date
cover
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
প্রবন্ধ

গভীর ষড়যন্ত্রে হারিয়ে যাওয়া ৪ বীর উত্তমের অন্যতম জেনারেল মঞ্জুর
॥ মাসুদুল হক চৌধুরী বাহার ॥
১৯৭১ সাল। বাঙালী জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বছর। ১৭৫৭ সালের পলাশীর মর্মান্তিক পরিণতিতে বাঙ্গালী তার স্বাধীনতার সূর্যকে হারিয়েছে। ১৯৭১-এ শৌর্যবীর্যে আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে মীর জাফরদের শত ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে পাকিস্তানী হায়েনার হাত থেকে তার স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনে। বাঙালীর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ   সন্তান বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয় জাতি। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ -এর রেশ ধরে শুরু হয় ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ার প্রস্তুতি। ভয়াবহ রক্তাক্ত যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশের সূর্য সন্তানেরা। বীরশ্রেষ্ঠরা রক্ত দিয়ে গড়ে যায় স্বাধীনতার পথ। যারা পরবর্তীতে বীর উত্তম হন তারা,  সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা আর জনতার সাথে একাকার হয়ে ছিনিয়ে আনে বিজয় আর প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। কৃতজ্ঞ জাতি বুকে তুলে নেয় তার প্রিয় সূর্য সন্তানদের। অথচ কি এক গভীর ষড়যন্ত্রে আমরা একে একে হারিয়ে ফেল্লাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়কদের। কেউ খেয়াল করলাম না, কিভাবে হলো, কোথায় গেলাম আমরা আর কি হারালাম-
লেঃ জেঃ জিয়াউর রহমান, মেজর জেঃ খালেদ মোশাররফ, মেজর জেঃ এম এ মঞ্জুর এবং কর্নেল এম তাহের আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর সিপাহ সালার, মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান, বীরত্ব ও দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত, তাঁদের অসম সাহসিকতা, রণকৌশল, সঙ্কটকালে দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও সঠিক পদক্ষেপ একটি দুর্ধর্ষ বাহিনীকে স্বল্পতম সময়ে পরাজিত হতে বাধ্য করেছে। জাতি  তাঁদের সেই সাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ জীবিত সামরিক খেতাব বীর উত্তম-এ ভূষিত করেছে। ব্যক্তিগতভাবে এ চারজন সমর নায়ক ছিলেন খুব ঘনিষ্ঠ এবং একে অপরের বন্ধু। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে, সেই ভিলেজ পলিটিক্স ‘ট্রিক্স’ এর শিকারে রাজনৈতিক উচ্চাশা, ক্ষমতার লোভ এবং মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রের কারণে চারজনই হলেন নির্মম হত্যার শিকার,  ইতিহাসে হলেন বিতর্কিত। তাঁদের বীরত্ব গাঁথা হলো মেঘাচ্ছন্ন। এ চারজন বীর উত্তমের প্রথম হত্যার শিকার হলেন, জেঃ খালেদ মোশাররফ। জেঃ জিয়ার ক্ষমতায় উত্তরণের পূর্বে স্বাধীনতা বিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রের দোসরদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ১৯৭৫এর ৭ নভেম্বর নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয় এই বীর সিপাহ সালারকে। হত্যাকারীরা তাঁর দেশপ্রেমকে কলুষিত করার জন্যে ভারতীয় দালালসহ নানা অপবাদ দিয়ে নিজেদের হত্যা এবং ষড়যন্ত্রকে জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য করার ভ্রান্ত ও ব্যর্থ প্রয়াস পায়।
বস্তুতঃ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাকের শাসন আমলে জেঃ জিয়াকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু এ সময় সেনাবাহিনীর কিছু বহিষ্কৃত জুনিয়র সদস্যের উচ্ছৃঙ্খলতা দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃংঙ্খলাকে দারুণভাবে পর্যুদস্ত করে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি চার জাতীয় নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক-এর পদত্যাগ এবং খুনীচক্রের পলায়নের পর ক্ষমতা অর্পিত হয় বিচারপতি সায়েম সাহেবের ওপর। সেনাবাহিনীর একটি অংশ যখন জেঃ জিয়াকে বন্দি করে তখন জেঃ খালেদ মোশাররফ সেনা প্রধান-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রক্তপাত এড়িয়ে সেনা বাহিনীতে শৃংঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা না করে তাঁদের নিরাপত্তা বিধান করেন। যখন একদল সিনিয়র অফিসার খন্দকার মোশতাক এবং জেঃ জিয়াকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলেন তখন জেঃ ওসমানী’র সহযোগিতায় সব কিছু শান্ত করার নিমিত্তে তাদের নিবৃত্ত করেন। যদি তখন একটি বা দু’টি হত্যাকান্ড ঘটতে দিতেন তবে বাংলাদেশের ইতিহাসের গতি প্রবাহিত হত ভিন্ন ধারায়।
