Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

মুক্ত স্বাধীন দেশ গড়ার প্রথম মাইলষ্টোন শেখের কিল্লা

॥ এএইচএম নোমান ॥
দিন দিন স্মৃতি থেকে সব যে বিস্মৃত হয়ে যায়, তার আরেকটি প্রমাণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তান কারাগার থেকে প্রত্যাবর্তনের পর দেশ গড়ার ডাকের প্রথম সোপান। তিনি হিথ্রো-দিল্লী হয়ে স্বদেশে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে প্রত্যাবর্তন করেন। যেহেতু এটা ঐতিহাসিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বলেই এটা সবারই মনে আছে। কিন্তু দেশে প্রত্যাবর্তনের পর চর-গ্রাম দেশে তাঁর প্রিয় জনগণের কাছে, কোথায় কখন কত তারিখ প্রথম গেলেন, কী করলেন, কী বললেন, কী দিকনির্দেশনা রাখলেন, এর ফলশ্রুতি বা ফলাফল কী এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু অনেকেরই মনে নাই, এমনকি জানাও নাই।
জাতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনেক স্মৃতিই অতলে তলিয়ে যাচ্ছে, যা আকাক্সিক্ষত নয় এবং গ্রহণীয় নয়। একটি সমাজের, অঞ্চলের, দেশের যতই কৃষ্টি-কালচার, খাদ্য, বস্ত্র, চালচলন, পরিবেশ, আচার-বিচার, ধর্ম-কর্ম, কৃষি, সম্পদ রাজনীতি ইত্যাদির গতি প্রকৃতি গভীরে-শিকড়ে যতই জানা যাবে ততই বুঝা যাবে সে সমাজ-দেশের ভিত কত দৃঢ়। এতে চলমান ইতিহাসও সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যতের আগমনী বার্তা নিয়ে শক্ত ভিতের উপর সমাজ-দেশ গড়ে ওঠে। বিশ্ব দরবারে নিজের স্বকীয়তা নিয়ে শুধু মাথা উঁচু করে দাঁড়াবই না বরং অন্যের কাছেও অনুকরণীয় হব। যে শিরোনাম দিয়ে লেখাটা শুরু করলাম, তা বড় হয়ে যাচ্ছে বা অন্যদিকে যাচ্ছে, কিন্তু নেয়া যাবে না। তাই বলছি, বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর সর্বপ্রথম যে গ্রাম থেকে ‘দেশ গড়ার ডাক’ দিতে গেলেন -সে গ্রামের নাম চর পোড়াগাছা, ইউনিয়ন চর বাদাম, থানা রামগতি, জেলা নোয়াখালী; বর্তমানের লক্ষ্মীপুর জেলা। দিনটি ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। শীতের আমেজ ছিল। মনে আছে, ২টি হেলিকপটার যোগে বঙ্গবন্ধু বাগ্যারদোনা স্রোতহীন মেঘনা ঘেঁষে নুতন গড়ে ওঠা চর কলাকোপা, মৌজা চর পোড়াগাছা পৌঁছান। সকাল ১০টায় হেলিকপটার থেকে বিশাল ব্যক্তিত্ব স্বপ্নমুখী বঙ্গবন্ধু নামতে নামতে চেনামুখ তোফায়েল ভাইসহ আরো অনেকে নেমে এলেন। পুরো নুতন চর জাগা এলাকা জনসমুদ্র। কে কাকে দেখে, সবার শ্রদ্ধা ভরা তীর চোখ প্রাণপ্রিয় মুক্তির প্রতিকৃতির দিকে। দৃঢ় পায়ে হেঁটে ডান-বাম তাকাতে তাকাতে ১-২ বার খোলা আকাশের দিকে (আল্লাহর শোকরিয়া) তাকিয়ে নুতন স্থাপন করা হুগলা/তেরপাল মোড়ান মাটির কিল্লায় যথাস্থানে দাঁড়ালেন। চতুর্দিক ঘুরে ঘুরে আবাল-বৃদ্ধ-যুব-কিশোর শিশু মানব সমুদ্রের উৎফুল্ল মুহুর্মূহু হর্ষধ্বনির উত্তরে, হাত নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করছিলেন অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। আমার মতো আনাড়ী লেখকের ভাষায় এ স্মৃতিময় অভূতপূর্ব ও বিরল মুহূর্তের বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়।
