Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

নোয়াখালীর কৃষিঃ সরকারের সদিচ্ছা ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি

‘চলমান নোয়াখালী’র ১৩ জানুয়ারি সংখ্যায় জেলার কৃষিক্ষেত্রের এক ভয়াবহ দুঃসংবাদের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদক সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য নির্ভরতা থেকে লিখেছেন, জেলায় এবারও ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে শুকনো মৌসুমে কোনো চাষাবাদ হবে না। সেচ সুবিধা না থাকা এবং চরাঞ্চলে লবণাক্ততা এর অন্যতম কারণ। এই বিষয়টি নিয়ে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে অনেক আলোচনা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ, রাজনৈতিক দেনদরবার হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শুকনো মৌসুমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত খাল খনন, রাবার ড্যাম নির্মাণ, ভৌগলিক অবস্থান ভেদে সেচ প্রকল্প গড়ে তোলার দাবিটি বেশ কয়েকজন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের করকমলে নিবেদিত ছিল। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে রাষ্ট্র প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার শস্য উৎপাদনে বঞ্চিত হচ্ছে।
আমরা জানি, প্রতিবছর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নামে কি পরিমাণ খয়রাতি চাউল,গমের হরিলুট হয়। এর সিকি ভাগও যদি স্থানীয় সরকারের ব্যবস্থাপনায় কৃষির জন্য সেচ সুবিধার কাজে ব্যয় করা হতো তা’হলে আমাদের জেলায় এত অনাবাদি জমি থাকত না। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে শুকনো মৌসুমে জমির লবণাক্ততাও কমে যেত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো যেখানে ব্যক্তি লাভের হিস্যা বেশি সেখানেই আমাদের জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন সরকারের সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে বেশি আগ্রহী। পাশের জেলা কুমিল্লার কৃষি ক্ষেত্রের দৃশ্যপট যদি বিবেচনা করি তা’হলে তুলনামূলক ভাবে আমরা পিছিয়ে আছি। অথচ আমাদের চাইতে সে জেলার চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কয়েকশত গুণ কম। সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে সেচের পাশাপাশি ঝলাধারের পানি সংরক্ষণ করেও চাষাবাদ হচ্ছে। নোয়াখালী জেলায় ছোট বড় খালের সংখ্যা বিভিন্ন সূত্র মতে একশত তেইশটি। এর মধ্যে বড়, মাঝারি ও ছোট ছোট সংযোগ খাল রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় প্রতিবছর বাড়ছে পলিমাটির চর। সে চরগুলোকে চাষাবাদের আওতায় আনতে প্রতি বছরই নতুন করে এলাকাভেদে খাল খনন বা পুরাতন খালের সাথে সংযোগ করার আবশ্যকতা বিদ্যমান। পাশাপাশি বড় বড় জলাধার নির্মাণ করা যেতে পারে। তাতে কৃষি, মৎস্য ও পশু সম্পদের অবারিত দ্বার উন্মোচিত হবে। পর্যাপ্ত কর্ম সংস্থানের পাশাপাশি সুযোগ হবে সামগ্রিক কৃষি খাতে। এ লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবনা এখানে উপস্থাপিত হলো। নোয়াখালী সামগ্রিক কৃষির ক্ষেত্রে অভাবিত সম্ভাবনাকে যেভাবে কাজে লাগানো যতে পারে।
১. পলিমাটির প্রলেপে জেগে ওঠা চরের গঠন প্রক্রিয়া থেকে স্থায়ী হওয়া পর্যন্ত নজরদারিতে রাখতে হবে যা যথাযথভাবে ভূমি জরিপ করে স্থানীয় ইউনিয়ন ও উপজেলা প্রশাসনের নিকট দেখভালের দায়িত্ব দিতে হবে, তাতে বে-দখল রোধকরা সম্ভব হবে।
২. ল্যন্ড জোনিং করে পরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকা, ফসলের মাঠ, বেড়ীবাঁধ, বনায়ন, মৎস্য ও পশুপালন এলাকা, গোচারণভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আশ্রায়ণ, অভয়ারণ্য, পর্যটন/বিনোদনকেন্দ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পাঞ্চল, সরকারি/বেসরকারি উদ্যোগে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
৩. যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন যেমন, রেল লাইন সম্প্রসারণ, উপকূল জুড়ে প্রশস্ত চক্রাকার সড়ক পথ নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ, কৃষি নিরাপত্তার জন্য বিমান বন্দর নির্মাণ করা ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত অঞ্চল গড়ে তোলা।