রাজনীতির মার-প্যাঁচ জানতেন না বিধায় এই দেশপ্রেমিক সৈনিক সেদিন চক্রান্তকারীদের হাতে প্রাণ হারালেন। আর তখনই বিপ্লবের নামে বাংলাদেশের জনগণের ওপর চেপে বসলো সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর।
বীর উত্তম নিধন ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় শিকার হলেন কর্ণেল (অবঃ) এম এ তাহের। স্বাধীনতার পর এই যুদ্ধাহত বীর প্রখ্যাত ছাত্র নেতা আ স ম আবদুর রব এবং আরেক যোদ্ধা মেজর (অবঃ) এম এ জলিলের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভ্রান্ত বুুলিতে আকৃষ্ট হন। বিচারপতি সায়েম -এর নেতৃত্বাধীনে সরকার পরিচালনা এবং স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে জেনারেল জিয়া সুকৌশলে খন্দকার মোশতাককে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করেন। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের কর্ণধার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর মোশতাক তখন ভাবতে পারেনি জেঃ জিয়া এভাবে তাকে প্রতারণা করবেন। এর মধ্যে জাসদ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অভ্যুত্থানে তাদের কৃতিত্ব এবং ক্ষমতায় তাদের অংশীদারিত্ব দাবি করতে থাকে। প্রশাসন জাসদ এর এ সমস্ত প্রচারণাকে সামরিক আইনের বদৌলতে স্তব্দ করার পর জেঃ জিয়া উপলদ্ধি করলেন যে, সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের এর প্রভাব বেশি এবং তারা তার ওপর আস্থাশীল। সুতরাং কর্নেল তাহের হয়ে উঠতে পারেন তার সম্ভাব্য প্রতদ্বন্দ্বী। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে জেঃ জিয়ার বিরুদ্ধে সংঘটিত হয় কয়েকটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান। দূরদর্শী জেঃ জিয়া এ সমস্ত ক্যু-এর সাথে কর্ণেল তাহেরকে জড়িত করেন। বিশেষ সামরিক আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গোপনে বিচার হয় কর্ণেল তাহেরের। বিচারে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়। উচ্চতর আদালতে আপিলের সুযোগ না দিয়ে, কোন প্রকার অনুকম্পা না দেখিয়ে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয় ১৯৭৬ সালের ২০ জুন। জেঃ জিয়া কোন প্রকার সহানুভূতি দেখালেন না তার যুদ্ধের সাথী আর এক সময়কার জীবনরক্ষার সহযোগীকে। আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেলেন আরেকজন বীর উত্তম।
আলোচনার তৃতীয় বীর উত্তম প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জেঃ জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতা যুদ্ধের এক ক্রান্তিলগ্নে তার সাথে জাতির পরিচয়, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র (কালুরঘাট) থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার সমর্থন ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

১৯৭৫ এর পট পরিবর্তন এবং ৭ নভেম্বর-এর অভ্যূত্থানের পর অত্যন্ত ধীরস্থির জেঃ জিয়া সুকৌশলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে কয়েক বছর সামরিক  শাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেন এবং পরবর্তীতে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাঁর আমলে সেনাবাহিনীতে অসংখ্য ব্যর্থ ক্যু এবং হত্যা সংঘটিত হলেও তিনি এক অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। রাজনৈতিক উদারতায় স্বাধীনতা বিরোধী চক্র মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এবং আস্তে আস্তে পুনর্বাসিত হয়। জেঃ জিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করার নিমিত্তে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন এবং তার নিজের রাজনৈতিক দল বিএনপিতে রাজাকার আলবদরসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন করেন। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দলসমূহ তার সমালোচনায় মুখর হয়। এক সময় জেঃ জিয়া তার ভুল উপলদ্ধি করতে পারেন বলে মনে হয়, কিন্তু এরমধ্যে সেনাবাহিনীতে বিদ্যমান অসন্তোষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ডিঙ্গিয়ে পাকিস্তান প্রত্যাগত জেঃ এরশাদকে সেনাবাহিনী প্রধান করায় এ অসন্তোষ আরো বেশি দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৮১ সালের মে মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম সফরে গেলে জেঃ জিয়া ৩০ মে প্রত্যুষে সেখানে সেনাবাহিনীর একটি বিদ্রোহী গ্রুপের হাতে নিহত হন। সেদিন সকালে যারা প্রাত ভ্রমণে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে ঘুরছিলেন তারাও টের পেলেন না মাস্টার দা সূর্য সেনের স্মৃতি বিজড়িত সার্কিট হাউজের ভেতর মৃত্যুর হিমশীতল কোলে পড়ে আছেন  এদেশের একজন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন বীর উত্তম। দুই দিন চট্টগ্রামের জনজীবনে তেমন কোন পরিবর্তন হলো না। কোথাও কোন প্রতিবাদ নেই, সর্বত্র বিরাজ করছিলো এক স্থবিরতা। বিএনপি নেতারা যেন পালিয়ে গেলেন, বিদ্রোহীরা নিয়ন্ত্রণ করছিল চট্টগ্রাম বেতার। ঘোষণা দিচ্ছিল বাংলাদেশীদের জন্যে মদ্য পান নিষিদ্ধ করা হলো, এরশাদকে বহিষ্কারের কথা, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কথা, অন্যান্য সেনানিবাসে বিদ্রোহের কথা। চট্টগ্রাম   সেনানিবাসে কি হচ্ছিল তা জানবার উপায় ছিল না, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কোন পরিবর্তন হলো না, অথচ হত্যা করা হলো রাষ্ট্রপতিকে। ঢাকা থেকে হত্যার জন্য দায়ী করা হলো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অধিনায়ক মুক্তিযোদ্ধা জেঃ এম এ মঞ্জুরকে। মেঃ জেঃ মঞ্জুর চট্টগ্রাম বেতার থেকে ৩১ মে রাত ৯টায় এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে আবেদন জানালেন জনসাধারণকে শান্ত থাকতে এবং বললেন অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। পরদিন ১ জুন ১৯৮১ চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ সরকার অনুগত সেনাবাহিনী গ্রহণ করলো গ্রেপ্তার হলেন মেঃ জেঃ মঞ্জুর। কোন প্রকার জবানবন্দি নেয়া হলো না, পুলিশের হাত থেকে দায়িত্ব নিলেন সেনাবাহিনী, নেয়া হলো চট্টগ্রাম সেনানিবাসে। তারপর একদল উচ্ছৃংখল  সৈনিক ১ জুন রাত ১০টায় হত্যা করলো জেঃ মঞ্জুরকে। আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেলেন একজন বীর উত্তম। মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক। অতঃপর অমুক্তিযোদ্ধা সেনাপতি জেঃ এরশাদ সাংবিধানিক রাষ্ট্র্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন এবং প্রায় একদশক নানা কৌশলে চালালেন স্বৈরশাসন। দেশবাসী আজো রয়ে গেল সেই অন্ধকারে, জানলো না জেঃ মঞ্জুর-জিয়া হত্যার জন্যে কতটুকু দায়ী, কার ইঙ্গিতে এবং কেনই বা গ্রেপ্তারের পর তাকে হত্যা করা হলো? কেনই বা রাষ্ট্রপতি হত্যার মামলা সাধারণ আদালতে না করে তৎকালীন সেনা প্রধান জেঃ এরশাদ তড়িঘড়ি করে কোর্ট মার্শাল গঠন করে বিচার করলেন এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বৃদ্ধ বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে দিয়ে কিছু তরুণ অফিসারের ফাঁসির আদেশ করলেন, আর তার পরপরই বিএনপির অন্তর্কলহ এবং সরকারের অযোগ্যতা ও দুর্নীতির কারণ দেখিয়ে কেনই বা ক্ষমতা দখল করলেন জেঃ এরশাদ দেশবাসীর কাছে এসব শুধু প্রশ্নই রয়ে গেলো? বস্তুত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই পরাজিত শত্রুরা মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত মূল্যবোধ ও সাফল্যকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের অদূরদর্শিতা ও অসাবধানতায় এসব ষড়যন্ত্রকারী সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত শিকড় বিস্তার করে এবং আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদীচক্রের সহযোগিতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করে। আর এরপর এরা নানাভাবে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বিসর্জন আর নানা কৌশলে  অন্তর্কলহ সৃষ্টির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের নিধন করে। অন্যদিকে একই কৌশলে শুরু হয় স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন। জেঃ জিয়ার সরকারের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজ, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস তাদের সাফল্যের নিদর্শন। গোলাম আজম, মাওলানা মতিউর রাহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহীদসহ খুনী আলবদর রাজাকার চক্রের পরবর্তী অবস্থান এবং ভূমিকার মূল্যায়ন করে জাতিকে নিতে হবে সঠিক পদক্ষেপ। সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী এবং গণতান্ত্রিক সরকারকে জেঃ খালেদ মোশাররফ, কর্নেল তাহের, জেঃ জিয়া ও জেঃ মঞ্জুরসহ সকল রাজনৈতিক ও সামরিক হত্যাকান্ডের পুনঃতদন্ত করে খুনীদের চিহ্নিত করতে হবে। জাতির সামনে উদ্ভাসিত করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিধনের উদ্দেশ্য ও এর পেছনের শক্তির উৎস। সাময়িক ক্ষমতার মোহে যদি আমরা সত্য উদঘাটনে সচেষ্ট না হই তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত দিবস প্রাক কথাঃ
Lucky seven (সৌভাগ্যের সাত)। সে সাত তথা ৭ ডিসেম্বর সত্যিই নোয়াখালীবাসীর জন্য সৌভাগ্য বহন করে আনে। কারণ ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী অঞ্চল পাকিস্তানি হানাদার ও আলবদর বাহিনীর কবল হতে মুক্তি লাভ করে। তাই ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত দিবস, গৌরবময় দিবস।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথাঃ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতের হত্যাযজ্ঞের পরদিন  ২৬ মার্চ সকালবেলা মাইজদী শহরের টাউন হলে নোয়াখালীর বুদ্ধিজীবীসহ আরো অনেকে একত্রিত হয়ে এক সভার আয়োজন করে। উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন আবদুল মালেক উকিল, নুরুল হক, শহীদ এস্কেন্দার (কচি ভাই), অধ্যাপক মোঃ হানিফ, আবদুর রব উকিল, রফিক উল্ল্যাহ কমান্ডার, সাখওয়াত উল্ল্যাহ, রফিক উল্ল্যাহ, ফকরুল হাসান, এম এ আজিজ, আবদুর রশিদ প্রমুখ। তবে ২৬ মার্চ হতে মে মাস পর্যন্ত নোয়াখালী অঞ্চল হানাদার মুক্ত ছিল। এপ্রিলের প্রথম হতেই যুদ্ধের লেলিহান শিখা প্রজ্জ্বলিত হতে থাকে। যার ফলে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য মাইজদী পি.টি.আই-তে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সে সময় জেলার অনেক যুবক, আনসারকে অবসরপ্রাপ্ত  সৈনিক এখানে সামরিক ট্রেনিং প্রদান করেন। বিলোনিয়াসহ নোয়াখালীকে ২নং সেক্টরের অধীনে আনা হয় এবং ৫টি জোনে ভাগ করা হয়। জোনগুলোর নামকরণ করা হয়Ñযথাক্রমে এ, বি, সি, ডি, ই এবং হাতিয়াকে আলাদাভাবে রাখা হয়। তাছাড়া ঢাকাÑচট্টগ্রাম ট্র্যাংক রোডের পাশের সীমান্ত এলাকাকে পৃথক করে নোয়াখালীর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। তখন বি এল এফ প্রধান ছিলেন মাহমুদুর রহমান বেলায়েত আর ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন এডভোকেট মোঃ মমিন উল্ল্যাহ। সুবেদার লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনা করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। যার মধ্যে ১৪ এপ্রিল দৌলতগঞ্জের যুদ্ধ, ১৮ এপ্রিল নাথেরপেটুয়ার যুদ্ধ এবং ২২ এপ্রিল বেগমগঞ্জের যুদ্ধ অন্যতম। তবে ২২ এপ্রিল মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে টিকতে না পেরে পিছু হটে। আর এই সুবাদে পাক বাহিনী ২২ এপ্রিল বেগমগঞ্জ টেকনিকেল স্কুলে এবং পরবর্তিতে সেনবাগ ও মাইজদী পি. টি. আই’তে ক্যাম্প স্থাপন করে। চলে নির্যাতন, নিপীড়ন, অগ্নিকান্ড, ধর্ষণ এবং হত্যাযজ্ঞসহ অনেক অপকর্ম।
মুক্তিযুদ্ধের এই নয় মাস পাক  হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। যাদের মধ্যে অহিদুর রহমান অদু, শহীদ উদ্দিন এস্কেন্দার ভুলু, তাজু, সালাউদ্দিন আহম্মেদ, আবদুল হাই, এবাদ উল্ল্যা, ডা. সুলতান আহম্মদ, আনসার আলী, সুজা মিয়া, মেজবাহ উদ্দিন, শাহ্ আলম, মোস্তফা কামাল পাশা, আমান উল্ল্যাহ ফারুক, আবদুর রব, আবুল খায়ের, আবদুল রাজ্জাক, শামসুল হক, হাজী দেলু মিয়া, হুমায়ন কবির, নুরুল ইসলাম, সায়েদুল হক, ইয়াছিন মোহাম্মদ, আবদুল গোফরান, মুকবুল আহম্মদ, হরি ঠাকুর, আজিজ উল্যাহ, সুবেদার গোফরান, গোলাম মর্তুজা প্রমুখ। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল করিম মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করতেন। যার দরুন তাকে পাক বাহিনীর হাতে কয়েকবার  অপমানিত হতে হয়েছে। নোয়াখালীর ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে সি জোনে। সি জোনের রাজাকার বা পাক বাহিনীর ক্যাম্পগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল মাইজদী পি টি আই। তাছাড়া বেগমগঞ্জ টেকনিকেল স্কুল, মাইজদী ভোকেশনাল স্কুল, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল, মাইজদী কোর্ট ষ্টেশন (নাহার বিল্ডিং), রৌশন বাণী টকিজ, দত্তের হাট, সোনাপুর কোল্ড ষ্টোরেজ, খলিফার হাট, ওদার হাট, সেনবাগ, করইতলা (লক্ষ্মীপুর), চন্দ্রগঞ্জেও ক্যাম্প ছিল। নোয়াখালী বি জোন কমান্ডার ছিলেন রুহুল আমীন ভ্ূঁইয়া। জেলা শহরের পশ্চিমে সি জোনের কমান্ডার ছিলেন হাবিলদার সিরাজ উল্যাহ, শাহ্ আলম এবং পরে বকুল দায়িত্ব পালন করেন। সদর পূর্বাঞ্চলের ডি জোনের কমান্ডার ছিলেন রফিক উল্যাহ, লক্ষ্মীপুরের পশ্চিমাংশ  রামগতিকে ই-জোনে বিভক্ত করা হয়। নোয়াখালীর কমান্ডারদের নেতৃত্বে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যে বীরত্বপূর্ণ সাহস ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিল তার ফলস্বরূপ পাক হানাদার বাহিনী এ অঞ্চলে বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। অবশেষে ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বেগমগঞ্জ টেকনিকেল স্কুল এবং ৬ ডিসেম্বর মাইজদী ভোকেশনাল, দত্তের হাট, সোনাপুর কোল্ড ষ্টোরেজ, মাইজদী কোর্ট ষ্টেশান (নাহার বিল্ডিংসহ অন্যান্য ক্যাম্প মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। শুধু বাকি থাকে মাইজদী পি টি আই ক্যাম্প। তাও ৭ ডিসেম্বর মুক্ত হয়। সেই দিন রাজাকার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করার জন্য মাইজদী পি টি আই হতে থেমে থেমে গুলি বর্ষণ করে। তাদের গুলিতে অনেক নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরে যায়। সকাল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ভবনটি ঘিরে রাখে এবং রাজাকার বাহিনীকে বার বার আত্মসমর্পণ করার জন্য বলা হয়। কিন্তু তারা সে দিকে কোন কর্ণপাত করেনি। আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা মর্টার ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যে এক শক্তিশালী আক্রমণ পরিচালনা করে। ফলে কয়েকজন রাজাকার মারা যায় এবং বাকিরা পালিয়ে যাবার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে।         এমনিভাবে মাইজদী শহর তথা নোয়াখালী ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় এবং রাজাকার বাহিনীর শেষ ঘাঁটির পতন ঘটে। তাই বলা চলে, যেখানে উৎপত্তি সেখানে নিষ্পত্তি। এই দিন বিজয়ের আনন্দে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ মাইজদী শহরে আনন্দ মিছিল বের করে।
মুক্ত নোয়াখলীর স্মরণিক স্তম্ভের কথাঃ মাইজদী পি টি আই’র সামনে মুক্ত নোয়াখালীর স্মরণিক স্তম্ভ ২৮ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে নোয়াখালী পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় স্থাপন করা হয়। স্তম্ভটি উদ্বোধন করেন জননেতা আ স ম আবদুর রব। অবশ্য এখানে স্থাপন করার পেছনে রয়েছে ইতিহাস। কারণ যে প্রতিষ্ঠান ছিল প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প সে প্রতিষ্ঠানেই আবার গড়ে ওঠে পাকবাহিনীর ক্যাম্প, হয়ে ওঠে নির্যাতন কেন্দ্র। বহু ঘাত- প্রতিঘাতের পর অবশেষে ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাইজদী পি. টি. আই’র পাক বাহিনীর ক্যাম্পে ৭০/৮০ জন রাজাকার মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। তাই মাইজদী পি টি আই’র সামনে মুক্ত নোয়াখালীর স্মরণিক স্তম্ভটি স্থাপন করা যথার্থ হয়েছে, স্বার্থক হয়েছে।
দুঃখের কথাঃ নতুন প্রজন্মের অনেকেই আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস জানে না। চিনে না মুক্তিযোদ্ধাদের, জানে না তাদের কীর্তি গাঁথা গৌরবের কথা। পরিচয় নেই জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গণ কবর, স্মৃতিস্তম্ভের সাথে।
করণীয় কথাঃ ১. আর কতকাল আমাদের অপেক্ষা করতে হবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন করার ব্যাপারে।
২. মুক্তিযোদ্ধা কিংবা তাদের পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত ভাতা সম্মানজনক হতে হবে।
৩. জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গণ কবরগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।
৪.প্রত্যেক উপজেলায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম খোদিত স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করতে হবে।
৫. প্রতি বছর বিজয় মেলার আয়োজন করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও স্মতিচারণমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে।
