date
cover
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
সাক্ষাৎকার

নোবিপ্রবি’র সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. আবুল খায়ের বলেন-
দেশের আধুনিক বিদ্যাপীঠ হবে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

line

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’র সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আবুল খায়ের-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন ল/বা প্রতিনিধি। এই গুণী শিক্ষাবিদের সাথে আমাদের প্রতিবেদকের  আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
ল বাঃ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’র প্রতিষ্ঠাতা ভিসি হিসেবে দায়িত্বভার পালনকালীন আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
ড. আবুল খায়েরঃ নিঃসন্দেহে আমার খুব ভাল  লেগেছিল। আমি নোয়াখালীর সন্তান হিসেবে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’র ভাইস-চ্যান্সেলর নিযুক্ত হওয়ায় এই ভাল লাগার মাত্রাটাও ছিল বেশি।
ল বাঃ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?
ড. আবুল খায়েরঃ এই শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আর সেজন্য আমাদেরকে এই বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণেই আমেরিকা, জাপান এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দৈন্যতার জন্যই আমরা পিছিয়ে পড়েছি। আমাদেরকে বিজ্ঞানের দিকে নজর দিতে হবে এবং বিজ্ঞান আমাদেরকে যে প্রযুক্তি উপহার  দেয় তা কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের দৌড়ে তাল মেলাতে হবে। অন্যথায় আমরা সেকেলে হয়ে অন্ধকারেই পড়ে থাকব।
ল বাঃ  দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার জনদাবির প্রেক্ষিতে আপনার মতামত ব্যক্ত করুন।
ড. আবুল খায়েরঃ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ‘টেক অফ’ করেছে সেখানে তার সহযোগী একটি প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অবশ্যই থাকতে হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ফিডিং বজায় রাখার সাথে সাথে জ্ঞানের সঞ্চালক তথা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যে বিপ্লব সাধিত হয়েছে তার প্রতিফলন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকতে হবে। একটি মেডিক্যাল কলেজ, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রাপথকে সুগম করার জন্য অতীব জরুরি। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানভিত্তিক ও আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা যায় তবেই এখানে পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা উপকৃত হবে, মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। পরবর্তীতে তারাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছড়িয়ে দেবে সমগ্র বাংলাদেশে। অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজসহ বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ১২১২ সালে যে ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পরবর্তীতে তার পাঠদান কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। এখনকার ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে শুধু বিজ্ঞান শিক্ষাদানের জন্য। যুক্তরাজ্যসহ সারা ইউরোপে বিজ্ঞান শিক্ষাক্ষেত্রে একটা বিপ্লব এসেছে। আমাদেরকেও সেদিকে এগুতে হবে।
ল বাঃ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন কালীন আপনি কোন্ কোন্ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন?
ড. আবুল খায়েরঃ দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমেই আমি নজর দিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও কনষ্ট্রাকশনের দিকে।  আমি বিশ্বাস করতাম নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  বিশ্ববিদ্যালয় হবে উচ্চশিক্ষার একটি আধুনিক বিদ্যাপীঠ । যা হবে দেশের প্রথম পরিপূর্ণ আবাসিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। মেধার বিকাশ ও মেধাকে কর্মক্ষম করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমি পাঠ্যক্রমের প্রতি বেশি মনোযোগ দিয়েছিলাম।
ল বাঃ আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা শেষে অধিকাংশ তরুণই বেকার হয়ে পড়ছে। এ বেকারত্ব দূরীকরণে আপনার পরামর্শ কি?
