Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

নোয়াখালীর খাদ্য সভ্যতা

॥ ড. মুহম্মদ কবির উল্যা ॥

যেকোনো জনগোষ্ঠীর সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় খাদ্য সভ্যতা। খাদ্য নিয়ে এ দেশে বহু কাব্য কবিতা ও ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। রামায়ণ মহাভারতে খাদ্য বিষয়ে অনেক বর্ণনা আছে। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে বাঙালীর আহার্য ও পানীয় সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। ড. নিহার রঞ্জন রায় তার বাঙ্গালীর ইতিহাস গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। সর্বকালে খাদ্যকে কেন্দ্র করে মানব সভ্যতার আবর্তন-বিবর্তন ঘটে থাকে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি ভেজা, নদীবিধৌত বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলের পলি মাটিতে সহজে ফসল ফলানো যেত, নদী-নালায় খালে-বিলে পাওয়া যেত প্রচুর মাছ, মাঠেঘাটে সবুজ ঘাস গজানোর কারণে গরু-মহিষ-ছাগল পালন ছিল খুবই সহজ ব্যাপার, জীবন ছিল খুবই সহজ ও আরামদায়ক। এসব কারণে উপমহাদেশের নানা স্থান থেকে দলে দলে লোকজন এসে এ অঞ্চলে বসবাস করতে থাকে। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে বিশে^র সবচেয়ে ঘনবসতি। তাই সংক্ষেপে বলা যায় খাদ্যই হলো মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। আরো বলা যায়Ñ এ অঞ্চলের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিসহ সার্বিক উন্নয়ন সবকিছুই খাদ্যকে কেন্দ্র করে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, নোয়াখালীর এ খাদ্য অভ্যাস ও খাদ্য সভ্যতার সাথে ধর্মীয় প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। এ দেশে মুসলমানদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত খাদ্য সভ্যতা ছিল এক আচারের। হিন্দুগণ তাদের ধর্মীয় অনুশাসন মতে নিরামিষ খাবারের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ উপলক্ষে হিন্দুগণকে তাদের ধর্ম মতে খাবার খেতে হতো। বিশেষ করে হিন্দু বিধবাদের ক্ষেত্রে খাবারের সীমাবদ্ধতা ছিল অত্যন্ত কঠিন। একইভাবে হিন্দু উপসম্প্রদায়ের মাঝেও খাবার নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের পার্থক্য। মুসলমানদের আগমনের পর খাদ্য সভ্যতায় আসে এক বিরাট পরিবর্তন। হিন্দু-মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে খাদ্য নিয়ে দেখা দেয় বিরাট বিরোধ। মুসলমানদের হারাম-হালাল আর হিন্দুদের দেব-দেবীর তত্ত্ব থেকে এ বিরোধের শুরু, যা আজও ভারতবর্ষে বিদ্যমান। এ বিরোধের কারণে সেনবাগ এলাকাতেও মাঝে মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। সম্ভবতঃ পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে বা জাতির মধ্যে খাদ্য নিয়ে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়নি। তবে বর্তমান ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশের জনগণ এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য এবং প্রশ্নাতীতভাবে বলা যায়, খাদ্যকে কেন্দ্র করে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ রাষ্ট্রীয় সভ্যতা, আচার অনুষ্ঠান আবর্তিত হয়। খাবারের রকম, পরিবেশন কায়দা, খাওয়ার ধরন, খাদ্যের গুণাগুণ বিবেচনা করে পরিবার ও সমাজের মধ্যে সভ্যতার স্তর নির্ধারণ করা হয়। অবশ্য খাদ্য সভ্যতা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে পারিবারিক শিক্ষা-দীক্ষা, আয়, রুচিবোধ পেশা ইত্যাদির ওপর। নোয়াখালী জেলায় এসব পরিসীমার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যেমন এক সময় সকাল বেলার প্রথম খাওয়া, শহরের ভাষায় যাকে বলা হয় নাস্তা, তা হতো আগের দিনের বাসি ভাত, গরম কালে পান্তা ভাত, শীতকালে কড়া ভাত, খই, মুড়ি, চিড়া দিয়ে। বিশেষ উপলক্ষে বা কোনো পালা-পার্বণের দিনে পিঠাপুলি নাস্তা হিসেবে খাওয়া হতো। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে অনেক সম্পন্ন পরিবারে বাসিভাত বা পান্তা ভাতের স্থলে বর্তমানে এসেছে চা বিস্কুট, পাউরুটি, পরোটা ইত্যাদি। উল্লেখ্যÑ এ এলাকার খাদ্যাভ্যাস বৃহত্তর বাংলা ভাষাভাষীদের খাদ্যাভ্যাসের একটা অংশ সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ দেশের বিভিন্ন জেলার খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু পার্থক্য। যার বিস্তারিত আলোচনা এক্ষেত্রে সম্ভব নয়। নোয়াখালী এলাকায় সাধারণ তরিতরকারি রান্না, মাছ মাংস রান্না, মিষ্টি বানানো, নাস্তা তৈরি করা, পানীয় তৈরি ও পরিবেশন করার কায়দা নির্ভর করে পারিবারিক সভ্যতার উপর। এ কায়দা এক পরিবার হতে অন্য পরিবারের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তেল মসলার ব্যবহার নির্ভর করে পারিবারিক রুচি ও সামর্থ্যরে ওপর। আবার এ অঞ্চলের খাদ্য সভ্যতা বাংলাদেশের পূর্ব পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের খাদ্য সভ্যতার মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। তবে সংক্ষেপে বলা যায়, খাদ্য সভ্যতার বড় নিয়ামক হলো পেশা। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, ছাত্র, বেকার বিভিন্ন শ্রেণির লোকের জীবন যাত্রার সাথে খাপ খাইয়ে নির্ধারিত হয় খাদ্য অভ্যাস ও খাদ্য সভ্যতা। ঈদ, পূজা, পার্বণ, অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ে, জামাই খাওয়া, বেয়াই খাওয়া, শিশুর নাম রাখা, শিশুর খতনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, চল্লিশা, শ্রাদ্ধসহ বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষে খাদ্য সভ্যতার প্রকাশ ঘটে। মুসলমানগণ এ উপলক্ষে মাংস ও মাছ নির্ভর খাবার বেশি তৈরি করে থাকে। সাথে থাকে পোলাউ, বিরিয়ানি, রোস্ট, কাবাব, কোরমা, কালিয়া, কোপ্তা, জর্দা, দই, মিষ্টি, পায়েস, কোমল পানীয়, পান, মসলা ইত্যাদি। এ ধরনের অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায় সাধারণতঃ মাছ, সবজি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার তৈরি করে থাকে।

