ হোছাইন ফারুকী বলেন, বিজয় দিবস বাঙালি জাতির জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। লাখো বাঙালির রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি গৌরবের দীপ্ত দিন। জাতি আত্মমর্যাদা লাভ করল। ইতিহাসের পাতায় খচিত হলো একটি স্বাধীন সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামল স্বপ্নের সোনার বাংলা। বিজয়ের এদিন সত্যিই মহানন্দের। কোনো এক মনীষী বলেছেন হয়ত আমাকে মৃত্যু দাও, নয়তো স্বাধীনতা দাও। তাই স্বাধীনতা অর্জনের এদিন জাতিকে স্বর্ণশিখরে পৌঁছিয়ে দেয়ার শপথের দিন। সকলের মনে এ দিনে বয়ে যায় আনন্দের হিল্লোল। স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের গৌরব গাঁথা ইতিহাস। এ দিবস আমাদেরকে করে নবজীবনে উজ্জীবিত। মহান মুক্তিযুদ্ধে পরোক্ষ সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার পরিবার একটি অলি আল্লাহ ও শিক্ষক পরিবার। আব্বাজান ও নানাজান অলিয়ে কামিল ও শিক্ষক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ বাবাজান ও নানার নিকট দোয়া নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছেন। তদানিন্তন রামগতি থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মরহুম ফযলুল হক চেয়ারম্যান ও ঐ পরিবারের মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী পরিবার যুদ্ধকালীন প্রায় এক মাস আমাদের বাড়ীতে অবস্থান করেছিলেন। বাবাজান তাদের সহযোগিতা করেছিলেন। তখন আমি চর লরেন্স খাসেরহাট (ফরাসগঞ্জ) মাদরাসার কমবয়স্ক ছাত্র ছিলাম। বয়স্ক হলে মুকিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করতাম। তথাপিও আমাদের পরিবার মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় সহযোগিতা করেছিলেন। তদানিন্তন সময়ের এটিই আমার স্মরণযোগ্য স্মৃতি।
যে চেতনায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল দীর্ঘ ৪৪ বছরে সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যক্ষ জায়েদ হোছাইন ফারুকী বলেন, যে বিশাল স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তার অনেকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। শোষণমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, নিরক্ষতার অভিশাপমুক্ত দেশ গড়ে উঠেছে। তবে এখনো সর্বস্তরে দূর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে ওঠেনি। অবশ্য প্রাণন্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারলে স্বপ্নীল বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ইনশাল্লাহ। সর্বস্তরের জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হবে। এজন্য নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে আসতে হবে দুর্বার গতিতে। স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ ফারুকী বলেন, ইতিহাসকে আপন গতিতে চলতে দেয়া উচিৎ। সত্য ইতিহাসকে অস্বীকার করে লাভ নেই। সত্য ইতিহাস ও স্বাধীনতার ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে পারবে না কস্মিনকালেও।
স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে অধ্যক্ষ ফারুকী বলেন, বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এ স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ অগ্রসর হবে, দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে। এটাই আমার প্রত্যাশা। দলীয় চেতনার উর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তি সাধন করতে হবে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হবে এটিই আমার একান্ত কামনা।