Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

নোয়াখালী ধন্যঃবঙ্গবন্ধুর আগমনের জন্য

‘যায় না ভোলা-যায় না মোছা
রয় চির ভাস্বর
বঙ্গবন্ধু মুজিব মানেই
বাংলার বাতিঘর
জয় বাংলার জয় বাঙ্গালীর
ধন্য মুজিবর’।
(আসলাম সানী)
আমাদের রাজনীতি-সংস্কৃতি-ইতিহাস এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষত্রেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সদা জাগ্রত। তিনি আমাদের প্রেরণা, শিক্ষা ও দীক্ষা দাতা এবং ত্রাতা। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল বঙ্গবন্ধুর পদচারণায় ধন্য। তার মধ্যে নোয়াখালী অঞ্চল অন্যতম। তিনি নোয়াখালী এসেছেন সরকারি কাজে, তার স্মৃতিবহ সেসব দিনগুলো নোয়াখালীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক।
’৭০ এর ১৭ নভেম্বর
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণের নিকট চিরস্মরণীয়। সে রাতে ঘটেছিল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলেচ্ছ্বাস। ১৩০ মাইল গতিবেগের ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হেনেছিল নোয়াখালীর হাতিয়া, চরলক্ষী, চরজব্বার, চরলরেঞ্চ, চরমোহনা ও রামগতির নিম্নাঞ্চলে। প্রবল হারিকেন বাতাসে পানির জোয়ার ১৬ ফুট পর্যন্ত উঠে সমগ্র নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকাকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। ফলে প্রাণ হারিয়ে ছিল লাখ লাখ মানুষ, গবাদিপশু এবং পাখি। নির্বাচনের প্রস্তুতির মুখে ১২ নভেম্বর পূর্বপাকিস্তানের উপকূলবর্তী অঞ্চলে বিশেষত নোয়াখালী অঞ্চলে এ মহাপ্রলয়ে প্রায় সমস্ত জনপদ সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পাকিস্তানের প্রচার মাধ্যমগুলো ইতিহাসের এ বৃহত্তম ট্রাজেডিকে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করে। এরূপ পরিস্থিতিতে বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ৭০ এর ১৫ নভেম্বর ভোলা থেকে নোয়াখালীর দুর্গত অঞ্চল সফর করেন। এদিন তিনি প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাতে রেলযোগে ঢাকায় যান। ঢাকায় ফিরে গিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে বাংলার দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াবার আহবান জানান। তার সে আহবানে সাড়া দিয়ে দুর্গতদের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর সাহায্য আসে। দুর্গত এলাকার জন্য পরিবর্তন হয় নির্বাচনের তারিখ।
’৭২ এর ২২ জুন
২২ জুন ১৯৭২। সেদিন আবহাওয়া ছিল মেঘ-রোদ্দুুরের লুকোচুরি খেলার মতো। বড়রা কাজে থাকলে শিশুরা যা করে অনেকটা ওই রকম। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী জেলা নোয়াখালীতে রাষ্ট্র প্রধান হয়ে প্রথম আগমন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে যা আছে তা দিয়েই বরণ করার জন্য আকুতিভরা আয়োজন চলে। পুরো শহর (মাইজদি) জুড়েই ক’দিন আগ থেকে মানুষের স্রোত। হাতিয়া, সন্দ্বীপ, চরজব্বর, কোম্পানীগঞ্জ, রামগতি, লক্ষীপুরসহ চরাঞ্চলের মানুষ ছুটে আসে মাইজদিতে। শহরের আবাসিক হোটেল, আত্মীয়, অনাত্মীয়ের বাসা-বাড়িতে ওঠে। কে কার আগে তাকে এক নজর দেখবে এজন্য প্রতিযোগিতা লেগে যায়। মানুষের জটলা শহরের বিশেষ বিশেষ স্থানে। চর্চা চলে সংগীতানুষ্ঠানের, শহীদ ভুলু স্টেডিয়ামের খেলার মাঠ জুড়ে জনসভার প্রস্তুতি। মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সরকারি আমলা, কর্মচারী, শিক্ষক, সাংবাদিক, মজুর, তাঁতী, জেলে, কুমোর, পৌরসভার হরিজনদের মধ্যেও সে কি আনন্দ! কর্তব্যরত নিরাপত্তা রক্ষীদের মাঝেও জিজ্ঞাসু দৃষ্টি, কখন আসবে ইতিহাসের মহাকবি! ইতিহাসের বরপুত্র শেখ মুজিবর রহমান এখন সরকার প্রধান। তাই তাঁর সফরে প্রটোকলের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। গাড়ির বহর এসে গেছে বর্তমান পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার মাঠে। এখানেই অস্থায়ী হ্যালিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। জননেতা আবদুল মালেক উকিলসহ মন্ত্রী পরিষদের কয়েকজন সদস্য, এমপি, সচিব, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও