Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

বহুমুখী প্রতিভার ও বর্ণিল গুণাবলির কর্মযোগী সেতু সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

"তোমার কীর্তির চেয়ে
তুমি যে মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায়
কীর্তিরে তোমার.."

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীর্তির চেয়ে কীর্তিমানকেই মহৎ বলেছেন। অমর কীর্তি তাজমহলের চেয়েও কীর্তিমান সম্রাট শাহজাহান মহৎপ্রাণ। মহৎপ্রাণ মানুষই অমর কীর্তির স্রষ্টা। সৃষ্টি কখনো স্রষ্টাকে অতিক্রম করতে পারে না। তাই সৃষ্টির চেয়ে স্রষ্টা মহৎ। যুগে যুগে মহৎ সৃষ্টির রূপকার মহৎপ্রাণ সব কীর্তিমান। তেমনই এক মহৎপ্রাণ কীর্তিমান পদ্মাসেতুর মহানির্মাণযজ্ঞের সাথে সম্পৃক্ত সেতু বিভাগের সচিব, বৃহত্তর নোয়াখালীর কৃতী সন্তান মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন। তাঁর নিরলস কর্মনিষ্ঠতায় পদ্মাসেতুর কাজ এখন সমাপ্তির পথে। শুধু পদ্মাসেতুই নয়। তাঁর অহর্নিশি নিরলস পরিশ্রমে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল, সাবওয়ে, মেট্রোরেলসহ বৃহৎ বৃহৎ মেগা প্রকল্পসমূহের কাজ দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। মূলত পদ্মাসেতুর বাস্তবকাজ ২০১৪ সাল থেকে শুরু করা হয়, তখন থেকেই এ সেতুর কাজের সাথে মাননীয় মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের মহোদয়ের একান্ত সচিব হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ২০১৯ সাল থেকে সচিব হিসেবে এ সেতু নির্মাণ কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত আছেন।

সরকারের সৎ-ন্যায়নিষ্ঠ, দূরদর্শী-প্রজ্ঞাবান, বিচক্ষণ সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন সুদীর্ঘ কর্মজীবনে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনে অনন্য অবদান রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কীর্তিমান মেধাবী তাঁর মেধার অনুপম স্বাক্ষরও রেখেছেন সমাজসেবাসহ জনকল্যাণমূলক নানা ব্যতিক্রমী কর্মকান্ডে। সদা হাস্যোজ্জ্বল, কর্মতৎপর, কীর্তিমান ও বৃহত্তর নোয়াখালীর কৃতিসন্তান মহৎপ্রাণ সেতু সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর বার্তা পত্রিকার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সস্নেহ স্মৃতি, পদ্মাসেতু ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্পসহ তাঁর মহৎ জীবনের নানা জানা-অজানা বিষয়ে একান্ত অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ লক্ষ্মীপুর বার্তা’র পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল দায়িত্ব পালনের অনুভূতি জানতে চাইলে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ, প্রজ্ঞাবান, ডায়নামিক সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন- সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনে আমার অনুভূতি অত্যন্ত আনন্দের ও অপরিসীম গর্বের। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের সময় সকলেরই স্বপ্ন থাকে জেলা প্রশাসক হওয়ার, সচিব হওয়ার। সেতু সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে আমি ৪ মাস বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় একসময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ছিল। পরবর্তীতে ঐ মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি অনেক কমে আসে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে আমি ৪ মাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। ২৮ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে আমি সেতু বিভাগে যোগদান করি। আমি পদাধিকারবলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালনে আমার অনুভূতি অবশ্যই আনন্দের ও গৌরবের।
তিনি বলেন, বর্তমানে সেতু বিভাগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্প হচ্ছে পদ্মাসেতু। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপের সোনালী ফসল হচ্ছে এই পদ্মাসেতু। আর এই বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মেগাপ্রকল্প পদ্মাসেতুর কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বপ্রথম নদীর তলদেশে টানেল অর্থাৎ ‘বঙ্গবন্ধু টানেল’ আমাদের সেতু বিভাগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পেরেও আমি গর্বিত বোধ করছি। একই সাথে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজগুলোও আমাদের সেতু বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা থেকে আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে জরুরিভাবে নির্মাণ করতে হবে। তাই সেগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি অর্থাৎ সমীক্ষার কাজ আমাদের চলমান রয়েছে। এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কাজগুলোর সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। একই সাথে আমার জীবনে এই কাজগুলো আজীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান স্মৃতি হিসেবে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে। যতদিন বেঁচে থাকি, এইসব কাজের মহামূল্যবান স্মৃতিগুলো আমার হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। পদ্মাসেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকা শহরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা থেকে আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিরসনে আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে নির্মাণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এই মেগা প্রকল্পগুলোর কাজের গতি বাড়িয়ে কীভাবে বাস্তবায়ন আরও ত্বরান্বিত করা যায়, সে লক্ষ্যে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমি সেতু বিভাগে যোগদান করার পর ২০২০ সালের মার্চ থেকে কোভিড প্যানডেমিক পরিস্থিতির মধ্যেও পদ্মাসেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল এইসব মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ থাকেনি, কাজ চলমান ছিল। তবে কাজ যে গতিতে হওয়ার কথা ছিল, সেই গতি অনুযায়ী হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা হলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পদ্মা সেতুর কাজ ২০২২ সালের জুনের মধ্যে সমাপ্ত করতে হবে। গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো আপোষ করা যাবে না। অপরদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলও ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগেই জনসাধারণের যানবাহন চলাচলের জন্য চালু করতে হবে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে একটি পিপিপি প্রকল্প, যা হযরত শাহজালাল এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ২০২২ সালে চালু করা হবে।

আপনার দৃষ্টিতে এ বিভাগে কী কী সমস্যা ও সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়েছে -এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে নিষ্ঠাবান ও বিচক্ষণ সেতু সচিব বলেন, সমস্যা আসলে প্রত্যেক বিভাগেই আছে। সেতু বিভাগ এবং সেতু কর্তৃপক্ষ দু’টির কাজই আমি দেখে থাকি। সেতু বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালে। অপরদিকে যমুনা সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে প্রথম যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ নামকরণ করা হয়। তখনই এখানে কিছু জনবল নিয়োগ করা হয়। কিন্তু আমাদের যে চাহিদা, সে চাহিদা অনুযায়ী জনবল সেখানে খুব কমই ছিল; আমি যোগদানের পরেই ইতোমধ্যে তিন পর্যায়ে জনবল নিয়োগ করেছি। আমরা ১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী, ১০ জন সহকারী পরিচালক এবং ৪ জন আইসিটি প্রকৌশলী নিয়োগ করেছি।
এছাড়া প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী এবং অফিস সহায়কও নিয়োগ করেছি। সব মিলিয়ে ৬৫ জনের মতো জনবল আমার এক বছর ছয় মাসের কর্মকালীন সময়ে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনবলের যে ঘাটতি, জনবল সংক্রান্ত যে সমস্যা ছিল -সে সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটিয়েছি। একইসাথে তাদেরকে আমরা বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও অধিকতর যোগ্য করে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী যারা আছেন, সুপারিন্টেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, প্রধান প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তা যারা আছেন; তাদেরকে দেশে-বিদেশে আমরা প্রশিক্ষিত করেছি। কর্মকর্তা-কর্মচারীর অফিসে বসার সমস্যা নিরসনকল্পে সেতু ভবনের উর্ধ্বমুখী ৫টি ফ্লোর নির্মাণ করা হয়। এর মাধ্যমে অফিসের স্থান সমস্যার সমাধান করেছি। তাই আমি মনে করি, এসবই সেতু বিভাগ এবং সেতু কর্তৃপক্ষের অন্যতম অর্জন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণা করেছিলেন। সেতু বিভাগ এবং সেতু কর্তৃপক্ষই একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান, যেখানে শতভাগ ই-নথি কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন- ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে আমরা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি যে, ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমেই শতভাগ নথি নিষ্পত্তি করব। ইতোমধ্যে আমরা সেটি অর্জন করেছি। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে অদ্য পর্যন্ত বিগত কয়েক মাসে আমরা ই-ফাইলিংয়ের দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আমার টেবিলে এখন আর কোনো ফাইল নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির আওতায় আমরা ই-নথি কার্যক্রম শতভাগ সম্পন্ন করেছি। এজন্য আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ের যেসকল কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, তাদেরকে আমরা প্রশিক্ষণ প্রদান করেছি। আমাদের এখানে আসলে অনেক সম্ভাবনা আছে। আমাদের দেশ নদীমাতৃক দেশ। টানেল নির্মাণের জন্য এক সময় বলা হতো যে, আমাদের সয়েল কন্ডিশন অত ভালো না। আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল নির্মাণ করা যাবে না। আশি নব্বইয়ের দশকে এরকম একটা ধারণা ছিল।
তিনি বলেন, আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মাণের ফলে কিন্তু সে ধারণার অবসান হয়েছে। সেখানে টানেলের একটা টিউব নির্মাণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়ে গেছে। আরেকটা টিউবের ইতোমধ্যে ৮০০ মিটারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা আশা করি, ২০২২ সালের মধ্যে এটা উদ্বোধন করা সম্ভব হবে। সকলের অবগতির জন্য জানাতে চাই, সেতু কর্তৃপক্ষের যে সাবওয়ে প্রকল্প, সেখানে ২৫৪ কিলোমিটার ফিজিবিলিটি স্টাডি চলমান রয়েছে। ৬৫% কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সাবওয়ে প্রকল্প ১১টি লাইনে সর্বমোট ২৫৪ কিলোমিটার পুরোপুরি এটি মাটির তলদেশে নির্মাণ করা হবে, সেটি কিন্তু করা সম্ভব। আমাদের এখানে একটি স্প্যানিশ কোম্পানি ‘টিপসা’ সাবওয়ের এই ফিজিবিলিটি স্টাডি বাস্তবায়ন করছে। তারা ইতোমধ্যে দু’টি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশ আসলে একটি বিরাট সম্ভাবনার জায়গা। ঢাকা শহরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ ভবিষ্যতে আমাদের আরো অনেক কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্রিজ নির্মাণ করলে সেখানে অনেক বেশি হাইট দিতে হয়। আমাদের নৌচলাচল অক্ষুণœ রাখার স্বার্থে টানেল নির্মাণ করলে নদীর নাব্যতা, নদীর যে গতিধারা সেটা বাধাগ্রস্ত হয় না। সে কারণে আমাদের সেতু বিভাগের যে ম্যান্ডেট; ১৫০০ মিটার বা তার উপরের টানেল, ব্রিজ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কজওয়ে ইত্যাদি নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এটি আসলে বিরাট একটি সম্ভাবনার জায়গা। সেই সম্ভাবনার দিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সেতু বিভাগের কাজ আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, অচিরেই কিছু কিছু প্রকল্প যেমন পদ্মা ব্রিজ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ইত্যাদি দৃশ্যমান দেখতে পাওয়া যাবে।