মাটির কিল্লার ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্বে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা চর রমিজ ইউনিয়নের ফর্সা চৌকস চেয়ারম্যান আজাদ উদ্দিন, আজাদ মিয়া। গায়ে সাদা গেঞ্জী, কোমরে লাল গামছা, উৎফুল্লতায় ব্যস্ত, আবেগের সন্ত্রস্ততা নিয়ে সভা পরিচালনা করছিলেন। অনেকের মধ্যে এ মুহুর্তে যা মনে আছে স্থানীয় যারা কিল্লায়/মঞ্চে ছিলেন রামগতি থেকে নির্বাচিত এমসিএ সিরাজুল ইসলাম, এলাকার ও আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোশারেফ হোসেন মোশারেফ ভাই, রামগতি থানা কমান্ডার হাছান মাহমুদ ফেরদৌস, মাহমুদুর রহমান বেলায়েত, কচি ভাই, লক্ষ্মীপুরের শাহজাহান কামাল, খালেদ মোহাম্মদ আলী, নোয়াখালীর মোঃ হানিফ, চৌমুহনীর নুরুল হক মিয়া, মাইজদী থেকে আবদুল মালেক উকিল, হাজারো মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা প্রশাসনের ব্যক্তিবর্গ। (মাফ করবেন, সবার কথা ও ঘটনা, স্থান অসংকুলান, তাই দেয়া গেল না পরে বেঁচে থাকলে লিখব অশা রাখি)। হানিফ ভাই তাঁর আগের রাতে আলেকজান্ডারে আমাদের বাসায়ই ছিলেন, যাতে সকাল সকাল সময়মতো সভায় থাকতে পারেন। এছাড়া আরো অনেক রাজনৈতিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, নোয়াখালী, ফেনী এলাকা থেকে পরিচিত আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে বাসায় রাতেই এসে অবস্থান নেয়। তখন ভাঙ্গা এবড়ো-থেবড়ো কাঁচা রাস্তা-ঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল এবং যানবাহন গাড়ি-বাস-রিক্সাও তত ছিল না-অনুন্নত। যুদ্ধবিধ্বস্ত কোথাও কোথাও রাস্তা কাটা, ব্রীজ ভাঙ্গা, পোড়া বাড়ী-ঘর-দোকানপাট প্রায় সর্বত্রই দৃশ্যমান।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিল্লায় দাঁড়িয়ে গগনবিদারী কন্ঠে কী কী বল্লেন সব স্মৃতিতে না আসলেও মূল কথাসমূহ মনে আসে যে ‘দেশ আমাদেরকেই গড়তে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে, প্রত্যেক বাড়িতে একটি করে লাউ গাছ হলেও লাগাতে হবে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে দেশ গড়া ও অর্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে’। সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষে কোদাল হাতে নিয়ে স্বহস্তে মাটি কেটে ওড়াতে দিলেন। সফরসাথী নেতৃবৃন্দ একে একে একইভাবে মাটি কেটে রাস্তা নির্মাণের, স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ উদ্বোধন করলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই সঙ্গে ২ কি:মি: ব্যাপী ওড়া-কোদালসহ সোজা লাইন ধরে প্রায় ৪ (চার) হাজার স্বেচ্ছাকর্মী মুক্তিযোদ্ধা সমবায়ী যুবক গায়ে সাদা গেঞ্জি, পরনে প্যাঁচ দেয়া লুঙ্গী-গামছা পরে রাস্তা বরাবর একই সঙ্গে একই কমান্ডে ঢোল-সহরতের তালে তালে মাটি কেটে রাস্তা বাঁধার কাজ শুরু হয়ে সময়ের মধ্যেই শেষ হলো।