৬. প্রতি বছর মুক্তিয্্ুদ্ধ সম্পর্কিত স্মরণিকা প্রকাশ করতে হবে।
শেষ কথাঃ ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত দিবস, চেতনা দিবস। যে দিবস আমাদের আপন-পর, বন্ধু- দুশমন চিনতে শেখায়, একতাবদ্ধ হয়ে শত্রুর  মোকাবেলা করতে অনুপ্রাণিত করে। সুতরাং ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ নোয়াখালীবাসীর জন্য অনাদিকালের ইতিহাসে অক্ষয় ও কীর্তিমান হয়ে থাকবে।
-এ কে এম গিয়াস উদ্দিন মাহ্মুদ

মোহাম্মদ হাশেম ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান
নোয়াখালী খালি নয়, পূর্ণ;  পুণ্যে ও মেধাবী মানুষে

॥ আবু হেনা আবদুল আউয়াল ॥
১৮২১ সালে গঠিত ভুলুয়া জেলা ১৮৬৮ সালে নোয়াখালী নাম ধারণ করে। আবার ১৯৮৪ সালে নোয়াখালী জেলা ভেঙ্গে নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর এ তিনটি ক্ষুদ্রতর জেলার সৃর্ষ্টি হয়।
বর্তমানে এ তিন জেলার মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে রয়েছে মিল ও ঐক্য। সে কারণে নোয়াখালী তিন জেলায় বিভক্ত হলেও নানা দিক থেকে বিশেষত: নোয়াখালী চেতনার অখন্ডতার কারণেই এ তিন জেলার মানুষ ‘নোয়াখাইল্লা’ পরিচয়ে গর্ববোধ করে (অবশ্য অর্ধশিক্ষিত ও মূর্খদের কথা ভিন্ন)। নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানে এ প্রসঙ্গটি এভাবে এসেছেÑ নোয়াখালী গর্ব আঙ্গো নোয়াখালী সুক, নোয়াখাইল্লা কইতে আঙ্গো হুলি উডে বুক।
‘নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান’ বলতে আমরা বুঝব বৃহত্তর নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান বা নোয়াখালী অঞ্চলের গান। কারণ, এ সব গানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নোয়াখালী অঞ্চলের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির কথাই বিধৃত। সে কারণে বৃহত্তর নোয়াখালী তথা নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের মানুষ যেন নিজের ভাষায় নিজের আশা-আকাঙ্খা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা, নিজের জন্মভূমি- জন্মজেলার কথা খুঁজে পায় এ সব গানে এবং  সে সঙ্গে প্রকাশ করে আবেগোষ্ণ একাত্মতা। এ গানগুলো বৃহত্তর নোয়াখালীর পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যে উপস্থাপিত।
নোয়াখালীর সমৃদ্ধ লোকগীতি, ছড়া, ধাঁধা, প্রবাদ তথা লোক-সাহিত্য থাকলেও নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান ছিল না। নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান কেবল প্রথম লিখা শুরু করেন মোহাম্মদ হাশেম ১৯৭৩ -৭৪ সালের দিকে। আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী- রয়াল ডিস্টিক ভাই, ও ‘রিকসা অলা কুচকাই চালা  ইস্টিশন যাইয়াম’-এ দ’ুটো গান দিয়ে তাঁরই শুধু নয়-নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানেরও যাত্রা শুরু। সে থেকে তিনি লিখে যাচ্ছেন অবিরাম। এ পর্যন্ত তিনি শ’পাঁচেক  আঞ্চলিক গান লিখেছেন। এর বাহিরে আছে তাঁর আরো শ’পাঁচেক আধুনিক গান আর পল্লীগীতি। বাংলাদেশে তিনি সেই বিরল প্রতিভার অধিকারী, যার মধ্যে একই সঙ্গে গীতিকার, সুরকার, কন্ঠশিল্পী-এ তিন প্রতিভার সার্থক সম্মিলন ঘটেছে। বাংলাদেশের রেডিও টিভি মঞ্চে রয়েছে তার সমান পদচারণা। তিনি রেডিও টিভির বিশেষ শ্রেণীর শিল্পী।
মোহাম্মদ হাশেম এর জন্ম ‘রয়্যাল ডিষ্ট্রিক্ট’ খ্যাত নোয়াখালীতে ১৯৪৭ সালে। গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকার পুরোনো পল্টন লাইন হাই স্কুল, সরকারী জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তাঁর পরবর্তী শিক্ষা জীবন অতিবাহিত হয়। ছোটকাল থেকেই সংস্কৃতির প্রতি ছিল তার অতি আকর্ষণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তার সঙ্গীত প্রতিভা উন্মেষের পথ খুঁজে পায়; লেখাপড়া শেষে ঢাকা সঙ্গীত কলেজে শিক্ষকতাকালে তাঁর সেই উন্মেষিত সঙ্গীত প্রতিভা খুঁজে পায় বিকাশের পথও। শিল্পী আবদুল আলীম তাঁর সঙ্গীত গুরুদের অন্যতম। তাঁর কাছেই তিনি সঙ্গীতের প্রথম তালিম নেন। এরপর ওস্তাদ বারীণ মজুমদারের কাছ থেকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও ওস্তাদ আবিদ হোসেনের কাছ থেকে তত্ত্বীয় সঙ্গীত ও ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেনের কাছ থেকে তবলার তালিম নেন। আগ্রহ, শিক্ষা ও নিরলস সাধনায় তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম সঙ্গীত-প্রতিভা। তিনি আঞ্চলিক গান, আধুনিক গান ও পল্লীগীতি চর্চা করলেও, আঞ্চলিক গানেই তাঁর প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটেছে।
এখন পর্যন্ত নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান বলতে বোঝায় মোহাম্মদ হাশেমের গান। মোহাম্মদ হাশেম ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান যেন সমার্থক হয়ে গেছে। এর কারণে রণজিৎ দাসসহ দু’একজন নোয়াখালীর আঞ্চলিক  গান চর্চা করলেও সংখ্যায়, বৈচিত্র্যে, রচনায়, গায়কীতে ও একাগ্র সাধনায় কেউই হাশেমের তুল্য নন। এ ক্ষেত্রে হাশেম তুলনাহীন অদ্বিতীয়। তিনি যথার্থ ‘নোয়াখাইল্লা সঙ্গীত সম্রাট’।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রে শেফালী ঘোষ যেমন জীবন্ত কিংবদন্তী; নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রেও তেমনি কিংবদন্তী মোহাম্মদ হাশেম। তবে শেফালী ঘোষ যেখানে শুধু গায়ক, কন্ঠশিল্পী সেখানে মোহাম্মদ হাশেম একই সঙ্গে গীতিকার, সুরকার ও কন্ঠশিল্পী। এ দিক থেকে হাশেম অনন্য। আবার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রে আমরা পাই এক ঝাঁক গীতিকার আসকর আলী, আব্দুল গফুর হালী, মোহাম্মদ শমির, মোহন লাল দাস, এম এন আক্তার, সৈয়দ মহিউদ্দিন, ফণী বড়ুয়া, মলয় ঘোষ দস্তিদার, মুন্সী বজলুর রহমান, লক্ষ্মীপদ আচার্য, কাজল দাস, ইয়াকুব আলী, এবনে গোলাম নবী, বাবুল আচার্য, দীপক আচার্য, নূরুল আলম, স্বপন কুমার দাস, চিরঞ্জীব দাশ শর্মা, অজিত বরণ শর্মা, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, শাহাদাত আলী, এম এ রশীদ, অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী, সেকান্দার পন্ডিত, খায়রুজ্জামান পন্ডিত প্রমুখ। কিন্তু নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রে এরকম দৃষ্ট হয় না। এদিক থেকে হাশেম প্রায় নিঃসঙ্গ। হয়তো হাশেমের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভবিষ্যতে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের চর্চা-সাধনায় এক ঝাঁক গীতিকার বা শিল্পীর  আবির্ভাব ঘটবে। আমরা চাই নতুন প্রজন্মের গীতিকার, শিল্পীরা এগিয়ে আসুক। বাংলাদেশের আর দশটি জেলার মতো নয় নোয়াখালী। ভূ-প্রকৃতি, ভাষা, মানুষের জীবনাকাঙ্খা, জীবনযাত্রা ও জেলার প্রতি প্রেম আকর্ষণ প্রভৃতি দিক থেকে  নোয়াখালীর স্বাতন্ত্র্য সর্বজনস্বীকৃত। এ স্বাতন্ত্র্যেই নোয়াখালী যুগে যুগে হয়েছে কবি-সাহিত্যিকদের লেখার প্রেরণা ও উপজীব্য বিষয়। যেমন ষোড়শ শতকের কবি শেখ সুলায়মান ভুলুয়া (বর্তমানে নোয়াখালী) নিয়ে তার ‘নসিয়তনামা’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন, ভুলুয়া শহর জান অতিদিব্য স্থান। সেই সে শহর হয় অতি ভালো স্থান। সৈয়দ কাজী আছে যথ মুসলমান। নানা জাতি আছে যত-ব্রাহ্মণ সজ্জন।।
এ যুগে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছড়া কেটেছেন-কোন্ শহর? নোয়াখালী খটখটে।
কবি না হয়েও কমরেড মুজফফ্র আহমদ নোয়াখালীকে নিয়ে লিখেছেন আহ্বান শীর্ষক দীর্ঘ এক কবিতা। তার প্রথম স্তবক, নঁমি নোয়াখালী’ নক্ষত্র নির্মল বিমল বঙ্গ গগনে,স্নিগ্ধ কিরণে আশা বরষি’ আজি এ শুভ লগনে।
গীতিকবি আবু আল কাসেম ফেরদাউস লিখেছেন তাঁর গানে, জেলা আমাদের নোয়াখালী ভুলুয়া তার আদি নাম। বেঁচে আছি মোরা প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে অবিরাম। কবি আবু হেনা আবদুল আউয়াল তাঁর ‘নোয়াখালী শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন, প্রাচীন ভুলুয়া ‘রয়েল ডিস্ট্রিক’ এখন ত্রি-খন্ড ‘নোয়াখালী; ফেনী, লক্ষ্মীপুর’ নামে; তবু তারা এখনো বিশ্বাসী নোয়াখালীর চেতনায়; সেই চেতনার নাম ঐক্য ও সংগ্রাম।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লিখেছেন নোয়াখালীকে নিয়ে। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোট গল্প  একরাত্রিতে নোয়াখালীর প্রকৃতি ও মানুষের জীবনাকাঙ্খা রূপায়িত। নবীনচন্দ্র সেন, কাজী  নজরুল ইসলাম, বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, গোপাল হালদার, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখের লেখায় নোয়াখালীর মাটি ও মানুষ হয়েছে গৌরবোজ্জ্বল। নাট্যকার প্রণব ভট্টের ‘গাঁও গেরামের  কেচ্ছা’ শীর্ষক  নাটকটি নোয়াখালীকে নিয়ে সাহিত্যে অভিনব সংযোজন।