সেতু বিভাগকে ঘিরে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে জনকল্যাণকামী প্রাজ্ঞ সচিব বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যাপক। শরীয়তপুর-চাঁদপুর ও ভোলা-লক্ষ্মীপুর ব্রিজের রোড মাস্টার প্ল্যান এবং ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য আমরা ইতোমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করেছি। ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এটা অনুমোদনের জন্য যাবে। ভবিষ্যতে আমাদের আরও ৪৭টি বিভিন্ন প্রকল্প আছে। বিভিন্ন জায়গায় সেতু নির্মাণ, কারখানা ব্রিজ, টানেল নির্মাণ, দক্ষিণাঞ্চলের চারটি বড় বড় ব্রিজ নির্মাণ, ভোলা-লক্ষ্মীপুর ব্রিজ নির্মাণ, ভোলা-বরিশাল ব্রিজ, শরীয়তপুর-চাঁদপুর ব্রিজ, আমতলী ব্রিজ, পায়রা নদীর উপর ব্রিজ, ভুলতা-আড়াইহাজারে মেঘনা নদীর উপর ব্রিজসহ আরো অনেক ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করেছি। এগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
তিনি বলেন, এছাড়া সাবওয়ের কথা আমি আগেই বলেছি। যেখানে ১১টি লাইন থাকবে, ঢাকা শহরের মাটির তলদেশে এটি বাস্তবায়িত হবে। বিভিন্ন জেলায় আমাদের আরো ৪৭টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। বিশেষ করে ঢাকা শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায়, চট্টগ্রাম ও বরিশালে আমরা যে প্রকল্পগুলি গ্রহণ করেছি, সে প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে আমাদের দেশ অনেক এগিয়ে যাবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সেটা বাস্তবায়ন করতে গেলে আমাদের এই অবকাঠামোগুলো নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নিরলসভাবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
নিজ জন্ম-এলাকা সম্পর্কে আপনার ভাবনার কথা জানতে চাচ্ছি। এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ কেমন এবং সে যোগাযোগ কীভাবে রক্ষা করে থাকেন -এমন জিজ্ঞাসার জবাবে বৃহত্তর নোয়াখালীর কৃতিসন্তান দূরদর্শী সচিব বেলায়েত হোসেন বলেন, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে আমার বাড়ি। গ্রামের স্কুলে আমি পড়াশোনা করেছি। চৌমুহনী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হয়ে অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। নিজ জন্ম-এলাকার জন্য নাড়ির টান অবশ্যই আমার আছে। শিকড়ের টানে আমি সময় সুযোগ করে এলাকায় গিয়ে থাকি। এলাকার সাথে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে। এলাকার মুরুব্বিগণ ও এলাকার জনসাধারণের সঙ্গে আমার নিবিড় যোগাযোগ আছে। এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম উন্নয়নের জন্য আমি অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, প্রত্যেক বছর আমাদের গ্রামে জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা করে থাকি। আমাদের একটা ফাউন্ডেশন আছে। সে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র অসহায় দুঃস্থ মায়েদের সেবা দেয়ার জন্যে হাজীপুর ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ১৮,০০০ করে টাকা দেয়া হয়। ইতোমধ্যে এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৫২২ জন দুঃস্থ অসহায় মাকে ডেলিভারিসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়েছে। এছাড়া রেফার করা হয়েছে প্রায় ২০০ জনকে।
তিনি আরও বলেন, নোয়াখালীর চৌমুহনীতে স্বল্পব্যয়ে স্বাস্থ্যসেবা দানের জন্য কমফোর্ট জেনারেল হসপিটাল এন্ড ডায়াবেটিক সেন্টার নামে একটি হাসপাতাল রয়েছে। আমার ছোট ভাই ডাক্তার কফিলউদ্দিন ঐ হাসপাতাল পরিচালনা করে। তার সহযোগিতায় সেখানে হেলথ ক্যাম্প করার পর গতবছর ১৫০ জনকে ছানি অপারেশনের জন্য সিলেক্ট করে আমরা ছানি অপারেশন করে দিয়েছি। একই সাথে এবারও গত ১২ ফেব্রুয়ারি আমরা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের হাজিপুরে হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা করেছি। এটা যমুনা ব্যাংক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে এবং কমফোর্ট জেনারেল হসপিটালের সহযোগিতায় আমরা করে থাকি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সেখানে ১২০ জনের চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে। সেখানে পাঁচ লক্ষ টাকার ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে। গত ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি হেলথ ক্যাম্প করা হয়েছে। গত ৬ মার্চ লক্ষ্মীপুর সদরের পশ্চিম নন্দনপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়েছে। এ ক্যাম্পে ঢাকা ও চৌমুহনী থেকে শিশু, মেডিসিন, গাইনি, চক্ষু, ডায়বেটিস বিশেষজ্ঞ ও ডেন্টিস্ট ছিলেন। তাঁরা স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন।
তাই আমি বলতে চাই যে, এলাকার সন্তান হিসেবে নিজ জন্ম-এলাকার প্রতি আমার প্রচন্ড রকমের টান আছে। এলাকার যোগাযোগ ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে আমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের মন্ত্রী মহোদয় জনাব ওবায়দুল কাদের, তিনিও আমাদের এলাকায় গিয়ে থাকেন। সড়ক পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় যে উন্নয়ন কাজগুলো আছে, সে কাজগুলো আমরা করে যাচ্ছি। সড়ক পরিবহন এবং সেতু মন্ত্রণালয়ে যে পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, আমি মনে করি- সেগুলো বাস্তবায়িত হলে গ্রেটার নোয়াখালীতে বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে। তিনি আরও বলেন, নোয়াখালীর সন্তান হিসেবে শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন স্কুলের ভবন নির্মাণে আমার অবস্থান থেকে যতটুকু সহায়তা করা সম্ভব আমি তা করে যাচ্ছি এবং এই সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। এলাকার উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন করা সম্ভব। পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি নেই যারা শতভাগ শিক্ষিত, কিন্তু অনুন্নত। আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ৫০ বছর পূর্তি পালন করছি। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করতে পারিনি। বলা হয়, আমাদের সাক্ষরতার হার ৭০%, কিন্তু তারা লিখতে ও পড়তে পারলেও প্রকৃত শিক্ষিত বলতে যা বোঝায়, তারা তা না। শতভাগ প্রকৃত শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে হলে শিক্ষায় বিনিয়োগ অবশ্যই আরো বাড়াতে হবে। উন্নত দেশ গড়তে হলে আমাদের শিল্পক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গ্রামকে আমাদের উন্নয়নের আওতায় আনতে হবে। গ্রাম বাংলার একজন সন্তান হিসেবে আমি গ্রামের উন্নয়নের জন্য প্রতিনিয়ত চিন্তা-ভাবনা করি এবং নিয়মিত সময় করে গ্রামে গিয়ে থাকি।