গার্ড অব অনার দেয়ার জন্য পুলিশের একটি চৌকস দল মাঠে অবস্থান নিয়েছে। সে দিন স্বাভাবিক ভাবেই ছিল হাজার হাজার মানুষের ঢল। নিরাপত্তা বেষ্টনী যেন ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম। সকাল ১১টা, উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে পরম আগ্রহ। জনক কখন আসবেন। মাঝে মাঝে গগনভেদি শ্লোগান একাকার Ñজয়বাংলা, জয় বঙ্গঁবন্ধু। হঠাৎ উড়ন্ত পাখির ছানার মত পশ্চিম আকাশে তাকে বহনকারী হ্যালিকপ্টার দেখা গেল, সাথে সাথে জনতার সেøাগান আরো বেগবান হলো। হ্যালিকপ্টারের আওয়াজ আর জনতার সেøাগান একাকার হয়ে গেল। হ্যালিকপ্টার অবতরণের পর দরজা খুলে গেল, বাঙালির স্বাভাবিক উচ্চতার চাইতে আরো বেশি উচ্চতার শেখ মুজিবর রহমান কিছুটা ন্যুব্জ হয়ে বেরিয়ে এলেন, তার প্রিয় জনতার কাতারে। হাত নেড়ে সম্ভাষণ জানালেন, জনতার অভিনন্দনের জবাব দিলেন, চিরাচরিত স্বভাবে দু’হাত তুলে। মাঠের একপাশে অভিবাদন মঞ্চে না গিয়ে তিনি জনতার কাছাকাছি চলে এলেন, জনতা নিরাপত্তা বেষ্টনী কিছুটা ভেঙ্গে ফেললো, বঙ্গবন্ধুকে দেখে মনে হলো রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে অস্বস্তি তাঁর। তাঁর স্বভাবসুলভ মুখের হাসিটি ছিল অমলিন। কয়েকজন পরিচিতকে নাম ধরে ডাকলেন, ইশারা করলেন দেখা করার জন্য। তারপর গার্ড অব অনার নিয়ে নির্ধারিত গাড়িতে উঠে সার্কিটহাউস গেলেন। সার্কিটহাউসের হল কক্ষে বসেই যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের তালিকা দেখে শহীদ পরিবারের সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিলেন। বিকাল তিনটায় শহীদ ভুলু স্টেডিয়ামে ভাষণ দিলেন, লক্ষ জনতার উদ্দেশ্যে। তিনি জেলার অনেক রাজনৈতিক কর্মী, বিশিষ্ট জনের নাম উল্লেখ করে স্মৃতিচারণ করলেন। নোয়াখালীর জনগণের অনেক প্রশংসা করে তিনি বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে এ জেলার সূর্য সন্তানদের অবদান কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করলেন। জনতাকে আহ্বান জানালেন দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্য। রাতে সার্কিটহাউসে শহীদ পরিবারের সদস্য, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, প্রবীণ কয়েকজন দলীয় কর্মীকে ডেকে পাঠান। তাদের সাথে সাক্ষাৎ কুশল বিনিময় করেন। কয়েক জনকে আর্থিক সাহায্যও করেন।
’৭২ এর ২৩ জুন
২৩ জুন ১৯৭২ সালে বিদায়ের প্রাক্কালে নাস্তার টেবিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নাস্তা পরিবেশন করার সময় বেয়ারাদের কাছে ডাকলেন। তাদের কুশল ও পারিবারিক অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন। প্রশাসককে বললেন, ওদের প্রত্যেককে চরে জমি বন্দোবস্ত দাও। বললেনÑ আমি আইন করব, যাতে গরীব মানুষ সহজে জমি পায়। এরপর র্সাকিট হাউসের গেটের উত্তর পাশে দু’টি পবন গাছের চারা লাগিয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। পরে নোয়াখালী প্রেসক্লাব ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। রামগতি চর পোড়াদহে উপকূলের মানুষকে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার কর্মসূচি মাটির কেল্লা ও গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। সেখানে এক জনসভায় বক্তব্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঢাকায় ফিরে যান।
উপসংহার
‘তোমার নামেই ধন্য স্বদেশ
তুমি আমার শ্রদ্ধা অশেষ
ইতিহাসে মহীয়ান
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবর রহমান।’
(আসলাম সানী)

অনন্তকালের নেতা বাংলার শেখ মুজিবর রহমান বাঙালিজাতির জনক। এ বীরের জাতির পথ প্রদর্শক তিনি। তাকে ইতিহাসের কোনো অধ্যায় থেকে মুছে ফেলা যাবে না। কেননা তিনি বাঙালি জাতির অস্তিত্বে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল। দুঃখজনক হলেও সত্য নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি সঠিকভাবে এখনো উপস্থাপন করা হয়নি। সংরক্ষণ করা প্রয়োজন তার হাতে লাগানো দুটি গাছ, প্রেসক্লাবের ভিত্তিপ্রস্তর এবং পোড়াদহের মাটির কেল্লা। যা হবে আমাদের নোয়াখালীর ইতিহাস-ইতিহ্যের অবিস্মরণীয় উপাদান।
-এ কে এম গিয়াস উদ্দিন মাহ্মুদ