Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

নোয়াখালীর গৌরব বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবারকে নিয়ে অপপ্রচার

‘সুখে নেই বীরশ্রেষ্ঠের পরিবার’ বাক্যটি শোনামাত্রই আঁতকে উঠবে যেকোনো হৃদয়। আর ঠিক সে আবেগটিকেই কাজে লাগিয়ে অপপ্রচারেও মেতে ওঠে একদল। যেন সরকারকে হেয় করার এও এক ঘৃণ্য কূটকৌশল। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ছেলে শওকত আলীর মানসিক সমস্যাকে পুঁজি করে অপপ্রচার চলে ফেসবুক ও নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন পোর্টালে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান রুহুল আমিনের ছেলেকে ভিখারী ও দিনমজুর বলে দাবি করে চালানো হয়েছে সে অপপ্রচার। আবার কখনও প্রচার করা হয়েছে রুহুল আমিনের ছেলের দিন কাটছে চায়ের স্টলে! বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের যেখানে সর্বাত্মক সুবিধা প্রদান করছে সেখানে একজন বীরশ্রেষ্ঠের সন্তান কিভাবে ভিখারী হয়Ñ প্রশ্ন ওঠে সাধারণের মনে!
পরিবার ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোটেও ভিখারী নন শওকত। এমনকি নন দিনমজুরও। তবে তিনি একজন মানসিক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বাবার মৃত্যুর পর মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন শওকত। পবিত্র কোরান শরীফের ১৭ থেকে ১৮ পারা মুখস্থ করেছেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত পড়ালেখার মাঝপথেই তার মধ্যে মানসিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। জানা গেছে, মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত থাকায় সামাজিক প্রতিপত্তির কথা তার কাছে নিছক খেলনা। আপন তিন বোনের সবাই সামাজিকভাবে বিত্তবান, অর্থের সমস্যা নেই বললেই চলে। তবু তিনি কাজ করতে ভালবাসেন। কখনও নিজের বাড়িতে আবার বাজারেও! সবকিছু উল্টে গেলেও মানুষের কাছে হাত পাতেন না তিনি। বীরশ্রেষ্ঠের বড় কন্যা নুরজাহান নার্গিস বলেন, ‘পাঁচ টাকা দিয়ে বাজার আনবে এ ধরনের মানসিকতাও নেই শওকতের। সে অনেকটা ছোট বাচ্চাদের মতো। বর্ষাকালে নদী থেকে শাপলা তুলে আনে, সবার মধ্যে বিলি করে। কিছু দুষ্ট লোক প্রায়ই আমাদের এ অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অপপ্রচারে মেতে ওঠে।’
জানা গেছে, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের দু’ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে ক্যাপ্টেন বাহার ১৯৯৮ সালে মারা যান। সরকার ও পরিবারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করেও শওকতের মানসিক রোগ সারানো সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে তার বড় বোন নার্গিস বলেন, চট্টগ্রাম সিএমএইচ ও ঢাকা সিএমইচে নৌবাহিনীর সহায়তায় তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। চিকিৎসা নিতে গিয়ে সে একবার হাসপাতাল থেকে পালিয়েও যায়। ১৯৯৩ সালে শেষবার চিকিৎসা করানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে শওকত পালিয়ে গেলে বন্দর পুলিশ তাকে আটক করে। তখনও তার পরনে ছিল হাসপাতালের পোশাক। পরে তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয়। আর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি। শওকত নিজেকে পুরো সুস্থ দাবি করে।