বৃহত্তর নোয়াখালীর সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন কি, কেন -এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সুদক্ষ সেতু সচিব বলেন, অবশ্যই বৃহত্তর নোয়াখালীর সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে আমি গর্ববোধ করি। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আমার বাড়ি। বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনী, লক্ষ্মীপুরও আমার খুবই কাছের। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে আমি আট বছর ছিলাম। যেহেতু আমি রাস্তাঘাট এবং ব্রিজ নির্মাণের সাথে জড়িত, সেকারণেই বিভিন্ন এলাকায় আমি যাই; যেমন- লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনীসহ দেশের প্রত্যেক জেলায় আমি একাধিকবার গিয়েছি। অবশ্য নোয়াখালী যেহেতু আমার নিজের জন্মস্থান, সেহেতু বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রতি একটা আলাদা টান আমার অবশ্যই আছে। বৃহত্তর নোয়াখালীর রাস্তাঘাটের উন্নয়নে, শিক্ষার উন্নয়নে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে আমার অবস্থান থেকে আমি আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। সবাই বলে, বৃহত্তর নোয়াখালী যাদের বাড়ি; তাদের নিজের জন্মস্থানের প্রতি নাড়ির টান একটু বেশিই। আমি এটা নিয়ে খুবই গর্ববোধ করি। বৃহত্তর নোয়াখালীর সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে আমি সবসময়ই গৌরবান্বিত বোধ করি। বৃহত্তর নোয়াখালীর সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।