বঙ্গবন্ধু ইতোমধ্যে হাত ধুয়ে পার্শ্ববর্তী তোফায়েল ভাইর দ্বীপ ভোলা জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে হেলিকপ্টার যোগে রওয়ানা হয়ে গেলেন। যে গ্রাম-কিল্লায় দাঁড়িয়ে প্রথম দেশ গড়ার ভাষণ দিলেন, যেখান থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে নিজ হাতে মাটি কেটে নোয়াখালী-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক বাঁধার কাজ উদ্বোধন করলেন, সেই কিল্লাই আজ ‘শেখের কিল্লা’ নামে পরিচিত-সর্বখ্যাত। এই কিল্লাকে ঘিরে পাশেই গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ‘গুচ্ছগ্রাম’ যা আজ সারা দেশের ঠিকানা, আদর্শগ্রাম-গুচ্ছগ্রাম-আশ্রায়ন প্রকল্প নামে ভূমিহীন ছিন্নমূলদের জন্য স্থাপন হচ্ছে-চলমান। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৭০ এর ১২ নভেম্বর সাইক্লোনে বিধ্বস্ত রামগতিতে সমবায়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশংকায় উৎপাদন যুদ্ধও চলমান ছিল। এই কিল্লা ঘিরেই নতুন জাগা চরে আলু, সয়াবীন, চিনাবাদাম, সূর্যমুখীসহ নানাজাতীয় শাক শবজি তরিতরকারী ফসল প্রদর্শনীমূলক চাষাবাদ করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে এখন লক্ষ্মীপুর জিলাকে ‘সয়াবীন জেলা’ বলা হয়। সমবায়ীদের গড়া চর আলেকজান্ডারে দেশের প্রথম উদ্ভাবনী গুচ্ছগ্রাম ‘বিশ্বগ্রাম’ মেঘনার অতল গহবরে চলে গেছে। ১৯৭২ সালে স্থাপিত। তৎস্থিত ‘বিশ্বগ্রাম’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই শেখের কিল্লার পূর্ব-উত্তর পাশে এসে আশ্রয় নিয়ে শিক্ষার আলোকবর্তিকা এখনও জ্বালিয়ে যাচ্ছে। স্কুলকে বুকে ধরে চর আবদুল্লার বিশ্বগ্রামবাসীরা আবারো স্বেচ্ছাশ্রমে একই নক্সায় স্ব-খরচে-ব্যবস্থায় এখানে নতুনভাবে ‘বিশ্বগ্রাম’ স্থাপন করে ঘর-বসতি করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। অনতিদূরে মাইজদীর রাস্তায় আজাদনগর, মফিজনগর, শেখের কিল্লাস্থিত এখন নবগঠিত পোড়াগাছা ইউনিয়ন পরিষদ। ইচ্ছা থাকলে, নিজেরাই করতে পারে, যদি ভিত শক্ত থাকে। প্রমাণ করল এই ‘শেখের কিল্লা’র প্রেরণা। সৃষ্টিকর্তার দান, জেগে ওঠা চরাঞ্চলে এখন হাজারো বসতি গাছপালা, বাজার, পুকুর, মাছ, মুরগী-হাঁস। একইভাবে গড়ে উঠেছে পশ্চিমপাশে নোমানাবাদ স্কুল, মসজিদ, স্বাস্থ্যগ্রাম, পশ্চিম দক্ষিণে আবদুর রব চৌধুরীর সেবাগ্রাম, একটু পূর্ব দক্ষিণে বান্দের হাট পাশে আসম রব’র বাড়ি মিলে ‘পতাকা গ্রাম’। পশ্চিম উত্তর দিকে চর সীতায় স্বনির্ভর আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী মনতোষ দাশ’র মাছ-মুরগী-গবাদিপশু (মামুগ) খামার, পাশেই বুড়া কর্তার মন্দির। তখন