নোয়াখালীর ইতিহাসে
শ্রী শ্রী বারাহী দেবীর অবস্থান
॥ এ কে এম গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ ॥
ভূমিকাঃ
ভুলুয়া আধুনিক নোয়াখালী অঞ্চলের আদি নাম। বলা হয় ভুলুয়ার অধিষ্ঠাত্রী পীঠ-দেবী বারাহী। নোয়াখালী তথা ভুলুয়া সৃষ্টির সাথে উক্ত বারাহী দেবীর ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে বিজড়িত। কাজেই বারাহী দেবী নোয়াখালীর ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।১
ঞযব ঃবসঢ়ষব রং ঃযব ড়ষফবংঃ ংঃৎঁপঃঁৎব রহ ঃযব ফরংঃৎরপঃ ধহফ ভববনষব ভৎড়স ধমবং.২
ভুলুয়া শব্দের উৎপত্তি ঃ
বাংলায় সেন বংশের রাজত্বকাল গৌরবের। হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন ছিলেন সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।৩ বিজয়সেন (মৃত্যু ১১৫৯ খৃঃ) সমগ্র বাংলার অধিপতি ছিলেন। বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন মিথিলা রাজ্য জয় করে তার রাজ্য পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করেন। যথা-রাঢ় (পশ্চিমবঙ্গ), বরেন্দ্র (উত্তরবঙ্গ), বাগড়ী(দক্ষিণবঙ্গ), বঙ্গ(পূর্ববঙ্গ) এবং মিথিলা। মিথিলার রাজা ছিলেন বিশ্বম্ভর শূর। তিনি ১২০৩ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহন করেন। তিনি মিথিলাধিপতি আদি শূরের নবম পুরুষ।
খ্রীষ্টিয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে কুতুবউদ্দিনের সেনানী মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী সাহস ও ক্ষিপ্রতার সাথে (১২০৩-১২০৫ খৃঃ) বঙ্গের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হন, সেই সময় গৌড় নদীয়ার রাজাগণ স্ব-স্ব রাজ্য ত্যাগ করে পূর্ব-দক্ষিণ বঙ্গে পলায়ন করেন। কথিত আছে, সেই ঘোর রাষ্ট্র বিপ্লবকালে মিথিলার অধিপতি বিশ্বম্ভর শূর স্বদেশ ত্যাগ পূর্বক রাঢ় ও বঙ্গেঁ আশ্রয় লাভে বঞ্চিত হয়ে তীর্থ দর্শন মানসে চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পর্বতের অভিমুখে যাত্রা করেন। এই অভিযানকালে তার সাথে ১৪৯টি নৌকা, ২০০ জন সৈন্য এবং বহু সংখ্যক পরিজন, পুরোহিত এবং কর্মচারী ছিলেন। তীর্থক্ষেত্র হতে প্রত্যাবর্তন কালে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব কোণে নাবিকগণের দিকভ্রম ঘটে। আট দিন যাবৎ ইতস্ততঃ নৌ-সঞ্চালনের পর পথভ্রান্ত নৌ-বিতান বর্তমান নোয়াখালীর আমিশাপাড়ার পশ্চিমে নাওড়ী গ্রাম হতে আরম্ভ করে বর্তমান সোনাইমুড়ী রেল স্টেশনের পশ্চিমে বগাদিয়া (বকদ্বীপ) ও ভানুইয়া গ্রাম পর্যন্ত বি¯তৃত স্থান জুড়ে নব-সঞ্চিত বালুকাস্তরে আবদ্ধ হয়।৪ স্থান অপরিচিত, নাবিকগণ দিকভ্রান্ত। মাঘের প্রচন্ড শীত ও কুয়াশায় চারদিক ঢাকা, এটি ভীষণ বিপদের সূচনা মনে করে বিশ্বম্ভর শূর ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি বারাহী মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন। এই আসন্ন বিপদকালে তিনি একাগ্র হৃদয়ে ইস্টদেবীর শরণাপন্ন হলেন।
কথিত আছে-দেবীর প্রত্যাদেশ হল-বৎস! আজ তুমি রাজ্যচ্যুত ও শোকাহত। নতুন আশ্রয়ের অন্বেষণে আজ তুমি বিব্রত। তুমি ক্ষুদ্ধ হইও না। পঞ্চ সাগরের মুখে যেখানে তোমার নৌ-বিতান নোঙ্গঁর করে আছে, এই বিশাল জলরাশি অচিরেই অন্তর্ধান করবে। এই নতুন চরভূমিতে তোমার উপাস্য দেবী বারাহীর দর্শন লাভ করবে। আমাকে জলমগ্ন বালুকাস্তর হতে উত্তোলন পূর্বক এখানে প্রতিষ্ঠা করে পূজা কর। এই নব রাজ্যের তুমি হবে রাজা।
রাজা বিশ্বম্ভর অলৌকিক স্বপ্নের কাহিনী সকলকে ডেকে বললেন। সকলেই বিস্মিত ও কৌতুহলী হয়ে তাদের নৌ-বিতান পার্শ্বে জলমগ্ন বালুকাস্তরে উপাস্যদেবী বারাহীর সন্ধান পায়। এই রাতেই বিশ্বম্ভর দেবীমূর্তি ঐ স্থানে প্রতিষ্ঠা করে ছাগ বলি দ্বারা মায়ের অর্চনা করেন। এটি ৬১০ সনের (১২০৩ খৃঃ) ১০ মাঘ তারিখের ঘটনা। ড. ওয়াইজ এই সম্বন্ধে বলেছেন, ঞযব বীধপঃ ফধঃব ড়ভ ঃযরং ভরপঃরড়হ রং মরাবহ ধং ঃযব ১০ ঃয ড়ভ গধময, ৬১০ ইধহমধষর ুবধৎং ড়ৎ অ.উ. ১২০৩, ঃযব ংধসব ুবধৎং রহ যিরপয ঃযব ভরৎংঃ গধযধসধফধহ রহাধংরড়হ ড়ভ ইবহমধষ ঁহফবৎ ইধশযঃরধৎ কযরষলর ঃড়ড়শ ঢ়ষধপব.৫ উক্ত চরভূমির নাম ভানুইয়া। কিন্তু ঐ দিনটি নিবিড় কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় মূর্তিকে সঠিকভাবে স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ দক্ষিণ মুখ করে সংস্থাপনের স্থলে পূর্বমুখ করে সংস্থাপন করা হয়েছিল এবং দেবীর প্রীতার্থে যে ছাগবলি দেওয়া হয় তা পশ্চিমাভিমুখী ছিল। সূর্য উদিত হলে সে ভ্রম সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সকলে সমবেত কন্ঠে বলে ওঠে- ভুল হুয়া, ভুল হুয়া। সম্ভবতঃ এ ‘ভুলহুয়া’ শব্দ হতে রাজ্যের নাম ভুলুয়া হয়েছে।
কোন দেব-দেবী পশ্চিমাভিমুখী উপবিষ্ট হয়ে পূজা-অর্চনা শাস্ত্রসিদ্ধ নয় বলে রাজা বিশ্বম্ভর অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ তিনি মায়ের পদতলে ভূলুন্ঠিত হয়ে পড়েন ও চেতনা হারিয়ে ফেলেন। মায়ের আবার প্রত্যাদেশ হল-বৎস! তুমি বিচলিত হইও না। মানুষ মাত্রই ভুল করে। আমার বিধান মতে তুমি আমাকে অর্চনা করো তা হলেই আমি তুষ্ট হব। পশ্চিমাভিমুখী উপবিষ্ট না হয়ে উত্তরাভিমুখী উপবিষ্ট হয়ে আমার অর্চনা করবে। বিশ্বম্ভর মায়ের আদেশ অনুসারে তাই করলেন এবং এই বিধান মতেই বারাহী দেবীর পূজা-অর্চনা হয়।
সমালোচনা ঃ
ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ ভুলুয়া নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। ভুলুয়া নামের উৎপত্তি ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বড়ই কৌতুহলোদ্দীপক। এ বিষয়ে আবহমানকাল যাবৎ একটি প্রবাদ প্রচলিত হয়ে আসছে। প্রাচীন পুঁথি-পুস্তকের সেই প্রবাদটি দেশী-বিদেশী গ্রন্থাদিতে এত বেশি আলোচিত হয়েছে যে, ওটি একটি সত্য ঘটনা বলে স্বতঃই মনে হয়।৬ ‘ভুল’ বাংলা আর ‘হুয়া’ উর্দু শব্দ। উর্দু-বাংলা শব্দের এভাবে সন্ধি হয়না। কথাটা ভুল। উর্দুতে এটি হত ‘গলতি হুয়ি’ বা ‘গলতি হুগেয়ি’। তাছাড়া উর্দু ভাষার তখন জন্মই হয় নাই। এর উৎপত্তি হয় ৩৫০ বৎসর পর সম্রাট আকবরের আমলে ফারসী ও হিন্দী ভাষার সংমিশ্রণে শিবিরে মুসলমান ও রাজপুতদের কথাবার্তা বলার সুবিধার জন্য।৭ লেখক শেখ এ.টি.এম রুহুল আমিনের মতে-বিশ্বম্ভর শূর রায় অঞ্চলের ভুলুই নামক স্থান থেকে এই অঞ্চলে আগমন করেন বলে এই অঞ্চল ভুলুয়া নামে পরিচিত হয়। খুব সম্ভব তিয়রী, মাগমুদা, রৈগা, পাগাচং প্রভৃতি অর্থহীন গ্রামের ন্যায় ভুলুয়াও একটি মৌলিক শব্দ।৮ ভুলুয়া নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে আরও অনেক তথ্য উপকরণ ও কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। যেমন ‘ভুল্না’ দ্বীপ বা চর হতে ভুলুয়া নামকরণ হয়েছে।৯ ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সরকার বহু বছর আগে বলেছেন, পাঁঠা বলি দানের ‘ভুল হুয়া’ শব্দ হতে ‘ভুলুয়া’ নামের উৎপত্তি একান্ত গাঁজাখুরী গল্প ছাড়া আর কিছু নয়।১০ অনেক ঐতিহাসিকের মতে মেঘনা নদীর তীরবর্তী বঙ্গোপসাগরের মেঘনা উপকূলের একটি প্রাচীন বর্ধিষ্ণু গ্রামের নাম থেকে ভুলুয়া নামের উদ্ভব হয়েছে। জানা যায়, মেঘনার একটি শাখা নদীর নামও ভুলুয়া।১১ প্রচলিত ও লিখিত প্রবাদ বাক্য হতে যে সময় প্রাপ্ত হওয়া গিয়েছে তা সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ কিনা তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে, কিন্তু বখতিয়ার খিলজী কিংবা তার অনুচরগণ দ্বারা তাড়িত হয়ে যে শূর বংশীয় বিশ্বম্ভর ‘ভুলুয়ায়’ উপনীত হয়েছিলেন এরূপ অনুমান অসঙ্গত নয়। প্রবাদ অনুসারে কল্যাণপুর তাদের আদি রাজধানী। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় আমিশাপাড়া গ্রামে রাজা বিশ্বম্ভর প্রথমত: বাসস্থান নির্মাণ করেন, কারণ এই স্থানেই বারাহী দেবীর মন্দির ও প্রস্তরময়ী মূর্তি এখনো দৃষ্ট হয়ে থাকে।১২ পরিশেষে বলা যায়, কিংবদন্তি অবশ্য ইতিহাস নয়। তবে এখনো লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, বারাহী দেবীর একটা প্রাচীন মূর্তি বিগত ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত আমিশাপাড়া গ্রামে যথারীতি পূজিত হয়ে আসছিল। নিকটবর্তী গ্রামটি স্মরণাতীত কাল থেকে বারাহী নগর নামে অভিহিত হয়ে আসছে। এসব দেখে মনে হয়, কিংবদন্তীর সাথে ঐতিহাসিক সত্যের একটা ক্ষীণ সূত্র জড়িত রয়েছে। সর্বাধিক লক্ষ্যযোগ্য বিষয় এই যে, সেই বিস্মৃত অতীতে আমিশাপাড়া গ্রাম পর্যন্ত সমুদ্র বিস্মৃত ছিল।১৩
বারাহী দেবীর সেবাইত
ছিলেন ভুলুয়ার সামন্ত রাজন্যবর্গ ঃ