জন্মস্থানকে ঘিরে আপনার এমন কোনো স্মৃতি আছে কি, যা আজও আপনার মনকে দোলা দেয় -এমন জিজ্ঞাসার জবাবে বেলায়েত হোসেন বলেন, অবশ্যই জন্মস্থানকে ঘিরে আমার অনেক স্মৃতি আছে, যা আজও মনকে দোলা দেয়। এরমধ্যে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়, সে বিষয়টি হচ্ছে- মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের ঘটনা। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের সম্ভবত ১১ তারিখ, রাজাকার আলবদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রাম আক্রমণ করে। তখন আমি ক্লাস ফোর থেকে কেবল ক্লাস ফাইভে উঠেছি। আমাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা ছিল। সে কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলার টার্গেট ছিল আমাদের বাড়ি। যখন আমরা টের পেয়েছি যে আমাদের বাড়িতে হামলা হবে, আমাদের পার্শ্ববর্তী হাজীপুর হাইস্কুল ও প্রাইমারি স্কুলের পাশের বাজারে হানাদার বাহিনী হামলা করে আগুন লাগিয়ে দেয়। তখন আমরা মা-ভাই-বোনসহ সকলে নৌকায় করে পার হয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের নৌকা লক্ষ্য করে হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। গুলিবর্ষণের ফলে আমার পাশেই ছিল জেঠাতো ভাই তাহের, তার বুকে ও হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়। আমার ভাতিজা আবুল বাশার মানিক হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। তারা মারাত্মকভাবে আহত হয়। আমরা নৌকায় তখন আমাদের পুরনো বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম। আমাদের পুরনো বাড়ি ছিল আধা কিলোমিটার দূরে। সেই পুরনো বাড়িতে যাওয়ার আগে আমরা দূর থেকে দেখি, সেখানে রাজাকার ও মিলিটারিরা বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তখন বাধ্য হয়ে নৌকা ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। তারা নৌকা নিয়ে আমাদের ধাওয়া করতে সাহস পায়নি। কারণ, তারা মনে করেছিল যে, আমাদের এইদিকে মুক্তিযোদ্ধারা আছে। তাদের মনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটা বিরাট ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছিল। পরবর্তীতে স্থানীয় শান্তি কমিটির লোকজন রাজাকার ও পাকহানাদার বাহিনীকে সরিয়ে নেয়। পরে আমরা অনেক কষ্টে আমাদের পুরাতন বাড়িতে আশ্রয় নেই। মানিক ও তাহেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমাদের গ্রামের দুইজনকে রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনী সেদিন হত্যা করে। তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল মোস্তফা, আরেকজনের নাম আমার মনে নেই। আমাদের বাড়ির সামনের বাজার, স্কুল এবং অনেকগুলো হিন্দুবাড়ি সেদিন তারা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে ভাস্বর হয়ে আছে। যদিও আমি সেসময় খুবই ছোট ছিলাম। ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন বয়স মাত্র ৯ বছর। কিন্তু সবকিছু আমার খুবই স্পষ্ট মনে আছে। এখন মনে হয়, ঐদিনতো আমিও গুলিবিদ্ধ হতে পারতাম। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যেতে পারতাম। মহান আল্লাহর কাছে আমি লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করি এজন্য যে, আল্লাহ সেদিন আমাকে বাঁচিয়েছেন। আমার জেঠাতো ভাই তাহের ও ভাতিজা মানিক সেইদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতরভাবে আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করে আজো ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু দু’জনকেই পরবর্তীতে পুরস্কৃত করেছেন। ১৯৭২ সালে তাদেরকে বঙ্গবন্ধু ৫০০ টাকা করে দিয়েছিলেন। তখন ৫০০ টাকার অনেক দাম ছিল। বঙ্গবন্ধু তাদেরকে একটা করে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। এটা তাদের জীবনে অনেক সম্মানের বিষয় ছিল। একাত্তরের এই ভয়ঙ্কর স্মৃতি আমার আজও মনে আছে এবং আমৃত্যু মনে থাকবে। এখনো মাঝে মাঝে সেই স্মৃতি মনে পড়লে আমি ভয়ে আতঙ্কে শিউরে উঠি। একাত্তরের এই ভয়ঙ্কর স্মৃতি নিয়ে আমি আগে কয়েক জায়গায় লিখেছি।
তিনি বলেন, স্মৃতির প্রসঙ্গে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমার একটি মধুর স্মৃতি মনে পড়ে। আমার বাবা আলহাজ্ব কামাল উদ্দিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নোয়াখালীর চৌমুহনী হেলিপ্যাড ময়দানে জনসভায় এসেছিলেন। বাবা আমাকে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার বড় ভাই তখন ক্লাস ফাইভে আর আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। আমাদের খুব ইচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে তাঁকে সালাম ও কদমবুসি করা। কিন্তু আমরা সে সুযোগ পাচ্ছিলাম না।
’৭০ সালের নির্বাচনে নূরুল হক সাহেব ছিলেন এমপি পদপ্রার্থী। নূরুল হক সাহেবের বাসায় বঙ্গবন্ধু দুপুরের খাবার খাবেন। নূরুল হক সাহেব ও আমার বাবা আলহাজ্ব কামাল উদ্দিন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধু। তাই বাবা নূরুল হক সাহেবের বাসায় আমাদের নিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু যে রুমে ছিলেন, সে রুমে নূরুল হক সাহেবের সাথে বাবা আমাদের নিয়ে গেলেন এবং বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিয়ে কদমবুসি করতে বললেন। আমরা দেখলাম, বেশ কয়েকজন মুরুব্বি বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে বসে আছেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখে কোমলভাবে হেসে হাত নেড়ে কাছে ডাকলেন। আমরা দু’ভাই বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দিলাম এবং তাঁর পায়ে কদমবুসি করলাম। তিনি আমাদের দু’ভাইকে সস্নেহে কোলে বসিয়ে আদর করলেন। বঙ্গবন্ধু আমার মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাতের সেই স্নেহের স্পর্শ যেনো আজও আমার মাথায় অনুভব করি। আমার মাথায় বঙ্গবন্ধুর হাতের সেই সুকোমল সস্নেহ স্পর্শ আজও হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর হাতের সস্নেহ স্পর্শ এখনো আমার বুকে শিহরণ জাগায়, আমি অপার শ্রদ্ধা ও আবেগে অভিভূত হই। বঙ্গবন্ধুর সেই সুকোমল স্পর্শ আমার জীবনে এক অনুপম স্বর্ণোজ্জ্বল স্মৃতি। যতদিন আমি বেঁচে থাকবো, আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় বঙ্গবন্ধুর সেই সস্নেহ স্পর্শস্মৃতি চিরজাগরুক হয়ে থাকবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে কোমলহৃদয়ের শিশুঅন্তঃপ্রাণ মানুষ ছিলেন, তা এখনও আমাকে অভিভূত করে। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে এই স্বর্ণোজ্জ্বল স্মৃতি আর ১৯৭১ সালে পাক-হানাদার বাহিনীর সেই নারকীয় দুঃসহ স্মৃতি, দু’টি স্মৃতিই আমার জীবনের অবিস্মরণীয়; যা আমার আমৃত্যু মনে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে।