সরকার থেকে প্রাপ্ত সহায়তা প্রাপ্তির ব্যাপারে তার বোন নার্গিস আরও বলেন, কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে টাকা দেয়া হচ্ছে। শওকত আলীর নামেই এ্যাকাউন্ট। তার টাকা সেই ওঠায়। বর্তমানে সে ৮৯০০ টাকা পাচ্ছে। আমাদের পুরো পরিবারকে ৩৬ হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে। আমাদের টাকাও ছোট ভাইকে দিয়ে দিতে চাইলেও সন্তান হিসেবে সমান দাবিদার হওয়ায় আইনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পারিবারিকভাবে সর্বাত্মক সাহায্য করছি। শওকতের স্ত্রী রাবেয়া আক্তার বলেন, এখন কিছুটা ভালো। ভালো আর কি! শুনেছি বিয়ের আগে তাঁকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল। কখনও কখনও তিনি খেয়ালে থাকেন আবার কখনও বেখেয়ালি হয়ে ওঠেন, কথাও কম বলেন। সরকারি সাহায্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তার স্ত্রী বলেন, বর্তমানে ৬৬৯০ টাকা পাচ্ছি। তিনিই ওই টাকা ওঠান। তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। সরকারের এ সাহায্য দিয়েতো মোটামুটি চলতে পারছি। সাহায্য পাওয়া না গেলে পথে বসতে হতো বলেও জানান শওকতের স্ত্রী।
তবে দাবি রয়েছে পুনরায় তাকে মানসিক চিকিৎসা দেয়ার। তবু এ ব্যাপারে তাদের পরিবারের কেউ ইতিবাচক কোনো উদ্যোগের কথা জানাতে ব্যর্থ হন!
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ভাই আবুল খায়ের এখন এ পরিবারের প্রধান কর্তা। সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করেন তিনিই। আবুল খায়ের আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন আমাদের গর্ব, এ এলাকার গর্ব, নোয়াখালীবাসীর গর্ব। অথচ আমরা যে এলাকায় বাস করি, এটি একটি জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা। এখানে সত্য কথার প্রতিকার নেই! উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের পরিবারকে হেয়প্রতিপন্ন করতে প্রায়ই এ ধরনের মিথ্যে খবর রটায় স্বার্থান্বেষীরা। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের আরেক ছেলে মোস্তফা কামাল বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের ছেলে শওকত আলী অনেকটা মানসিক প্রতিবন্ধী। বর্তমান সরকারকে বিব্রত করতে বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারকে নিয়ে কুৎসা রটানো হচ্ছে। প্রকারান্তরে বীরদের পরিবারকেও হেয় করা হচ্ছে। প্রতিটি পরিবার সরকারের পক্ষ থেকে যে ভাতা পায় তা দিয়ে অনায়াসেই মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো জীবনধারণ করা যায়।
প্রসঙ্গত, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বাগচাপড়া গ্রামে ১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে ক্যাপ্টেন বাহার ১৯৯৮ সালে মারা যান। বীরশ্রেষ্ঠের মৃত্যুর সময় শওকতের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। বড় বোন নার্গিস মায়ের মমতায় শিশু শওকতকে পরম যতেœ বড় করে তোলেন। প্রকৃতির নির্মম পরিহাসে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে তার মানসিক বিকৃতি ঘটে। বর্তমানে ৪০ বছর বয়সী শওকত তাঁর বাবার ভিটেতেই আছেন। স্ত্রী রাবেয়া আক্তার ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া বৃষ্টিকে নিয়ে শওকতের সংসার সুখের হলেও বিপত্তি কেবল মানসিক প্রতিবন্ধকতা!
জানা যায়, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে যৎসামান্য সম্মান দিতে গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আমিননগর। বাড়ির সম্মুখে বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের দেয়া ২০ শতাংশ জমিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নোয়াখালী জেলা পরিষদ ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে রুহুল আমিন স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। একই গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন হাই স্কুল, যা শহীদ রুহুল আমিন একাডেমি নামেও পরিচিত। তবে অভিযোগ রয়েছে, বীরশ্রেষ্ঠের এ গ্রামটি জামায়াতের অঘোষিত আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বীরশ্রেষ্ঠের নামে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতেও বীর পরিবারের কোনো আধিপত্য নেই। এলাকায় অনেকটাই কোনঠাসা তারা।
-এমদাদুল হক তুহিন