ভুলুয়ার সামন্ত রাজাগণ বরাবরই বারাহী দেবীর প্রতি যথাযথ সম্মাননা প্রদর্শন করতেন। নিম্নে ভুলুয়ার সামন্তরাজাদের নাম উল্লেখ করা হল ঃ
১. বিশ্বম্ভর শূর-১২০৩ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহন করেন।
২. গণপতি রায়-রাজত্বকাল অজ্ঞাত
৩. সূরানন্দ খাঁ- ” ”
৪. দেবানন্দ খাঁ - ” ”
৫. কবিচন্দ্র খাঁ- ” ”
৬. শ্রীরাম খাঁ - ” ”
৭. রাজ বল্লভ রায় ” ”
৮ - ১৩ নং এ ছয় জনের নাম জানা যায়নি।
১৪. লক্ষণ মানিক্য -তিনি রাজ বল্লভের অধঃস্তন ষষ্ঠপুরুষ।
১৫. বলরাম শূর -লক্ষণ মানিক্যের পুত্র। ১৫৯৭ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহন করেন।
১৬. রাণী শশীমুখী - বলরামের পতœী।
১৭. অনন্ত মানিক্য - (১৬১০)।
১৮-২৪ নং -এ সাত জনের নাম পাওয়া যায়নি।
২৫. ভদ্ররায় - (১৬৬০খৃঃ) সর্বশেষ রাজা।১৪
লক্ষণ মানিক্যের মৃত্যুর পর তৎপুত্র বলরাম শূর মতান্তরে দুর্লভ রায় রাজা হন (১৫৯৭খৃঃ)। একই বৎসর ত্রিপুরার রাজা অমর মানিক্য সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। পূর্বরীতির ব্যতিক্রম করে বলরাম ত্রিপুরা রাজ্যের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন এবং স্বীয় কপালে রাজটীকা ধারণ না করায় বিবাদের সূত্রপাত হয়। সে বৎসরই অমর মানিক্য ভুলুয়া আক্রমণ করে বলরামকে কর প্রদানে বাধ্য করেন। বলরামের পরবর্তী ভুলুয়ার রাজাদের ঘটনা পরিক্রমা সম্বন্ধে ইতিহাস নীবর। তবে এটুকু জানা যায় যে, লক্ষণ মানিক্যের পর বলরামসহ ৮ জন রাজা ভুলুয়ায় রাজত্ব করেন। তাদের মধ্যে রাজা ভদ্র রায়ের নাম জানা যায়। বলরামের মৃত্যুর পর তদীয় পতœী শশীমুখী রাজ পুরোহিত রাধাকান্ত চক্রবর্তীর বাড়িতে বারাহী দেবীর মূর্তি স্থাপন করে কাশিধামে চলে যান।১৫
১৮৭৬ খৃষ্টাব্দে ভুলুয়া, ওমরাবাদ এবং শমসেরাবাদ পরগণার কিছু অংশ হাতিয়া, সন্দ্বীপ ও অন্যান্য দ্বীপ নিয়ে নোয়াখালীকে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তৎপূর্বে উক্ত ভূখন্ড ভূতপূর্ব ত্রিপুরা জেলা, বর্তমান কুমিল্লা জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। শমসেরাবাদ বলতে বর্তমান কুমিল্লা জেলা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের কিয়দংশকে বুঝানো হয়। শমসের গাজী উক্ত ভূভাগ দখল করেছেন বলে জানা গেলেও অদ্যাবধি এর সঠিক কোন ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়নি। সমগ্র ভুলুয়া ও ওমরাবাদ পরগনা নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও পরগনাদ্বয়ের মধ্যে প্রাচীনতম পরগনা ভুলুয়া পরগনা।
ভুলুয়ার শেষ জমিদার ছিলেন অরুণ চন্দ্র সিংহ বাহাদুর। তার জমিদারী হতে সেবাইত সূত্রে বিশাল সম্পত্তি ভোগাধিকার প্রাপ্ত হন বাবু শান্তি লাল চট্টোপাধ্যায়। যার পূর্বপুরুষ ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনা হতে আমিশাপাড়ায় এসেছিলেন।
বারাহী দেবী মূর্তি ঃ