আপনার দৃষ্টিতে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার প্রধান সমস্যা কী কী? এসব সমস্যা সমাধানে আপনার পরামর্শ বলবেন কী -এমন প্রশ্নের জবাবে নিষ্ঠাবান ও বিচক্ষণ সচিব বেলায়েত হোসেন বলেন, আমার দৃষ্টিতে বৃহত্তর নোয়াখালীর তিনটি জেলা নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের প্রধান সমস্যা হলো, শিক্ষার সংকট। বর্তমানে শিক্ষার এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আগে বিসিএস ক্যাডারে বৃহত্তর নোয়াখালীর অনেক কর্মকর্তা দেখা যেতো। বিশেষ করে আশি-নব্বইয়ের দশকে বিসিএস ক্যাডারে বৃহত্তর নোয়াখালীর অনেক কর্মকর্তা ছিল। শুধু নব্বইয়ের দশকে একসময় এই সচিবালয়েই ১৪ জন সচিব ছিল বৃহত্তর নোয়াখালীর। এখন সেটা সুদূর অতীত। এখন বিসিএস ক্যাডারে বৃহত্তর নোয়াখালীর উঠতি প্রজন্মের আসার হার অনেক কমে গেছে। সিভিল সার্ভিসে আমাদের ব্যাচের ৫৫০ জনের মধ্যে বৃহত্তর নোয়াখালীরই ৩৮ জন ছিল। এখন ৫/৭ জনও পাওয়া মুশকিল। এই কিছুদিন আগে ৩২ জন কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ১ জন আমাদের এখানে জয়েন করেছে। তাই আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে আরও অগ্রণী ভূমিকা রেখে এগিয়ে আসতে হবে। নোয়াখালীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। লক্ষ্মীপুরেও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া অতীব জরুরি। নোয়াখালীতে আরও একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া দরকার। এছাড়া প্রত্যেক উপজেলায় কারিগরি স্কুল-কলেজ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। শুধু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত বেকার তৈরি করলে হবে না। আমাদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত টেকনিক্যাল জনগোষ্ঠী দরকার।
তিনি বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এখন শিক্ষার ক্ষেত্র আরও উন্নত করতে হবে। হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে হবে। মানুষের মৌলিক যে পাঁচটি চাহিদা- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা; এই পাঁচটি মৌলিক চাহিদা সুনিশ্চিত করতে হবে। এগুলো সুনিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তবে সরকারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশকে উন্নয়ন-অগ্রগতিতে এগিয়ে নিতে শিক্ষার মান বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বৃহত্তর নোয়াখালীর উন্নয়নে এসব বিষয়ে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই বৃহত্তর নোয়াখালীর সামগ্রিক উন্নয়ন সাধিত হবে। সেইসাথে তরুণ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্যের জন্য খেলাধূলা ও মানসিক বিকাশ ঘটাতে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। মাদকের করাল গ্রাস থেকে তাদের রক্ষা করতে এসবের কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলার মাধ্যমে শরীরচর্চাও হয়, মনও ভালো থাকে। মাদক থেকেও তরুণ প্রজন্মকে দূরে রাখা যায়। সৃজনশীলতার মাধ্যমে তাদের মেধারও বিকাশ ঘটে। কালচারালি বৃহত্তর নোয়াখালী খানিকটা পিছিয়ে আছে। শিক্ষার্থীদের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের মাধ্যমে সেই জায়গাটাতে এগিয়ে আনতে হবে। বৃহত্তর নোয়াখালীর তরুণ প্রজন্মকে কালচারাল অ্যাক্টিভিটিসে এগিয়ে আনার মাধ্যমেই সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।