৪. কেবলমাত্র মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক চাষীদের জন্য সহজ শর্তে শস্যঋণ, শস্যবীমা চালুকরা।
৫. সরকারের শস্যক্রয় নীতিতে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কৃষিপণ্য ক্রয় অথবা সংরক্ষণ পর্যায়ে শস্যের বিপরীতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া।
৬. কৃষকদের জন্য এলাকা বিবেচনা করে বাজার সৃষ্টি করা, যাতে ভোক্তা ও বড় ক্রেতাদের কাছে উৎপাদক সরাসরি পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পায়।
৭. সেচ সুবিধার জন্য অভ্যন্তরীণ খাল খনন ও বড় বড় পুকুর খনন করে রক্ষণা বেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তাতে পতিত জমি উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং গো-সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, হাঁস-মুরগীর উৎপাদন, বাড়ির আঙ্গিনায় মৌসুমী সবজি বাগান বৃদ্ধি ও ছোট ছোট কৃষিভিত্তিক আয়বর্ধক কর্মসূচি বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং গ্রামীণ নারীদের আয়বর্ধক কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
৮. বড় বড় খালগুলোর বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের আয়ের উৎস নিশ্চিত করা। যেমন খালের পাড়ে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি, সমবায়ের মাধ্যমে মৎস্য চাষ, সবজির বাগান করা, মৌসুমি ফলের বাগান, নার্সারি করা, পিকনিক/বিনোদন স্পটকরা ইত্যাদি।
৯. সকল ধরনের সরকারি বা খাস জলাশয় গুলোকে জন প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত করা। জলাশয়গুলোকে সমবায় অথবা সামাজিকদল গঠন করে অস্থায়ী মালিকানা বা ইজারার ভিওিতে বন্টন করা যেখানে গ্রামীণ কর্মজীবী নারীর অংশীদারিত্ব থাকবে।
১০. গবাদি পশুর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উপযোগী স্থান নির্ধারণের মাধ্যমে গো-চারণ ভূমি, খামার (বাতান) সরকারি/বেসরকারি উদ্যোগে প্রজনন কেন্দ্র (স্থায়ী/অস্থায়ী)ও চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা। গবাদি পশুর প্রজনন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা সংবলিত মোবাইল ভ্যান সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রদান করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে পশু সম্পদকে রক্ষা করার জন্য ক্যাটেল শেল্টার নির্মাণ করা যা, বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী করা যেতে পারে।
১১. এলাকার চাহিদা বিবেচনায় নারীদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা। যেমন বাড়ির আঙ্গিনায় পরিকল্পিত সবজি বাগান ক্ষুদ্র পোল্ট্রি খামার গড়ে তোলা, নার্সারী করার জন্য বিনা সুদে (কেবলমাত্র সার্ভিস চার্জ সংযোজন করা যেতে পারে) ক্ষুদ্র ও স্বল্প মেয়াদি ঋণ নিশ্চিত করা।
১২. উপকূলের নারী ও শিশুদের প্রজনন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গ্রামীণ জনপদে প্রচলিত অবলুপ্তপ্রায় বিনোদনগুলোকে পুনঃউদ্ধার করে তা প্রচলন করা। গ্রাম বাংলার আবহমান কালের কৃষি সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
১৩. পরিবর্তিত জলবায়ু, পরিবেশ বিষয়ে উপকূলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বে^চ্ছায় সেবামূলক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা।
১৪. অতি দরিদ্র মানুষের জন্য ভিজিএফ, ভিজিডি কর্মসূচির মাধ্যমে, জৈবসার উৎপাদন, প্রাকৃতিক বালাই নাশক গাছ ও গুল্মলতা উৎপাদন, অবকাঠামো সংস্কার সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এনে, পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচিতে কর্মসৃজন করা ।
উল্লেখিত উদ্যোগগুলো নিশ্চত করা গেলে নোয়াখালীর ১৫০ বর্গ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলে দেশের বৃহৎ কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। যার ফলে বর্তমানের চাইতে চার গুণ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিভিন্ন প্রকল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এ ছাড়াও সুযোগ তৈরি হবে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা।
বিজন সেন, সংবাদ কর্মী।