Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

লক্ষ্মীপুর মজু চৌধুরীর হাট পর্যটন কেন্দ্র

॥ মোঃ ফখরুল ইসলাম ॥
নামকরণ ঐতিহ্য
জানা যায়, এ জায়গার পূর্ব নাম ছিল রহমতখালী। পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার শাকচর ইউনিয়নের অধিবাসী পানা মিয়া হাজীর দ্বিতীয় পুত্র মজু চৌধুরী এ এলাকায় এসে বহু জায়গা-জমি ক্রয় করেন। সে সময় তাঁর মতো প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী কোনো ব্যক্তি সে এলাকায় ছিল না বলে জানা যায়। তাঁর প্রতিপত্তি, প্রভাব, যশ ও খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কালক্রমে তাঁর নামে এলাকার হাটের নাম মজু চৌধুরীর হাট নামে পরিচিতি লাভ করে। হাটটির বর্তমান পরিসর প্রায় ২ কি.মি. এবং চান্দিনা ভিটি রয়েছে প্রায় ৫০০টি। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বাজারটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
মজু চৌধুরীর হাট পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থান ও যাতায়াতের গুরুত্ব
মজু চৌধুরীর হাট লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাধীন চররমনী মোহন ইউনিয়নের রমনী মোহনা গ্রামে অবস্থিত। জেলা সদর থেকে এর দূরুত্ব ১২ কি.মি.। অবস্থানের দিক থেকে মজু চৌধুরীর হাট বর্তমানে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১১টি জেলার জনগণ এখন মজু চৌধুরী ফেরী ঘাটের উপর দিয়ে রাজধানী ঢাকা ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামে যাতায়াত করেন। নদীপথে স্বল্পসময়ে নিরাপদে যাতায়াত কিংবা পণ্য পরিবহনের জন্য মজু চৌধুরী হাট এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বরিশাল ও খুলনা বিভাগের প্রায় প্রতিটি জেলা বিশেষ করে ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, বরগুনা, ঝালকাঠির সাধারণ মানুষ এ পথে স্বল্পসময়ে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে পারেন। অপরদিকে চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার মানুষ এ পথেই এখন বরিশাল বিভাগের জেলাসমূহে যাতায়াত করেন।
লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট থেকে ভোলার ইলিশা ঘাট পর্যন্ত প্রতিদিন ৩/৪টি ফেরী চলাচল করে। এতে প্রতিদিন ৬০/৭০টি বাস ও ট্রাক যাতায়াত করে। ফেরীতে সময় লাগে ৩/৪ ঘন্টা। এছাড়াও এ ফেরী ঘাট থেকে প্রতিদিন ভোলা, বরিশাল ও খুলনার সাথে অনেকগুলি উন্নতমানের লঞ্চ চলাচল করে।
মজু চৌধুরীর হাট পর্যটন কেন্দ্রের গুরুত্ব
মজু চৌধুরীর হাটটি মেঘনা নদীর কোল ঘেঁেষ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য বেষ্টিত মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। এখানে রয়েছে ফেরী ও লঞ্চঘাট বা টার্মিনাল। ঘন্টায় ঘন্টায় আসে বিভিন্ন জেলা থেকে ২ তলা ৩ তলা উন্নতমানের লঞ্চ। এখানে যাত্রী সাধারণের কোলাহল ও ভীড় রাতদিন লেগেই থাকে। আরও রয়েছে নদীতে হাজারো জেলের রঙ্গিন পাল তোলা নৌকার অপরূপ দৃশ্য। রহমতখালী থেকে মেঘনা নদী পর্যন্ত নদীর দু’ধারে রয়েছে নানা জাতের গাছ লাগানো সবুজ ছায়াঘেরা দৃশ্য, যা মন কেড়ে নেয়।
মেঘনার ইলিশ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিদেশেও এর সুনাম রয়েছে। সেই মেঘনা নদীতে জেলেদের ঐতিহ্যবাহী রূপালী ইলিশ মাছ ধরার কৌশল স্বচক্ষে দেখার দৃশ্য দেখতে হলে এবং আনন্দ উপভোগ করতে হলে এখানে এসে যান্ত্রিক নৌকা/ট্রলারে চড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো যায় মনের আনন্দে। একদিকে গায়ে নির্মল হাওয়া লাগিয়ে অপরদিকে দু’নয়নে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাখেলা উপভোগ করা যায়। সেই সাথে মনের আনন্দে উপভোগ করা যায় পড়ন্ত বিকেলে লাল আভায় সূর্য অস্ত যাওয়ার এক অপূর্ব মনোরম দৃশ্য। মজু চৌধুরীর ঘাট স্লুইচ গেট (রেগুলেটর) পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড রহমতখালী নদীর উপর পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৪ জানালা বিশিষ্ট সøুইচ গেট নির্মাণ করেছে। পানি নিষ্কাশনের সময় যখন সøুইচ গেটের জানালাগুলো খুলে যখন পানি বের করা হয়, তখন পানির স্রোতের দৃশ্য এবং শোঁ শোঁ সুরের আওয়াজ শুনতে এক অনাবিল আনন্দ অনুভব হয়। স্লুইচ গেটের পশ্চিম পাশে জেলেদের নানা কৌশলে মাছ ধরার দৃশ্যও দেখার মতো। কেউ জাল দিয়ে, কেউ বড়শি দিয়ে আবার কেউ কেউ ডুব দিয়ে মাছ ধরেন। স্লুইচ গেটের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে রয়েছে কোস্টগার্ডের নৌ-ঘাটি ও জাহাজ। কোস্ট গার্ডের সৈনিকরা মজু চৌধুরী ঘাটের নিরাপত্তা বিধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। এখানে আরও রয়েছে জাহাজের ডক। এই ডকে যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ-ট্রলার ও ফেরী জাহাজের মেরামত করা হয়, যা দেখার মতো।
এখানে রয়েছে অনেকগুলি মাছের হ্যাচারী। এতে উৎপাদন করা হয় নানা প্রজাতির রুই, কাতল, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস ইত্যাদি মাছ।
সাইফিয়া দরবার শরীফ
মজু চৌধুরী হাট এলাকায় আরেক বিশেষ আকর্ষণ সাইফিয়া দরবার শরীফ। সাইফিয়া দরবার শরীফের পীর সাহেব কেবলা আলহাজ্ব শাহসুফী মুর্শিদে হক লক্ষ্মীপুরী হযরত মাওলানা মোঃ সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী আল কাদেরী আল চিশতী (মা:জি:আ:)। তিনি মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (রা) এর ৪১তম আওলাদ।
আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন এই দরবার শরীফের নির্মাণ শৈলী ও কারুকার্য খচিত নকশা যে কোনো দর্শনার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। প্রায় ৪০ একর জায়গা জুড়ে এই দরবার এরিয়ায় রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, কুতুবখানা, লংগরখানা, লাইব্রেরিসহ ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ও দাতব্য চিকিৎসালয়। এই দরবার শরীফের মসজিদে প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও আজানের মাধ্যমে পৃথক পৃথকভাবে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা হয়, যা বাংলাদেশে অন্য কোথাও পরিলক্ষিত হয় না। এছাড়াও প্রতিদিন এখানে ঈমান ও আমলের উপর বিশেষ বয়ান হয়, এতে শত শত ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশগ্রহণ করেন।
মজু চৌধুরী ঘাট ভ্রমণে যাওয়ার সময় আরও একটি বিশেষ আকর্ষণীয় দৃশ্য চোখে পড়বে, সেটি হলো শত শত সুপারি বাগান। (অর্থাৎ গুবাক তরুর সারি) রাস্তার দু’ধারে সুপারি বাগানের ভেতর দিয়ে যেতে সবুজ ঘেরা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। লম্বা সুপারিকুঞ্জ, লাল সবুজ সুপারি ফাঁকে ফাঁকে নারিকেল গাছ, গাছের ডাব ও নারিকেল কতইনা সুন্দর। ডাব নারিকেল ও সুপারি উৎপাদনে লক্ষ্মীপুর জেলা বাংলাদেশের শ্রেষ্ট জেলা হিসেবে পরিচিত।
যাতায়াত ব্যবস্থা
সড়ক পথে লক্ষ্মীপুর জেলা সদর তেমুহনী মোড় থেকে সিএনজি এবং বাস টার্মিনাল থেকে বাস চলাচল করে। ১২ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা। অপরদিকে ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে মজু চৌধুরী ঘাটের দূরত্ব ২৬ কি. মি. এবং বরিশাল থেকে ৭৬ কি. মি. দূরে অবস্থিত। বর্তমানে লক্ষ্মীপুর অংশের সড়ক যোগাযোগ উন্নত।
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
মজু চৌধুরীর হাট পর্যটন কেন্দ্রে খাওয়ার জন্য সাধারণ মানের বহু হোটেল রয়েছে, তবে থাকার জন্য এখনও হোটেল-মোটেল নির্মিত হয়নি। বিশেষ করে জেলাসদর নিকটবর্তী হওয়ায় এবং সেখানে বিভিন্ন মানের হোটেল থাকায় এবং দিনে দিনে ফিরে আসার সুযোগ থাকায় ভ্রমণার্থীদের মজু চৌধুরী হাটে অবস্থান করতে হয় না।
শেষ কথা
অল্প কিছুকাল আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লক্ষ্মীপুরে ভ্রমণে এসে অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যার মধ্যে মজু চৌধুরীর হাটকে নদী-বন্দর ঘোষণাও ছিল। এতে মজু চৌধুরীর হাটের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। অদূর ভবিষ্যতে এটি পূর্ণাঙ্গ নদী-বন্দরে পরিণত হবে।