আপনার নিজ এলাকায় কোনো জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন কি -এমন প্রশ্নের জবাবে কল্যাণকামী ব্যক্তিত্ব বেলায়েত হোসেন বলেন, বাবা-মায়ের নামে আমাদের একটা ফাউন্ডেশন আছে, ‘কামাল-মনোয়ারা ফাউন্ডেশন’। সেই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমরা এলাকার গরীব দুঃস্থ অসহায় আর্ত-মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছি। একইসাথে দুঃস্থ অসহায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়া হচ্ছে এই ‘কামাল-মনোয়ারা’ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে। আমার ছোটভাই একটা হাসপাতাল পরিচালনা করে। যারা দরিদ্র রোগী, তাদেরকে বিনা পয়সায় ঔষধ দেয়া হয়। একইসাথে হতদরিদ্র রোগীদের অপারেশনের খরচ মওকুফ করে দেয়া হয় এ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে। আমাদের এই কামাল-মনোয়ারা ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে হতদরিদ্র দুঃস্থ অসহায় মানুষের সার্বিক সেবা সুনিশ্চিত করা। এ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে হাজীপুর বেগমগঞ্জে মাতৃসেবা কেন্দ্রে মহিলাদের প্রসব সুবিধাসহ অন্যান্য সেবা দেয়া হয়ে থাকে। এলাকায় আমাদের একটা লাইব্রেরিও আছে। সেই লাইব্রেরিতে এলাকার উৎসাহী তরুণ-তরুণীরা পড়াশোনা করতে আসে। উন্নতমানের ভালো কালেকশনের কিছু বই আমি এই লাইব্রেরিতে রেখেছি। এলাকার উৎসাহী তরুণ-তরুণীরা যাতে ভালো বই পড়ে উপকৃত হতে পারে। আমি মনে করি, এই লাইব্রেরি সামগ্রিকভাবে এলাকার তরুণ-তরুণী এবং যুবসমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। ‘কামাল-মনোয়ারা ফাউন্ডেশন’ এবং এই লাইব্রেরি আমাদের এলাকার তরুণ-তরুণীদের মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে আমি মনে করি।

সরকারের সচিব কিংবা প্রজাতন্ত্রের ঊর্ধ্বতন নির্বাহী হিসেবে আপনার সুদীর্ঘ কর্মজীবনের দু’একটি সফল কর্মকান্ডের কথা বলবেন কি, যা অন্যদেরকে উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাতে পারে -এমন জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে নিষ্ঠাবান ও বিচক্ষণ সচিব বেলায়েত হোসেন বলেন, আমি সেতু বিভাগে যোগদানের আগে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে ছিলাম। তারও আগে আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলাম। তখন আমি অনেক তরুণ চাকরি প্রার্থীদের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করেছি। নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার পর্যন্ত রাস্তা পুরোপুরি চার লেন হচ্ছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে থাকার সময় এই কাজের বিষয়ে আমি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলাম। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উন্নয়ন কাজগুলো আমি দেখতাম। মাইজদী থেকে সোনাপুর, দাগনভূঞা, জোরারগঞ্জ হয়ে মিরেরসরাই পর্যন্ত সংযোগ সড়কের কাজগুলি আমি নিজ দায়িত্বে ও তত্ত্বাবধান করেছি। সেখানে ছোট ফেনী নদীর উপর ব্রিজও হয়ে গেছে। ঐদিক দিয়ে এখন সহজেই চট্টগ্রাম যাওয়া যায়। এই যে কাজগুলো, এগুলি আমি নিজ দায়িত্বে তত্ত্বাবধান করেছি। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত রাস্তাটিও চার লেনে করার কাজ চলছে। এছাড়াও বেগমগঞ্জ চৌমুহনী থেকে হাজীপুর পৌরনবিবির হাট-কবির হাট-ফলাহারী পর্যন্ত ১৬ কি:মি: দীর্ঘ আমার বাবার নামে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী কামাল উদ্দিন সড়কের নির্মাণ কাজ আমার আন্তরিক প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে। এইসব কাজের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম। আশা করি, খুব দ্রুতই কাজগুলো সম্পন্ন হবে। উপজেলা পর্যায়ের কিছু কিছু সড়ক খানাখন্দে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, সেগুলো আমরা সড়ক বিভাগের আওতায় এনে সংস্কার করে দিয়েছি। বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং সংস্কারের জন্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পেরেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি। আমি যতদিন দায়িত্বে আছি, আমার এলাকা এবং সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমি ভূমিকা রাখব বলে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। মাননীয় মন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদেরের দিকনির্দেশনায় আমরা এ কাজগুলো করছি।

নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী -এই তিন জেলাকে ঐক্যের চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায় বলে আপনি মনে করেন -এমন প্রশ্নের জবাবে এলাকাপ্রেমী ব্যক্তিত্ব বেলায়েত হোসেন বলেন, নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর ও ফেনী এই তিন জেলার মানুষের মধ্যে একটা চমৎকার বন্ধন আছে, একটা চমৎকার ঐক্য আছে। ঢাকায় গ্রেটার নোয়াখালীর একটা কর্মকর্তা ফোরামও আছে। এই ফোরামে আমি সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছি। নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী; এই তিন জেলাকে ঐক্যের চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে এই ফোরাম চমৎকার ভূমিকা রাখতে পারে। নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী এই তিন জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট ইত্যাদি গড়ে তুলতে এই ফোরাম শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আমাদের যারা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী রয়েছেন, সমাজসেবী রয়েছেন; তারা যদি কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য এগিয়ে আসেন, তাহলে তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। এই মুহূর্তে আমাদের গ্রেটার নোয়াখালীর পাঁচজন সচিব সচিবালয়ে কর্মরত আছেন। এসডিজির মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজসহ নৌপরিবহন সচিব, বিদ্যুৎ সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিব, এরা সবাই বৃহত্তর নোয়াখালীর। আমরা সকলে মিলে মন্ত্রণালয়ে কর্মরত বৃহত্তর নোয়াখালীর সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব, উপসচিব থেকে শুরু করে যে যেখানে যে অবস্থায় কর্মরত আছি, সেই অবস্থা থেকেই যদি বৃহত্তর নোয়াখালীর উন্নয়নের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই, তাহলে সামগ্রিকভাবে বৃহত্তর নোয়াখালীর উন্নয়ন-অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