এ অঞ্চলের খাদ্য উপাদান হিসেবে মসলার ব্যবহার ও অন্যান্য রুচি বা স্বাদ বর্ধক দ্রব্যের ব্যবহার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বহুলাংশে ভিন্নতর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের তুলনায় নোয়াখালীর জনগণ শুটকি, মরিচ ও মসলা কম ব্যবহার করে। এ দু’অঞ্চলের মধ্যে মাছ তরকারি রান্নার কায়দা কানুনে রয়েছে বিরাট তফাৎ। উল্লেখ্য যে, পিঠাপুলি তৈরির দিক থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চল অনেক অগ্রণী। তবে এ এলাকাতেও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। চিতই পিঠা, খোলা পিঠা, ভাঁপা পিঠা, গোটা পিঠা, পোয়া পিঠা, মালা পোয়া, গুলগুলা, ঝাল নাড়–, মোলা, মোয়া, মিষ্টি নাড়–, সাঁজের পিঠা, পুলি পিঠা, পাটি সাফটা, থালা পিঠা, তালের পিঠা, বরই পিঠা, নারিকেল পুরি, নারিকেলের চিড়াসহ আরো অনেক রকমের পিঠা এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যতার দাবি রাখে। অন্যদিকে চিনি, গুড়, খেজুরের রস, নারিকেল, পাকা শসা, পাকা কুমড়া, তালের শাঁস ইত্যাদি উপাদান ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হয় নানা ধরনের মিষ্টি খাবার। বিশেষ উপলক্ষে শিরনি, পায়েস, সুজি, ক্ষীর ইত্যাদি তৈরি করা হয়। উল্লেখ্য যে, প্রতিবছর রমজানের সময় ইফতার হিসেবে তৈরি করা হয় নানা রকমের মিষ্টি ও তেলে ভাজা খাবার। এ সবের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো বুট ভাজি, ডালের বড়া, বেগুনি, কাবাব, চপ, খেজুর, সরবত ইত্যাদি।

কৃষি নির্ভর সমাজ সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের খাদ্য সভ্যতায় সুস্পষ্ট। মাঠের ফসল কাটা যেদিন শেষ হতো, সেদিন গৃহস্থ আয়োজন করত বিশেষ খাবারের। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘জেরদানি’। এদিন চিতই পিঠা রান্না করা হয় বিশেষ কায়দায়, যা বেশ উপাদেয়। দিনমজুর বা কামলাদের দুপুরে খাবারের পর এ খাবার পরিবেশন করা হতো। আবার খেতে প্রথম ধান বপন উপলক্ষে চাষীদের জন্য বানানো হয় নানা ধরনের সব্জি, ডাল, মাছের তরকারি। উপকূলীয় জেলা হিসেবে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় ব্যাপক নারিকেল, সুপারি উৎপাদন হয়। তাই এ অঞ্চলের খাদ্যভ্যাস কিংবা রন্ধন প্রণালীর সাথে নারিকেলের ব্যবহার অনেকটা সহজাত। এ অঞ্চলের নারিকেলের দুধ দিয়ে ডিম রান্না’র রেসিপি হাল আমলেও বেশ জনপ্রিয় ও উপাদেয়। খাওয়ার পর পান সুপারি খাওয়া এ অঞ্চলের খাদ্য অভ্যাসের একটা বড় দিক। এক সময় হুকা দিয়ে তামাক খাওয়া ছিল ব্যাপক। বর্তমানে হুকার স্থান দখল করছে বিড়ি ও সিগারেট। তবে বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে ধীরে ধীরে বিড়ি-সিগারেটের ব্যবহার কমছে। এমনকি পান-সুপারি খাওয়াও কমে যাচ্ছে। এক সময় চা-পানকে দেখা হতো একটা খারাপ অভ্যাস হিসেবে। কারণ চা এর প্রচলন শুরু হয়েছিল ইংরেজদের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে সব ধ্যান-ধারণা পাল্টে গেছে। চা পান এখন বাঙ্গালী খাদ্য সভ্যতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে এখন চা তৈরির সরঞ্জাম সব সময় তৈরি থাকে। তাছাড়া গ্রামে গঞ্জের কোনায় কোনায়, পাড়ায় পাড়ায় এখন চায়ের দোকান। চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে গ্রামীণ ও সামাজিক আড্ডাখানা। এদিক থেকে বলা যায়, বর্তমান সময়টা খাদ্য সভ্যতার জন্য এক ব্যাপক পরিবর্তনের সময়। দেশ বিদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার কারণে এ জেলার জীবন-যাপন পদ্ধতি তথা খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, বাড়িঘর ইত্যাদিতে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। এ পরিবর্তন এ অঞ্চলের সামগ্রিক সভ্যতাকে প্রভাবান্বিত করছে। এ পরিবর্তন এ সময়ের অমোঘ বিধান।