date
cover
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
প্রবাসী সংবাদ

পরলোকে সমাজসেবী, শিক্ষাদ্যোক্তা, দানশীল ব্যক্তিত্ব হাজী আবদুল হক মিয়া
লক্ষ্মীপুর জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক, এডভোকেট সফিক মাহমুদ পিন্টুর পিতা প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হাজী মোঃ আবদুল হক মিয়া,  ১৩ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকাস্থ ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে...............রাজেউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি ২ কন্যা, কন্যার জামাতা, ৩ পুত্র এবং ৩ পুত্রবধূ, নাতী-নাতনীসহ অনেক গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
গত ১৪ ডিসেম্বর বাদ জোহর ঢাকার কাঁঠালবাগান বাজার জামে মসজিদে মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জানাজায় স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, লক্ষ্মীপুর-১ এর এমপি নাজিম উদ্দিন আহমেদ, লক্ষ্মীপুর-৩ এর এমপি শহীদ উদ্দীন চৌধুরী (এ্যানি) সহ ঢাকাস্থ লক্ষ্মীপুর জেলা সমিতির বেশ কয়েকজন প্রাক্তন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান নির্বাহী কমিটির কর্মকর্তা, উপদেষ্টা, পৃষ্ঠপোষক, আজীবন সদস্য, সাধারণ সদস্যসহ মরহুমের পাড়া-প্রতিবেশী, গুণগ্রাহীগণ শরীক হন। অতঃপর তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ী রামগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপজেলা চেয়ারম্যান মুনির হোসেন চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আ ক ম রুহুল আমিন, রামগঞ্জের পৌর চেয়ারম্যান মোঃ হানিফ পাটোয়ারী, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানবৃন্দ এবং এলাকার অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মরহুমকে দাফন করা হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর, রোজ শুক্রবার কাঁঠালবাগান বাজার জামে মসজিদে বাদ জুম্মা মরহুমের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়ায় লক্ষ্মীপুর জেলা সমিতির সর্বস্তরের কর্মকর্তা, মরহুমের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, শুভাকাঙ্খিসহ অসংখ্য মুসল্লি শামিল হন।
মরহুম হাজী মোঃ আবদুল হক মিয়া ১৯১৯ সালে রামগঞ্জ জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৭ সালে চিতোশী হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। পরে ১৯৪৯ সালে চৌমুহনী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৫২ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। অতঃপর তিনি দশরিয়া, ডলটা, ভাদুর, ভাটারা’র বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে ঊধংঃ চধশরংঃধহ ঔঁহরড়ৎ ঈরারষ ঝবৎারপব অফসরহরংঃৎধঃরড়হ (ঊচঔঈঝ) উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তিনি আইয়ুব খানের শাসনকালীন সার্কেল থানা উন্নয়ন কর্মকান্ডের ওপর পাকিস্তান ও ভারত থেকে প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি রায়পুর-ফরিদগঞ্জ-লক্ষ্মীপুর -এর সার্কেল অফিসার, ধামরাই থানার ইউ.এন.ও, মহুকুমা ম্যানেজার, আরডিসি; জেলা সীমানা নির্ধারণ কর্মকর্তা, জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর এবং বাংলাদেশ-ভারত, বাংলাদেশ-বার্মার আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি জীবনে তিনি পাকিস্তান, বার্মা ও ভারত সফর করেন। মরহুম হাজী মোঃ আবদুল হক মিয়া অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা এবং সুনামের সাথে কর্মজীবন শেষ করে ১৯৮৬ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। চাকরি জীবনে তিনি দেশ ও জাতির জন্য যথেষ্ট অবদান রেখে গেছেন। দেশ ও জাতি তাঁর এ অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
হাজী আবদুল হক মিয়া ছিলেন একজন নিরহঙ্কার, সদালাপী, অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। তিনি পরপর দু’বার হজ্জ্ব করেন। তিনি সমাজসেবাসহ অনেক কল্যাণকর কাজে জড়িত ছিলেন। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তিনি রামগঞ্জের নিজ এলাকায় একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা, একটি প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা, একটি ঈদগাহ মাঠ এবং একটি রাস্তা নির্মাণ করেন।