উজ্জ্বল কষ্টি পাথরে নির্মিত, আট হাত তিনমুন্ড ও বরাহবহন বিশিষ্ট, ত্রিভঙ্গীমায় সমাসীনা এই মূর্তির চার হাত ঊর্ধ্বদিকে চার হাত নিম্নদিকে প্রসারিত। মাথায় মুকুট ও অঙ্গ অলঙ্কারে ভূষিত। হাতে নানাবিধ আয়ূধ।১৬ সম্মুখ মুন্ডের চেয়ে ডান ও বাম পার্শ্বের মুন্ড দু’টো কিছুটা ছোট। বামের একটি হাতে গদা, গলায় তুলসি মালা এবং পায়ে নূপুর বিদ্যমান। বারাহী দেবীর উচ্চতা ৩ ফুট। কিন্তু উক্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছরের প্রাচীন মূর্তিটি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা ১৯৪৬ সালে খন্ডিত হলে শান্তিলাল চট্টোপাধ্যায় এবং রামগঞ্জের চন্ডিপুরের ডা: যদু বাবুর আর্থিক সহযোগিতায় প্রথমে নিম কাঠের বারাহী দেবীর মূর্তি সংস্থাপন করা হয়। অত:পর মূর্তিটি নষ্ট হয়ে গেলে পূর্বের মূর্তির অনুকরণে আরেকটি মূর্তি প্রস্তুত তথা প্রতিস্থাপন করা হয়। যা পাথর ও সিমেন্ট দ্বারা নির্মিত। বর্তমান মূর্তিটি প্রস্তুতের ব্যয়ভার বহন করে আমিশাপাড়া সর্বজনীন দেবালয় কমিটি।১৭
বারাহী দেবীর মন্দির ঃ
দেবী বারাহী একান্ন পীঠের একটি পীঠস্থান হয়েও ভারতময় এর বহুল প্রচার হয় নাই। পঞ্জিকায় এই পীঠস্থানের নাম উল্লেখ করে স্থান অজ্ঞাত বলে লিখিত আছে। প্রকৃতপক্ষে স্থান অজ্ঞাত নয়। নোয়াখালী ত্রিপুরা চট্টগ্রাম প্রভৃতি জেলার সমস্ত হিন্দু জনগণের নিকট এই বারাহী পীঠ পবিত্র তীর্থক্ষেত্র ছিল।১৮ কথিত আছে যে, রাজা আদিশূরের পুত্র বিশ্বম্ভর শূর ভুলুয়ায় রাজধানী স্থাপন করে বারাহী দেবীর মন্দির স্থাপন করেছিলেন। তখন এই মন্দির ছিল ভুলুয়া সন্নিহিত কল্যাণপুরে। পরবর্তীকালে রুদ্র মানিক্যের পতœী রাণী স্বর্ণমুখী আমিশাপাড়া গ্রামে মন্দির নির্মাণ করে বারাহী দেবীকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।১৯ বারাহী দেবীর মন্দিরের নির্মাণকাল নির্ণয় প্রতœতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়। কারণ এ মন্দির নিয়ে কেউ তেমন গবেষণা করেনি। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বারাহী দেবীর মন্দিরটি চুন, সুরকি, ইট দ্বারা নির্মিত এবং এর দেয়াল বাটালি গুড়ের রংয়ের অনুরূপ ইট২০ দ্বারা প্রতিস্থাপিত। বারান্দাসহ মন্দিরের দৈর্ঘ্য ৩৬ ফুট এবং প্রস্থও ৩৬ ফুট, উচ্চতা ১১.২৫ ফুট। এর দেয়ালের ঘনত্ব ২.২৫ ফুট। বর্গাকৃতি মন্দিরটির পশ্চিম দিক ব্যতিত অপর তিন দিকের বারান্দায় ১০টি সরম্নপিলার বা স্তম্ভ রয়েছে। মূল মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে দু’টি বড় অষ্টভূজাকৃতি স্তম্ভের ওপরের দেয়ালে পদ্মফুলের কলি সাদৃশ্য নকশা পরিলক্ষিত হয়। মন্দিরের উত্তর ও পূর্বে একটি করে মোট দু’টি দরজা এবং দক্ষিণে একটি এবং পূর্বে দু’টি জানালা বিদ্যমান। মন্দিরের সামনে অর্থাৎ পূর্ব পার্শ্বে টিন শেডের একটি নাট মন্দির সংযুক্ত রয়েছে। এবং মন্দির সংলগ্ন উত্তর পার্শ্বে রয়েছে ষষ্ঠভূজাকৃতি রাধাকৃষ্ণ মন্দির। যা এখনো নির্মাণাধীন। এই মন্দিরের প্রস্তাবকারী ও উদ্বোধক পরম শ্রদ্ধেয় আত্মনন্দ গিরি মহারাজ, অধ্যক্ষ মহাতীর্থ চন্ডীমুড়া, লালমাই, কুমিল্লা।
