Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

নোয়াখালী বনাম কুমিল্লা বিভাগ করার যৌক্তিকতা

॥ সাকিব আল মামুন ॥
নোয়াখালী, বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম জনপদ। তিন হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীর মানচিত্রে এ জনপদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। আর তখন থেকেই এ অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে ওঠে। কালের পরিক্রমায় নোয়াখালী আজ স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী অঞ্চলে পরিণত।
ব্রিটিশ বাংলা, পাকিস্তান আর স¦াধীন বাংলাদেশে প্রতিটি শাসনামলে নোয়াখালীর অবদান সর্বাগ্রে ছিল। প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, নোয়াখালীর সন্তানদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ৫২ এর ভাষা সংগ্রামে শহীদ সালাম, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ সার্র্জেন্ট জহুরুল হক, ৭ বীরশ্রেষ্ঠের একজন এই নোয়াখালীর সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আব্দুল হাকিম, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত নাটকের লেখক মুনীর চৌধুরী, ব্যতিক্রমী ধারার নাট্যকার সেলিম আলাদীন, জহির রায়হান, শহীদুল্লাহ কায়সার, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, ২৬ জন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীসহ হাজারো কৃতী সন্তানের জন্ম দিয়েছে এ নোয়াখালী।
রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নোয়াখালীর সূর্য সন্তানেরা কোন অংশে পিছিয়ে নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম স্পিকার আব্দুল মালেক উকিল, স্পিকার মোহাম্মদ উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রী এবং উপরাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক উকিল, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক-যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বর্তমান ও দেশের প্রথম নারী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, সাবেক প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন, চিফ জাস্টিস আমিন আহমেদ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের জন্মভূমি এই নোয়াখালী।
অর্থনীতি আর বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে একক জেলা হিসেবে সর্বাধিক অংশগ্রহণ নোয়াখালীর শিল্পপতিদের। দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে নোয়াখালীর অবদান অন্যান্য জেলার চেয়ে এগিয়ে আছে। সরকার সেটা বেমালুম ভুলে যাচ্ছে। ব্যাংক বীমাসহ অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া মালিক, টিভি চ্যানেল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই নোয়াখালীর হাতের ছোঁয়া বিদ্যমান।
নোয়াখালী আর কুমিল্লাঃ একটি তুলনামূলক অবস্থান অবিভক্ত ভারতবর্ষে নোয়াখালী জেলার মর্যাদা পায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক এদেশে জেলা প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পরীক্ষার সময় থেকেই। ১৭৭২ সালে কোম্পানির গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এদেশে প্রথম আধুনিক জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা নেন। তিনি সমগ্র বাংলাদেশকে ১৯টি জেলায় বিভক্ত করে প্রতি জেলায় একজন করে কালেক্টর নিয়োগ করেন। ১৯টি জেলার একটি ছিল কলিন্দা।
কলিন্দা জেলাটি গঠিত হয়েছিল মূলতঃ নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে। কিন্তু ১৭৭৩ সালে জেলা প্রথা প্রত্যাহার করা হয় এবং প্রদেশ প্রথা প্রবর্তন করে জেলাগুলোকে করা হয় প্রদেশের অধীনস্থ অফিস। ১৭৮৭ সালে পুনরায় জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং সমগ্র বাংলাদেশকে ১৪টি জেলায় ভাগ করা হয়। এ ১৪টির মধ্যেও ভুলুয়া নামে নোয়াখালী অঞ্চলে একটি জেলা ছিল। পরে ১৭৯২ সালে ত্রিপুরা নামে একটি নতুন জেলা সৃষ্টি করে ভুলুয়াকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তৎকালে শাহবাজপুর, হাতিয়া, নোয়াখালীর মূল ভূখন্ড লক্ষ্মীপুর, ফেনী, ত্রিপুরার কিছু অংশ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও মীরসরাই নিয়ে ছিল ভুলুয়া পরগনা। ১৮২১ সালে ভুলুয়া নামে স্বতন্ত্র জেলা প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত এ অঞ্চল ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৬৮ সালে ভুলুয়া জেলাকে নোয়াখালী জেলা নামকরণ করা হয়।
নোয়াখালীর ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা ১৮৩০ সালে নোয়াখালীর জনগণের জিহাদ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ১৯২০ সালের খিলাফত আন্দোলন। জাতিগত সংঘাত ও দাঙ্গার পর ১৯৪৬ সালে মহাত্ম্া গান্ধী নোয়াখালী জেলা ভ্রমণ করেন।
নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী মহকুমা নিয়ে নোয়াখালী জেলা চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্ভুক্ত একটি বিশাল জেলা হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। ১৯৮৪ সালে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক সকল মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করা হলে লক্ষ্মীপুর ও ফেনী জেলা আলাদা হয়ে যায়। শুধু নোয়াখালী মহকুমা নিয়ে নোয়াখালী জেলা পুনর্গঠিত হয়।
অন্যদিকে ত্রিপুরা রাজ্যের একটি অংশ কালের পরিক্রমায় ১৯৬০ সালে কুমিল্লা নামে জেলা হওয়ার মর্যাদা লাভ করে। ১৯৮৪ সালে কুমিল্লার দু’টি মহকুমা চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পৃথক জেলা হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়। জাতিগত ঐক্য, ইতিহাস, ঐতিহ্যে নোয়াখালী ছিল সর্বাগ্রে। বিভাগ হওয়ার উপযুক্ততায় কুমিল্লার চেয়ে এগিয়ে নোয়াখালী।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়