হাজী আবদুল হক মিয়া ১৯৫৫ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রী রামগঞ্জের উদয়পুর ভূঁইয়া বাড়ির মেয়ে মরহুমা হাজী হোসনে আরা বেগম। তাঁদের ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে। বড় মেয়ে রওশন আরা খানম-স্বামী সৈয়দুল হক ১৯৭০ সালের পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা, ছোট মেয়ে শাহন আক্তার খানম-স্বামী ড. শহীদুল ইসলাম, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ)    -এর বাংলাদেশস্থ ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট। মেঝো ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হাসান মাহমুদ বাবু ব্যবসায়ী এবং ছোট ছেলে ইকবাল মাহমুদ ব্যবসা করেন। তাঁর প্রথম দু’সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় নিজ জেলায়। অন্য জেলায় কর্মস্থলে সন্তানের ভূমিষ্ঠ হতে কোন অসুবিধা না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মাটির টানেই জন্মের আগে তাদের মাকে নোয়াখালীতে নিয়ে আসেন।
শোক প্রকাশ
হাজী আবদুল হক মিয়ার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। অন্যান্যের মধ্যে লক্ষ্মীপুর জেলা সমিতির সভাপতি এবং ঢাকা কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজী নুরুল ইসলাম ফারুকী- সফিক মাহমুদ পিন্টুর কাছে প্রেরিত শোকবাণীতে বলেন, যে কোন মৃত্যুই সর্বদা বেদনাদায়ক। আপনার আব্বাজানের মৃত্যুর ফলে আপনার পরিবার এবং সমাজ একজন প্রজ্ঞাবান মুরুব্বি হারিয়েছে। এ অপূরণীয় ক্ষতিপূরণের কারো সাধ্য নেই। তথাপি সৃষ্টিকর্তার শাশ্বত নিয়মে আমাদের সকলকেই তা মেনে নিতে হবে। এখন সকলের কেবলমাত্র দোয়া করতে হবে তিনি যেন জান্নাতবাসী হোন এবং মহান প্রতিপালক এবং সর্বকল্যাণের আধার আল্লাহপাকের অনন্ত মহিমা ও করুণাধারা লাভ করেন।
হাজী আবদুল হক সম্পর্কে পুত্র এডভোকেট সফিক মাহমুদ পিন্টু বলেনÑ
আমার আব্বা মরহুম হাজী আবদুল হক মিয়া একজন সমাজসেবী ওশিক্ষাদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান ছিলেন, অনেক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বিদ্যার্জন করেন। মাদ্রাসা পড়া শেষ করে সাধারণ শিক্ষাগ্রহণ করেন। বিএ পাস করে শিক্ষকতা পেশায় কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ছোটবেলায় আমাদের ভাই-বোনদের নামাজ পড়া, কোরান তেলওয়াত ইত্যাদি ব্যাপারে কড়াকড়ি করতেন। নিজেও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। আব্বা ছিলেন আমাদের বাড়ির প্রথম গ্রাজুয়েট।
এডভোকেট সফিক মাহমুদ পিন্টু বলেন, আব্বা আমাদের ভাইদের সাথে ইংরেজীতে কথা বলতেন, প্রশ্নের জবাবও দিতেন ইংরেজিতে। তিনি আমাদেরকে ইংরেজী শিখিয়ে, ইংরেজিতে কথাবার্তা বলায় অভ্যস্ত করে স্মার্ট করে গড়ে তোলাই উদ্দেশ্য ছিল না, আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজী শিখিয়ে আমাদেরকে যুগের হাল ধরার উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন। এটি তাঁর দূরদর্শিতার পরিচায়ক। জনাব পিন্টু বলেন, আম্মাকে বলতে শুনেছি- আব্বার কোনদিন তাহাজ্জুত নামাজ বাদ যেত না। চাকরি জীবনে তিনি যখন যেখানে ছিলেন সেখানে মসজিদ অথবা নামাজঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। জনাব পিন্টু তাঁর পিতা সম্পর্কে আরও বলেন, আব্বা সেটেলমেন্ট ডিপার্টমেন্টে সিনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন। একটানা ১১ বছর সেটেলমেন্ট কোর্টের বিচারক ছিলেন। এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজ নামে বা নিজ পরিবারের কোন সদস্যের নামে প্লট রাখেননি।
সফিক মাহমুদ পিন্টু আরও বলেন, আমার আব্বা কর্মজীবনে অনেক কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়কারী অফিসারের গৌরব অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ-বার্মা এবং বাংলাদেশ-ভারত সীমানা নির্ধারণ কমিটির কর্মকর্তা ছিলেন। এডভোকেট সফিক মাহমুদ পিন্টু বলেন, আব্বা সমাজসেবার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ঢাকার কাঁঠাল বাগানে একটি মসজিদের পরিচালনা কমিটির তিনি ১৮ বছর সভাপতি ছিলেন। তিনি তাবলীগ জামায়াতে সক্রিয় ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি দেশে ইসলাম প্রচারে শ্রম ও সময় ব্যয় করেন। তিনি দানশীল ব্যাক্তি ছিলেন। গ্রামে মাঠে যত সম্পত্তি ছিল তিনি তা বিক্রি করে দিয়ে মসজিদে সে টাকা দান করেন। নিজের নামে কোন সম্পত্তি রেখে যাননি। জনাব পিন্টু আরও বলেন, মৃত্যুর পূর্বে আব্বার অসিয়ত ছিল- তাঁকে যেন বাড়ীর পাশের মসজিদের মিম্বরের সামনে সমাহিত করা হয়। তাঁর সে অন্তিম ইচ্ছা আল্লাহ পূরণ করেছেন।
এডভোকেট সফিক মাহমুদ পিন্টু বলেন, তাঁর দাদা-দাদী বেঁচে থাকতে ঈদের ছুটিতে সবাই গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যেতেন, কেউ বাদ পড়তো না। নিজ জন্মস্থানের প্রতি তাঁর ছিল আন্তরিক টান। তিনি সন্তানদের মধ্যে জন্মস্থানের প্রতি আকর্ষণ এবং এলাকার মানুষের প্রতি ভালোবাসার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। আমরা পিতার আদর্শে মাটি ও মানুষের প্রতি সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির সেতুবন্ধন গড়ে তোলার আশা রাখি। আপনারা সবাই আমার মরহুম আব্বার মাগফেরাত এবং তাঁর বেদেহী আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করবেন।

 

 
 
 
 
lbheading