দেবোত্তর সম্পত্তি ঃ
বারাহী দেবীর পূজা-অর্চনার জন্য পাঁচ নং টেলিয়ান অনুসারে ৪৬০.৮৬ একর জমি দেবোত্তর হিসেবে প্রদত্ত হয়। আমিশাপাড়া গ্রামে রাধানাথ চক্রবর্তী মহাশয়ের গৃহে মন্দির স্থাপন পূর্বক এই দেবী মূর্তি পূজিত হয়ে আসছে।২১ স্বাধীনতা পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের পরে বারাহী দেবীর পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে আমিশাপাড়ার ধর্মপ্রাণ হিন্দুগণ ৬.৬৮ শতাংশ দেবোত্তর ভূমির নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকারের নিকট আবেদন করলে সরকার তা মঞ্জুর করে এবং উক্ত দেবোত্তর ভূমি আমিশাপাড়া সর্বজনীন দেবালয় কমিটির পূর্ণ তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত রয়েছে।২২
মন্দির-কেন্দ্রিক জনবসতি ঃ
বারাহী দেবীর মন্দিরকে ঘিরে সেই প্রাচীন কাল হতেই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে আসছে। রাজা বিশ্বম্ভর শূর ঢাকা ও বরিশাল জেলা হতে বহু সংখ্যক ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ এনে এদেশে সংস্থাপন করেন। কালক্রমে তার চেষ্টায় জনশূন্য চর সুশোভন জনাকীর্ণ মানব নিকেতনে পরিণত হয়।২৩ কিন্তু ১৯৪৬ এর দাঙ্গা ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বহু সংখ্যক হিন্দু পরিবার প্রাণ ভয়ে স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে ভারতে পাড়ি জমান। বর্তমানে ৫০টি পরিবারের প্রায় ৩৬০ জন (২০০৮ সালের হিসেব অনুসারে) হিন্দু অধিবাসী এখানে বসবাস করছে। তারা প্রতিদিন নিজেদের দৈনন্দিন কর্ম সম্পাদনের পূর্বে বারাহী দেবীর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পূজা অর্চনা করে থাকেন। এখানে যেমন রয়েছে পুরোহিত তেমনি রয়েছে ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং কৃষিজীবী। তবে কতিপয় লোক শিক্ষকতা পেশায়ও নিয়োজিত। নারীরা গৃহস্থালী কর্মের পাশাপাশি কুটির শিল্পের প্রতিও নজর দেয় এবং গবাদি পশু-পাখি পালনেও উৎসাহী। মাধ্যমিক শিক্ষার চেয়েও প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি অভিভাবকরা বেশি গুরুত্ব দেয় বিধায় এখানকার প্রতিটি পরিবারের ৬-১২ বছর পর্যন্ত সকল শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী। এখানকার গৃহ এবং গৃহকেন্দ্রিক পরিবেশ পরিচ্ছন্ন পরিদৃষ্ট হয়। তবে এখানে কোন পাকা বাড়ি এমনকি আধা-পাকা বাড়িও নেই। রয়েছে টিন শেডের বাড়ি এবং কাঁচা বাড়ি। অধিবাসীদের আতিথেয়তা এবং আন্তরিকতার কমতি না থাকলেও রয়েছে অর্থনৈতিক দৈন্য।
পূজা-অর্চনা ঃ
বৈচিত্রময় বাঙালি সংস্কৃতির রয়েছে বার মাসে তের পার্বণ। এ তের পার্বণের কোন কোন পার্বণ আসে বিশেষ মাহাত্ম্য নিয়ে, আসে কিছু বিশেষত্ব নিয়ে। হিন্দু সম্প্রদায়ের সেই সব পার্বণের নানা উৎসব বারাহী দেবীর মন্দির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। উৎসবের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, হরিনাম যজ্ঞ, দুর্গোৎসব, সরস্বতী পূজা প্রধান। প্রত্যেক শুক্রবার রাতে হরিনাম জপ-কীর্ত্তন এবং বারাহী দেবীর আরাধনা কীর্ত্তন করা হয়।
ঠাকুর হাট (ঠাঁয়ুর হাট)
বর্তমান আমিশাপাড়া বাজার ঃ
আমিশাপাড়া বাজারের একসময় নাম ছিল ঠাকুরহাট (ঠাঁয়ুরহাট)। যা বারাহী বাড়ির ঠাকুরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। সেই ঠাঁয়ুর হাট বর্তমানে আমিশাপাড়া বাজার নামে সুপরিচিত। আবার আমিশাপাড়া শব্দটির ঐতিহাসিক কোন সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে জনশ্রুতি আছে যে, অতীতকালে আমিশাপাড়াতে বিভিন্ন বর্ণের লোক বসবাস করত। তাদের মধ্যে কোনও মিষ ছিল না বলে এ গ্রামের নাম আমিষাপাড়া রাখা হয়েছিল। কালক্রমে আমিষাপাড়ার ‘ষ’-এর পরিবর্তে ‘শ’ ব্যবহার করে আমিশাপাড়া লেখা হচ্ছে। সাধারণত আমিশাপাড়া বলতে আমিশাপাড়ার দুই বর্গমাইল এলাকাকে ধরে নেয়া হয়। এ দু’বর্গমাইলের লোক আমিশাপাড়া এলাকার লোক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এসেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি ইত্যাদি সব দিক দিয়ে অত্র এলাকা বাংলাদেশে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অত্র অঞ্চলের লোক সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করে আসছে। বর্তমান আমিশাপাড়া বাজার নোয়াখালী জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রাম্য বাজার। সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ও সোনাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রায় প্রত্যেক বাড়ি বা প্রত্যেক ঘরেই লন্ডন, আমেরিকা, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী রয়েছে। সে জন্য আমিশাপাড়া এলাকাকে ‘নোয়াখালীর লন্ডন’ বলা হয়।২৪
বারাহী দীঘি ঃ
আমিশাপাড়ার বড় বড় দীঘিগুলোর নামের সাথে বারাহী দেবী ও ভুলুয়ার সামন্ত রাজাদের স্মৃতি বিজড়িত। বারাহী দেবীর নামানুসারে বারাহী দীঘি। দীঘিটি এলাকাবাসীর সুপেয় পানীয় জলের কথা বিবেচনা করে ভুলুয়ার জনৈক সামন্তরাজা খনন করেন। বর্তমানে এর তিনপাড়ে জনবসতি গড়ে ওঠায় দীঘিটির আয়তন (পূর্বে ছিল ৩ একর) ও সৌন্দর্য্য অনেকাংশে কমে গেছে। বারাহী দীঘি ছাড়াও আমিশাপাড়ায় রাজা ভদ্র রায়ের নামানুসারে ভদ্রের দীঘি, রাজা বলরামের নামানুসারে বলরামের দীঘি রয়েছে।২৫ বলরামের দীঘির আয়তন ২ একর এবং ভদ্রের দীঘির আয়তন ২১/২ একর। তবে বর্তমানে দীঘিগুলোর সৌন্দর্য্য নেই বললেই চলে।