ড. আবুল খায়েরঃ এ কথা সত্য যে, আমাদের দেশের চাহিদা অনুযায়ী জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না বিধায় উচ্চশিক্ষা শেষে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীই বেকার হয়ে পড়ছে, সুতরাং দেশের চাহিদার ভিত্তিতেই ছাত্রÑছাত্রীদের শিক্ষাদান করতে হবে। যেমন প্রতিবছর কোন্ সেক্টরে কত জনশক্তি প্রয়োজন সেই অনুযায়ী ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা এবং আধুনিক শিক্ষায় তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা উচিত। উন্নত বিশ্বে সরকার চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে ২০% থেকে ৩০%। এই অনুপাত আমাদের দেশেও বজায় থাকলে  বেসরকারী উদ্যোগে অবশিষ্ট ৭০% জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। তাছাড়া প্রযুক্তিভিত্তিক বা কারিগরী শিক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষিত করে তুলতে পারলে তারাই শিক্ষাজীবন শেষে নিজেদের কর্মসংস্থান করতে পারবে এবং অন্যদেরও কাজে লাগাতে পারবে।
ল বাঃ আপনি ১৯৬৭ সাল থেকে শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত রয়েছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের কোন স্মৃতির কথা বলবেন কি?
ড. আবুল খায়েরঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা কালীন আমার হাজারো স্মৃতি রয়েছে। আমার কেমিস্ট্রি বিভাগে যে সমস্ত ল্যাব টেকনিশিয়ান ও ল্যাব এটেনডেন্ট আছে তাদের মধ্যে ৬ সপ্তাহের একটি রসায়ন ভিত্তিক কোর্স আমি দিয়েছিলাম। কোর্স শেষে তারা পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষায় যে মেধাক্রম হয়েছে সেই মেধাক্রম অনুসারে পরবর্তীতে বিভাগ তাদের পদোন্নতি দিয়েছে। এটি আমার কাছে একটি স্মরণীয় ঘটনা।
২০০৬ সালের ২২ জুন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হয়। সে দিন মাইজদী শহর থেকে (প্রায় ৯ কিলোমিটার ) সকাল সাড়ে ৭ টায় একাডেমিক ভবনে এসে আমি উপস্থিত হই। আমি দেখেছি ছাত্র ও শিক্ষকগণ সময় মতো এসেছে এবং ক্লাস চলছে। এটি আমার জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা।
ল বাঃ একজন সমাজ সচেতন মানুষ এবং শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-যুবকদের প্রতি আপনার কি পরামর্শ থাকবে?
ড. আবুল খায়েরঃ ছাত্র-যুবকদের আমি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করার পরামর্শ দেব। প্রকৃত বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে তাদের মেধাকে আরও বেশি শাণিত করতে হবে। ড. আবুল খায়ের’র সংক্ষিপ্ত পরিচিতি   ড. আবুল খায়ের ১৯৪৪ সালে নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার ভীমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মৌলভী মোবারক উল্লাহ এবং মাতা মরহুমা আম্বিয়া খাতুন।
প্রফেসর আবুল খায়ের ১৯৫৯ সালে চাটখিল পাঁচগাঁও হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। প্রথমে সিলেট এম সি কলেজে এবং পরে চৌমুহনী কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৬২ সালে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি সম্মান পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৩য় স্থান লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস লাভ করেন।
ড. খায়ের ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৮ সালে এসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৮৭ সালে প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে ডেপুটেশনে ওমানে সুলতান ক্বাবুস ইউনিভার্সিটিতে ৫ বছর অধ্যাপনা করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে ড. আবুল খায়ের’র ৪০টির বেশি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। পিএইচডিতে তাঁর থিসিস ছিল নাইট্রিক অক্সাইড ও কার্বন মনো-অক্সাইড-এর মত বায়ু দুষণকারী গ্যাসকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ। এখনও এ পদ্ধতি চালু রয়েছে। তিনি আর্সেনিকের ওপরও গবেষণা করছেন। অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’র ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ড. আবুল খায়ের ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক থাকাকালীন চাটখিলে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। তাঁর আপন ছোট ভাই মোশাররফ হোসেন বীর প্রতীক মুক্তিযুদ্ধে বিরাট অবদান রাখেন। ব্যক্তিগত জীবনে ড. আবুল খায়ের বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী মিসেস মমতাজ খানম স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি একজন সুগৃহিণী। তাঁদের ১ ছেলে, ২ মেয়ে। তাঁরা সবাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।

     
lbheading