সমবায়ীদের সবজি ভাত আন্দোলন এবং ‘মামুগ’ দিয়েই দেশ দাঁড়াবে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে। পশ্চিম উত্তরের হাজির হাটে (বর্তমান কমলনগর) ইউনিয়ন পরিষদ সামনে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার, মোহাম্মদ তোয়াহা স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয়। শেখের কিল্লার দক্ষিণে অনতি দূরে রামদয়াল সুলতানা একাডেমী পার হয়ে, রামগতি বাজার ঘেঁষে পরিকল্পিত বয়ার চর। বিবিরহাট, আলেকজান্ডার বাজার সদর এলাকা পাশ দিয়ে, নদী ভাঙ্গন রোধ বাঁধ বাঁধার কাজ চলছে। এর ফলে চরিত্রহীন মেঘনাকে প্রাকৃতিকভাবেই নয়নাভিরাম করে দেশি-বিদেশি পর্যটককে আকৃষ্ট করা এক বিশাল অবদান সৃষ্টিকর্তার, উছিলা মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা। চরের মহিষের দই, নদীর ইলিশ মাছ, সংগ্রামী জেলে চাষীদের উজাড় করে দেয়া আতিথেয়তা ভালবাসা, কোথায় পাবে এতো বিচিত্রতা?
তাই এই অঞ্চলের মানুষের একান্ত আশা আবেদন ‘শেখের কিল্লা’কে ঘিরে গড়ে ওঠা, আল্লাহর অপার সৃষ্টির জীবন গাঁথার কলকাকলী ভাঙ্গা গড়ার নদীর খেলাকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধুর ‘প্রথম গ্রাম গমন, ঐতিহাসিক দেশ গড়ার ডাক’কে দেশের জন্য অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য বর্ণিত নির্দিষ্ট শেখের কিল্লা স্থানে ১) একটি স্মৃতি স্তম্ভ, ২) পর্যটক রেষ্ট হাউজ ৩) স্থানীয় কৃষ্টি কালচার, তাঁর ভাষণ ইতিহাসসহ পাঠাগার ৪) তৎকালীন বৃহত্তর নোয়াখালী (বর্তমান ফেনী-নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর) জেলার তথা সারা গ্রামবাংলার ঐতিহাসিক ‘শেখের কিল্লা স্মৃতি কেন্দ্র’ স্থাপন করা হউক। ইতোমধ্যে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সমবায়ী ও রাজনৈতিক সচেতনদের উদ্যোগে এ মাটি থেকে গড়ে ওঠা বেসরকারি সংস্থা ‘র্ডপ’ এর সৌজন্যে ‘শেখের কিল্লা মাইলস্টোন’ স্থাপন করা হয়েছে, যা এলাকা ও দেশ-বিদেশের পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি, পর্যটন ও প্রতœতত্ত্ব বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষনসহ বঙ্গবন্ধুর দেশ গড়ার ডাক এর ‘স্মারক স্মৃতিকেন্দ্র’ তৈরির আবেদন রাখছি। প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পদার্পণে ‘গুচ্ছগ্রাম’ স্থাপন স্মরণে, বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী আফম মোস্তফা কামাল’র চিন্তা প্রসূত ইউনিয়ন ভিত্তিক ৫ (পাঁচ)শ’ নদীভাঙ্গা অসহায় গরিব পরিবারের জন্য সুউচ্চ প্রাসাদ সম্পন্ন সামগ্রীক ও সমন্বিত উন্নয়ন পাইলট আবাসন গ্রাম স্থাপন করার আহবান জানাই। প্রাণ সূত্রতার টানে, শোকের মাস গত ২৬ আগস্ট ২০১৬ এই শেখের কিল্লা ছুঁয়ে গাড়ী যোগে রামগতি থেকে মাননীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে (আমিসহ) উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ, পৌরসভা