বৃহত্তর নোয়াখালীর একমাত্র নিয়মিত মুখপত্র লক্ষ্মীপুর বার্তা’র মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে বেলায়েত হোসেন বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীর একমাত্র নিয়মিত মুখপত্র লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সাথে আমি অনেক আগে থেকেই পরিচিত। যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন থেকেই আমি লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সাথে পরিচিত। লক্ষ্মীপুর বার্তা বৃহত্তর নোয়াখালীর দর্পণ। সুদীর্ঘ তিন যুগ ধরে লক্ষ্মীপুর বার্তা প্রকাশিত হচ্ছে জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। একটি আঞ্চলিক পত্রিকা হিসেবে লক্ষ্মীপুর বার্তা’র এত সুদীর্ঘ সময় টিকে থাকা খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার। এটি সম্ভব হয়েছে লক্ষ্মীপুর বার্তা’র প্রজ্ঞাবান সম্পাদক ড. এম হেলালের প্রজ্ঞা, মেধা ও একনিষ্ঠ কর্মকুশলতায়। আমি লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সম্পাদক ড. এম হেলালের সুদীর্ঘ জীবন ও নেপথ্যের সকল কলাকুশলীদের সাফল্য এবং লক্ষ্মীপুর বার্তা’র উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।

সেতু বিভাগের চৌকস ও ডায়নামিক সচিব
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন এর পরিচিতি

মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ২৮ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে সেতু বিভাগে যোগদান করেন। তিনি পদাধিকারবলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক। এই পদে যোগদানের পূর্বে তিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের একজন কর্মকর্তা। মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন ১৯৬২ সালের ১ জুন নোয়াখালী জেলাধীন বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামে এক সভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম হাজী কামাল উদ্দিন ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা; সমাজ হিতৈষী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সরকার পরিষদের জনপ্রতিনিধি। তাঁর মাতা মনোয়ারা বেগম আট সন্তানের গর্বিত জননী, তিনি ২০১৮ সালের ১৩ মে ‘গরবিনী মা’ হিসেবে ইউনিভার্সাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃক সম্মাননা লাভ করেন। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মা দিবস উপলক্ষে ১২ মে ২০১৮ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামের হাজীপুর আবদুল মজিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৯৬৭ সালে ১ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৭০ সালে ৪র্থ এবং ১৯৭১ সালে ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। এরপর একই ক্যাম্পাসের হাজীপুর আবদুল মজিদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৭২ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৭৭ সালে মাধ্যমিক এবং চৌমুহনী সরকারি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৭৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু আজন্ম মেধাবী বেলায়েত হোসেনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ছিল অদম্য আকর্ষণ ও একান্ত স্বপ্ন। তাই তিনি পরবর্তীতে ১৯৭৯-৮০ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে ১৯৮৩ সাল হতে ১৯৮৮ সালের মধ্যে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। অনার্স পরীক্ষার পরে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সরকারি চাকুরিতে যোগদানের পরে মাস্টার্স এবং পরবর্তীতে ২০১০ সালে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ডিউক ইউনিভার্সিটি, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, ভুটান, জার্মানী, ফ্রান্স, সুইডেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানে পেশাগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
বেলায়েত হোসেন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হিসেবে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ সালে সিরাজগঞ্জ কালেক্টরেটে সহকারী কমিশনার পদে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। তিনি ১৯৯২ সালে উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জয়পুরহাটের কালাই ও ক্ষেতলাল উপজেলায়, ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জয়পুরহাট কালেক্টরেটে, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও মানিকগঞ্জ জেলায় কর্মরত ছিলেন। তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে ১৯৯৯ এর আগষ্ট থেকে ২০০১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় এবং অক্টোবর ২০০১ থেকে অক্টোবর ২০০৩ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন। মে ২০০৬ থেকে জুলাই ২০০৬ পর্যন্ত যশোরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নভেম্বর ২০০৬ থেকে অক্টোবর ২০০৮ পর্যন্ত ভোলার জেলা প্রশাসক হিসেবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং জীবন বীমা কর্পোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন ও উন্নয়ন) হিসেবে অক্টোবর ২০০৮ থেকে জানুয়ারি ২০১২ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। জানুয়ারি ২০১২ থেকে জুন ২০১৯ তারিখ পর্যন্ত সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের একান্ত সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। অতপর ২৭ জুন ২০১৯ তারিখ থেকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ হতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব এবং ২৮ অক্টোবর ২০১৯ তারিখ হতে সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, ভুটান, জার্মানী, ফ্রান্স, সুইডেনে সরকারি কাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার-কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন।
বেলায়েত হোসেন ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী সৈয়দা শারমিন বেলায়েত একজন সুগৃহিণী। তাঁরা দুই পুত্র সন্তানের জনক-জননী। তাঁর বড় ছেলে সালিম সাদমান সময় এমআইএসটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন, ছোট ছেলে শাকির আদনান প্রত্যয় ইসলামিক ইউনির্ভাসিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) তে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিএসসি সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন।