Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

চিকিৎসা অবহেলার নির্মম শিকার লক্ষ্মীপুরের ডাক্তার দম্পতি!

সাধারণ মানুষের সঙ্গে অহরহ যা ঘটে, এবার তাই ঘটেছে এক চিকিৎসক দম্পতির ভাগ্যে। হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের চরম অবহেলা, কটূক্তি, লাঞ্ছনা এমনকি যথাযথ চিকিৎসার অভাবে চোখের সামনেই সদ্যপ্রসূত সন্তানের মৃত্যু দেখতে হয় তাদের।

ভুক্তভোগী চিকিৎসক দম্পতি হলেন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের কনসালটেন্ট মুহাম্মদ সাঈদ আল মাহফুজ এবং তার স্ত্রী ডা. খাদিজা মৌসুমি। ঘটনার উপযুক্ত বিচার এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন তারা। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১০ ফেব্রুয়ারি তীব্র প্রসববেদনা উঠলে স্ত্রীকে নিয়ে লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন ডাক্তার মাহফুজ। রাত সোয়া ৩টায় তারা মগবাজারের বেসরকারি আদ-দ্বীন হাসপাতালে এসে পৌঁছান। ইমার্জেন্সিতে আসার পর কর্তব্যরত ডাক্তার-নার্সরা ‘কোনো অসুবিধা নেই’ বলে প্রথমেই সান্ত¡নার বাণী শোনান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের আসল স্বরূপ বেরিয়ে আসে। গুরুতর প্রসূতি রোগীকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে না নিয়ে তারা সময়ক্ষেপণসহ উলটো হয়রানির নানা পথ বেছে নেন।

একপর্যায়ে ডাক্তার মাহফুজ নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে বলেন, প্রসূতি নিজেও একজন চিকিৎসক। গর্ভজাত সন্তানের নড়াচড়া কম হচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে সিজারিয়ান অপারেশন শুরু না করলে পরিস্থিতি জটিল হবে। কিন্তু হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে কর্তব্যরত ডাক্তার-নার্সরা অহেতুক কালক্ষেপণ করেন। বরং উলটো তারা বলতে থাকেন ‘রোগী ভালো আছে’ অসুবিধা নেই বলে মাকে ভেতরে-বাইরে হাঁটানো হয়। চিকিৎসক দম্পতি বারবার নিজেদের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে দ্রুত অপারেশন শুরুর অনুরোধ করেন। এক পর্যায়ে হাসপাতাল থেকে ৪ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহের ফরমায়েশ দেয়া হয়, যা ছিল মূলত তাদের চাপে ফেলার অপকৌশল। এভাবে চিকিৎসাহীন অবস্থায় দীর্ঘ সময় কেটে যায়। ভোরের দিকে কয়েকটি টেস্ট করে হাসপাতাল থেকে বলা হয় ‘বাচ্চার হার্ট সাউন্ড কিছুটা কম এবং আরও কিছু সমস্যা আছে।’ এক পর্যায়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাচ্চার কন্ডিশন খারাপ বলে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে ঢোকানো হয়। অপারেশন টেবিলে ডা. রহিমা নামের এক সহকারী অধ্যাপিকা প্রসূতিকে উদ্দেশ করে নোংরা ভাষায় কথাবার্তা বলেন। তার সঙ্গে যোগ দেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সার্জন। তাছাড়া ৪ ব্যাগ রক্তের চাহিদা দেয়া হলেও মাত্র ১ ব্যাগে অপারেশন শেষ হয়ে যায়। অপারেশন থিয়েটারে এমন তিক্ত পরিস্থিতির মধ্যে প্রসূতির মানসিক অবস্থা ছিল ভঙ্গুর।

এদিকে বিলম্বিত অপারেশনের ফলে সদ্য নবজাতকের পরিস্থিতিও জটিল ওয়ে ওঠে। তাকে দ্রুত এনআইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পঞ্চম দিনে নবজাতকের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। ডাক্তার হয়েও নিজের সন্তানের এমন করুণ অবস্থা দেখে ডাক্তার মাহফুজ এবং তার স্ত্রী যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তখন আরেকটি দুঃসংবাদ আসে। ডাক্তার মাহফুজের মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। এক দিকে নবজাতক, অন্য দিকে মা। দুই এলাকার দু’হাসপাতালে ছুটোছুটি শুরু হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! শেষ পর্যন্ত দু’জনের কাউকেই বাঁচানো যায়নি। মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে মা এবং নবজাতক দু’জনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অবশ্য ঘটনার এখানেই শেষ হয়নি। হাসপাতালের সমুদয় বিল পরিশোধের পরও নবজাতকের চিকিৎসা এবং পরীক্ষা সংক্রান্ত রিপোর্ট আটকে রাখা হয়। এমনকি শিশুর ডেথ রিপোর্ট না দিয়ে, ‘নিয়ম নেই’ বলে সাফ জানিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে গত ২৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ডাক্তার মাহফুজ। এতে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে চিকিৎসা অবহেলা সংক্রান্ত ১৬টি বিষয়ের উল্লেখ করেন। এর মধ্যে যথাসময়ে অপারেশন না করা, গভীর রাতে অহেতুক ৪ ব্যাগ রক্তের চাহিদা দিয়ে চাপে রাখার কৌশল, ইচ্ছাকৃত সময়ক্ষেপণ, অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা প্রসূতিকে কটাক্ষ এবং আপত্তিকর কথাবার্তা, অতিরিক্ত ওটি বিল, কেবিন খালি থাকলেও রোগীর অভিভাবককে হাসপাতালের বারান্দায় থাকতে বাধ্য করা এবং চিকিৎসক পরিচয় দেয়ার পরও ‘কত ডাক্তার এলো গেল’ বলে তির্যক মন্তব্য করা প্রভৃতি।

চার পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগের শেষ পৃষ্ঠায় ডাক্তার মাহফুজ লিখেছেন, সবকিছু দেখে মনে হয় এক অরাজক পরিবেশে আমরা চিকিৎসা নিতে গিয়েছি। চিকিৎসক দম্পতি হওয়ায় হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে বিভিন্ন পর্যায়ে এতসব অনিয়ম ধরা পড়ে। এ রকম হয়রানি, অনিয়ম, অপমানজনক আচরণ, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক চাপে একজন সরকারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে হলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কি অবস্থা হয়, তা চিন্তা করলেই গা শিউরে ওঠে। অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. মুহাম্মদ সাঈদ আল-মাহফুজ বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযোগ দেয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ নানাভাবে ম্যানেজ করতে চাইছে। কিন্তু আমরা চাই এর একটা সুষ্ঠু বিচার হোক। আর কিছু না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আদ-দ্বীন হাসপাতালের মহাপরিচালক ডা. প্রফেসর নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে আদ-দ্বীন হাসপাতালের পক্ষ থেকে গভীরভাবে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তবে তার চেয়েও বড় কথা সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারী আমাদের কাছে মৌখিক বা লিখিত কোনো অভিযোগই করেননি। তিনি ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে কথা বলার জন্য বারবার হাসপাতালের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু তিনি আসেন না।