মেয়র এম মেজবাহ উদ্দিন মেজু, কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান সোয়াইব খন্দকারসহ সকল ইউনিয়নের আওয়ামী যুবলীগ নেতারা টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু সমাধি জিয়ারতে যান, সেখানে আবার ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা কেন্দ্রিক স্বপ্ন প্যাকেজ’ মা’রা তাদেরকে ফুল দিয়ে সেতুবন্ধন স্বাগত জানান।
বঙ্গবন্ধুর প্রথম রামগতি সফর কীভাবে, কেন হলো কে এবং কী এর পেছনে কাজ করেছে যতটুক যা জেনেছি তা হলো, তিনি যখন প্রথম গ্রাম সফরে স্বেচ্ছাশ্রম ও দেশ গড়ার সংগ্রামের ডাক দিবেন, তা ঠিক হলো তোফায়েল ভাই’র (জননেতা জনাব তোফায়েল আহমদ, বর্তমান বাণিজ্য মন্ত্রী) এলাকা ভোলা এবং এটাই স্বাভাবিক। যিনি সুঃখ দুঃখের আপাদমস্তক দেশ ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছায়াসম সহচর ছিলেন। কিন্তু রামগতি কেন তাও আবার ভোলার আগে? জানা যায়, যখন গণভবনে গ্রাম সফর পরিকল্পনা করা হয় তখন পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকা রামগতির দূরন্ত ডাটসাইটে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আজাদ উদ্দিন ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামী হাতিয়া-রামগতির সন্তান মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুল বারীও সেখানে ছিলেন। তখন সাক্ষাৎ ও আলাপচারিতায় বঙ্গবন্ধুকে রামগতি হয়ে ভোলা যাওয়ার আব্দার ও প্রস্তাব দেন।
আমরা মাত্র ২/৩ দিন আগে জানতে পারলাম যে, বঙ্গবন্ধু রামগতি আসবেন, পোড়াগাছার কলাকোপা, স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা বাঁধায় যোগদিবেন ও উদ্বোধন করবেন। চর রমিজ ইউনিয়নের বিবিরহাট বাজারে আজাদ মিয়াসহ বিশাল প্রস্তুতি। কতলোক, কিভাবে, কতটুকু দীর্ঘ রাস্তা, কতক্ষণে বাঁধবেন ইত্যাদি সব পরিকল্পনা। আওয়ামীলীগ সেক্রেটারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজিউল্ল্যা মিয়া যেহেতু আলেকজান্ডারের, তাঁর টান ছিল এখানকার লোকদেরকে কি করে সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠিত করে বঙ্গবন্ধুর আগমন স্থলে যাওয়া যায়, তার জন্য প্রাণপণ উদ্বেগ উৎকন্ঠা আনন্দ। সম্পর্কে আত্মীয় বয়সে ছোট হলেও আমাকে সবসময় ভালজেনে আপনি করেই ‘ভাই’ ডাকতেন। বল্লেন, বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষে কী কী করা যায় আসুন সমবায়ীরাসহ সবাই বসি।
তখন প্রতিদিন আমরা ‘সন্ধাকালীন আসরে’ বসতাম সমবায় সভাপতি আবদুর রব খন্দকার, মুক্তিযোদ্ধা তাজল ওসি, ছোলায়মান মিয়া বা রফিক সেক্রেটারী বা তোফায়েল ডাক্তার সাহেবের ঘরে। সেদিন অজিউল্ল্যাহ মিয়ার নেতৃত্বে আমরাও তোফায়েল ডাক্তারের চেম্বারে বসলাম। আমিসহ ঠিক করলাম, সমবায়ীরা ২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণ উপলক্ষে বুকে অ আ ক খ বর্ণমালা ১, ২, ৩ লাগিয়ে মিছিল সহকারে পোড়াগাছা যাওয়া হবে। প্রসঙ্গত, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক বাসুদেব গাঙ্গুলীর সাথে তাঁর সভাকক্ষে দেশি-বিদেশিদের এক মতবিনিময় সভায় (১৪-২-২০১৭) অংশ নিয়ে খুবই তৃপ্তির কথা, গেজেটে প্রকাশ যে, দীর্ঘ ৪৪ বছর পূর্বে অনানুষ্ঠানিকভাবে গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ হলেও বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই ২৩/০৮/২০১৬ তারিখে ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। যা ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ দিনটির কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমরা ৭-৮ হাজার সমবায়ী সকলে বুকে সুই-সূতা দিয়ে ক খ গ ১, ২, ৩ লাগিয়ে শেখের কিল্লায় যাই। প্রথম বিজয়ের মাসে প্রথম সপ্তাহেই মুক্তির পরবর্তী ২২ ডিসেম্বর ১৯৭২ আলেকজান্ডার স্কুলগৃহে মুক্তিযোদ্ধা সমবায়ীদের এক সভায় ‘নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে ২য় যুদ্ধ’ ঘোষণা করা হলো। পাশাপাশি দ্বিস্তর বিশিষ্ট সেলফ জেনারেটিং থানা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির উদ্যোগে ‘মাটিকাঠি’ পদ্ধতিতে স্বেচ্ছাশ্রমে ১২০টি গণশিক্ষা কেন্দ্র চালু হয়ে গেল।
তন্মধ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার আমলেই ১২টি সরকারি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা পায়। যাক মূল কথায় আসি, মোজাম্মেল পাটওয়ারী, প্রসন্নবাবু, অজিউল্ল্যাহ মিয়াসহ নেতাকমী, বৈঠকে ঠিক হলো, মুক্তিযোদ্ধা আমজনতাসহ ওড়া-কোদাল নিয়ে আজাদ মিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে রাস্তা বাঁধা, ব্যবস্থাপনা কাজে সহায়তা করবেন ও এলাকা ভিত্তিক গ্রুপ গ্রুপ করে মিছিল সহকারে যাবেন। এ পরিকল্পনা ভাবেই চতুর্দিক থেকে মিছিলে মিছিলে সেদিনে বঙ্গবন্ধুর আগমন স্থান ভরপুর হয়ে গেল। কাঁচা ভাঙ্গাচুড়া, চিকন রাস্তা, মেঠোচর ঘরবাড়ি শূন্য এলাকা, শুধু উদ্বেলিত মানুষ আর মানুষ। আর এখন ঘন ঘন ঘরবাড়ী, গাছগাছালি, ফসল, স্কুল মাদ্রাসা লোকালয় ঘেরা ‘শেখের কিল্লা’ যেন কালের সাক্ষী হয়ে তাকিয়ে আছে সব সৃষ্টির দিকে। আর শেখের কিল্লাটি কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলছে, ‘তোমরা আমাকে ভুলিয়ে দিচ্ছ জগৎবাসীর কাছে, যা আমি ডাক দিয়েছিলাম এখান থেকে যে, ‘নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, স্বনির্ভর হতে হবে। মাথা উঁচু করে জানান দিতে হবে যে আমরাই পারি’।
রামগতি কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির ‘যার ভিটা তাঁর ঘর’ প্রকল্প-আওতায় শেখের কিল্লাকে কেন্দ্র করে পাশেই খোলা চরে চৌচালা ১টি টিনের ঘর ও ১টি টিউবওয়েল স্থাপন করা হলো। হাজীগঞ্জ বাজারের কাছে বেড়ীর বাহিরের আলী মিয়াকে ধূ-ধূ এলাকায় ৩০ টাকা মাসিক বেতনে কেয়ারটেকার রাখা হলো। উদ্দেশ্য, ‘বিশ্বগ্রাম’ আদলে বড় আকারে ‘গুচ্ছগ্রাম’ স্থাপন করা। তখন বেড়ীর বাহিরের অংশে হদু ব্যাপারী, নাপিত বাড়ী ও কোব্বাত হাজী বাড়ীসহ হাতেগোনা কয়েকটা বাড়ি ছিল। আর কিছু গাছ-গাছালিসহ কোব্বাত হাজী বাড়ীর দরজায় মাত্র একটা টিউবওয়েল ছিল। বড়খেরী ভূঁইয়া পাড়া প্রাথমিক সমবায় সমিতির মোঃ দেলোয়ার হোসেন (লম্বা দেলু মিয়া) অগ্রণী ভূমিকা নিলেন। জেলার ভূমি কর্মকর্তা (এডিসি) আনসার আলী মোল্লাসহ ঢাকায় যোগযোগ করলেন। এদিকে ভূমিহীন, মুক্তিযোদ্ধা, নদী ভাঙ্গা, ৭০’র ১২ নভেম্বর অতি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করতে লাগলেন সমবায় সমিতির আওতায়, যার সাক্ষী একরাম মিয়া। চর আবদুল্ল্যা, আলেকজান্ডার থেকেও সিরাজ খলিফা, আরো কি নাম মনে নাই, তালিকা তৈরি করলেন। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকতার বেড়াজালে, প্রতিযোগিতার ধকলে দেলু মিয়ার ধৈর্যশীল ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে চর গাজী, বড়খেরীর লোকেরাই গুচ্ছগ্রামে স্থান পেলেন। অপরদিকে আমাকে ১নং আসামি করে নোয়াখালী সদরের কিছু আদিবাসী বয়াদার দাবিতে মামলা রজু করল, যা শেষ পর্যন্ত ধোপে টিকেনি। সমবায়ের উদ্যোগে ইউনিয়ন এগ্রিকালচার এসিসটেন্ট ইউএএ পরিমল বাবুর হাতে শুরু করা প্রদর্শনী মিষ্টি আলু, সয়াবীন চাষ আজ বিশাল জনপদ। মনে হয় এই সেদিন দেলু মিয়ার নিজের হাতে গুচ্ছগ্রামে লাগান নারিকেল গাছের প্রথম ডাবের পানি আমাকে তৃপ্তি সহকারে খাওয়ালেন। বালুর চরের জেবল হক মেম্বার নুতন উৎপাদিত আলু বাসায় দিয়ে গেলেন। সয়াবীন বীজ দিয়ে পিঠা বানিয়ে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরা খাদ্যাভ্যাস এস্তেমাল করছিল। ‘সমবায়’ খোদিত ইট তৈরি ১নং বিশ্বগ্রামে ব্রিক ফিল্ড স্থাপন (নদী গর্ভে) ও বিচ্ছিন্ন বিশ্বগ্রামের সাথে আলেকজান্ডার-রামগতি সংযোগ সড়ক নির্মাণ হলো আজাদ মিয়ার দাপটে।
মোট কথা মুক্তিযুদ্ধ, ৭০’র ১২ নভেম্বরের বন্যার্তদেরকে নিয়ে শুরু করা ক) ত্রাণ পুনর্বাসন খ) যুদ্ধকালীন মুক্তিযুদ্ধ- উৎপাদনযুদ্ধ এবং গ) মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর দেশ গড়ার প্রথম ডাকের প্রেরণা, দেশ একাকার হয়ে সম্মিলিত শক্তির ‘সৃষ্টি’র উন্নয়ন-ভিত আজও চলমান ও ভবিষ্যতেও থাকবে। যার কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে প্রথম মাইলস্টোন ‘শেখের কিল্লা’। এভাবেই উদ্যোগী উন্নয়ন, রাজনীতিক ও সরকারি নীতি-নির্ধারকদের একাত্মতায় টেকসই উন্নয়নের মহাসড়ক নির্মাণে বাংলাদেশ এগিয়ে। মুুক্ত স্বাধীন দেশ গড়ার প্রথম ডাক ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা দেশ ও দুনিয়ায়।
-লেখকঃ প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী
রামগতি থানা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি এবং
গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার-২০১৩ বিজয়ী