মোহাম্মদ হাশেমের আঞ্চলিক গানে প্রধানতঃ নোয়াখালীর মাটি ও মানুষের পরিচয়, নোয়াখালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব, মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র, তাদের আবেগ-অনুভূতি, বিশ্বাস, সংস্কার প্রভৃতি অনুপম শিল্প-সৌকর্যে উদ্ভাসিত। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল ‘আঙ্গো বাড়ী নোয়াখালী’, ‘রিকসা আলা কুচকাই চালা’, ‘আল্লায় দিছে বল্লার বাসা’, ‘আঙ্গো বাড়ী নোয়াখালী তোঙ্গ বাড়ী হেনী’, ‘ডুবাই গেছে আঙ্গো বাড়ীর মোহাম্মদ আলী’, ‘ইদ্দুরিতান মাইজদী শহর’, ‘ইন্নালিল্লা মাইজদীর বাস’, ‘চাকরী করি আদমজী’, ‘আহারে ও কুলসুম, আহারে ও বুলবুল, বিয়া করি তোরে আঁই কিয়া খাওয়ামু, ‘চাচী জেডী খালা কি আর মার মতন নি; বেক যদি ডুবাই যাইবো, নামে ডাকে ভূইয়া বাড়ী, ‘আঙ্গো উত্তর বাড়ীর তারা, ‘আইলের হরদি কোনগাঁর মাইয়া, নোয়াখালীর দক্ষিণ দি উডছে নোয়া চর, কচু হাতার হানিরে ভাই, মাতাত লই উনের ডরে, নোয়াখাইল্লা গুণীজনরা হারাদেশের গুণী, আহারে রোশন আমার, নিশি রাইতে উডি কাঁদ, গা সুন্দর খালাত ভাই, রোশন বাণীতে চিনামা চাই, লেয়া-হড়া করে হোলা’, আইজ মইরলে কাইল দুইদিন অইব, ইক্কিনিতন ভালোবাসার লাই, কার মনে কি আছে জানে মাবুদ আল্লাজান, ‘হাইদলে বৌয়ে ভাত খায় না, রাখে আল্লা মারে কে, আরে ও সেলিনা প্রভৃতি গান।
এসব আঞ্চলিক গানে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার গৌরবোজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। সে বৈশিষ্ট্যের উল্লেখযোগ্য দিক হল, এ ভাষার শব্দ সম্পদ ও গীতি মাধুর্য। এ দু’বৈশিষ্ট্যের কারণেই নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার গান রচনা ও গাওয়া সম্ভব। আবার এ সম্ভবের জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিশীল প্রতিভা, যে প্রতিভা আছে মোহাম্মদ হাশেমের। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা বাংলাদেশের অন্যতম উপভাষা। সে কারণে এবং সে সঙ্গে এ জেলার মানুষ জেলার বাইরে  বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কারণে, এ জেলার ভাষার এক ধরনের সর্বজনীন বোধগম্যতা রয়েছে।
ফলে, নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের রসাস্বাদন বাংলাদেশের অন্য জেলার লোকেরাও করতে  পারেন। এ দিক থেকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক গানের শ্রোতার ক্ষেত্রও বি¯তৃত। মোহাম্মদ হাশেম যেমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি পরিচয় দিয়েছেন অনুপ্রাস উপমা-রূপকাদি প্রয়োগেও, যেমন- উলি কুলি কোদালি আর রেইল গাড়ীতে। চৈদ্দ আনা নোয়াখাইল্লা চামড়ার টেনারীতে। জজ-ব্যারিস্টার, উকিল ডাক্তার কোন্ ডিপার্টে আমরা নাই।
আমরা বালার বালা একছার বালা দুষ্ট লোকের যম।
মোল্লা-মুন্সী আলীম জালিম কোন্টা আঙ্গো কম। বালা-বুরা হগল কামে এক্কেবারে আগে থাই।
সোনা কিয়া রূপা কিয়া সোনার তেনো খাডি।
আল্লায় দিছে বল্লার বাসা নোয়াখাইল্লা মাডি। এই মাডিতে বাঁচি যেন এই মাডিতে চোক খাডি।।
‘নোয়াখালী গর্ব আঙ্গো নোয়াখালী সুক। নোয়াখাইল্লা কইতে আঙ্গো হুলি উডে বুক। ‘দেশে আর বিদেশে আমরা সিনাকান উডাই আাঁডি।’ অথবা আহারে ও বুলবুল, এই জীবনে তোর কারণে ভুল সবই ভুল। মহব্বতের হুরিয়া খাওয়াই বানাইলি আকুল। তুই যে আমার মনের দেবী বাড়ি দেব নগর। যাত্রা করি দেকা দিলি মাইজদী শহর।।
টানা টানা চোক দুনুগা লম্বা মাতার চুল।।
কখনো কখনো অন্ত্যমিলে সামান্য ত্রুটি এবং রসাভাব ঘটলেও সামগ্রিক বিচারে তাঁর আঞ্চলিক গানগুলো শিল্প সুন্দর, উপভোগ্য। পড়ে বা আবৃতি করে নয়, বেতার টিভি মঞ্চে রেকর্ড শুনলে তার মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব উপলব্দি করা যাবে। কারণ গান পড়ার বা আবৃত্তি করার ব্যাপার নয়, তা গাওয়ার বা গীতরূপে শোনার ব্যাপার।
কথায় যেমন, তেমনি সুর সংযোজনায়ও মোহাম্মদ হাশেম অনন্য শিল্পীসত্তার স্বাক্ষর উৎকীর্ণ করেছেন। আর সেই সঙ্গে তাঁর অসাধারণ গায়কী যুক্ত হয়ে তাঁর রচিত ও সুরারোপিত নোয়াখালীর আঞ্চলিক গান বাংলাদেশের সঙ্গীতের অমূল্য ও অপূর্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে। তাই, এগুলোর চর্চা ও লালন করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
-প্রবন্ধকার কবি ও সমালোচক,
সম্পাদক ‘নোফেল’

 

   
     
     
 
 
 
lbheading