১৯৪৬-এর দাঙ্গা ঃ
নোয়াখালীর ইতিহাসে চরম কলঙ্কিত অধ্যায় ১৯৪৬ এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। সেই দাঙ্গাঁয় প্রায় সাড়ে ছয় শ’ বৎসর পূর্বের আবিষ্কৃত দেবী মূর্তি খন্ডিত হলে তা পশ্চিম বঙ্গে আনীত হয়ে সোদপুরে জনৈক পূজারীর বংশধরের বাড়িতে রক্ষিত ছিল। কিন্তু কিছুকাল পূর্বে মূর্তিটি সেখান থেকে অপহৃত হয় বলে জানা যায়।২৬
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ঃ
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী, দেশীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনী আমিশাপাড়ার নানা স্থানে আক্রমণ করলেও বারাহী দেবীর মন্দিরে কোন আক্রমণ বা মন্দিরের আশে-পাশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কোন প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেনি।
প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের আগমন ঃ
বারাহী দেবীর মন্দির প্রাঙ্গণে দেশ-বিদেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তির আগমন ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মহাত্মা গান্ধী এবং ইন্দিরা গা›দ্ধী। উল্লেখ্য যে, মহাত্মা গান্ধীর সাথে ১৯৪৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী আমিশাপাড়া বারাহী দেবীর মন্দির প্রাঙ্গণে আসেন এবং মহাত্মা গা›দ্ধী আমিশাপাড়া কৃষক বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক অধিবেশনেও অংশগ্রহণ করেন। মহাত্মা গা›দ্ধীর সাথে বিজয়লক্ষ্মী পন্ডিত, সুভাষ চন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎ চন্দ্র বসুও এসেছিলেন বলে জানা যায়। মহাত্মা গান্ধীর দৌহিত্র রাজেশ্বর গান্ধী গান্ধীজীর স্মৃতি দর্শনে ২০০০ সালে নভেম্বর মাসে আমিশাপাড়াতে এসেছিলেন২৭। এতদ্ব্যতীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিশিষ্ট কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন সময়ে আমিশাপাড়া তথা ভুলুয়ার অধিষ্ঠাত্রী পীঠ-দেবী বারাহী দেবীর মন্দির প্রাঙ্গণে আগমন করে এ এলাকাকে স্মরণীয় করে রেখেছেন।
যা আর হল না ঃ
১৯৪৬ এর দাঙ্গায় বারাহী দেবী মূর্তির এবং আমিশাপাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে শরৎ চন্দ্র বসু ও কৃষ্ণজীবনজী বিধ্বস্ত অঞ্চলের অবস্থা সম্যক পরিজ্ঞাত হয়ে এবং কলিকাতা প্রত্যাবর্তন করে মাড়োয়ারী চেম্বার অব কমার্সে বারাহী দেবীকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপক কর্মসূচিসহ এক গঠনমূলক কর্মপন্থা দেশের কাছে তুলে ধরেন। কিন্তু পরবর্তীকালে নোয়াখালী পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় উক্ত পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়।২৮
আমিশাপাড়া সর্বজনীন দেবালয় কমিটি ঃ
১৯৭৬ সালে বাবু শান্তি লাল চট্টোপাধ্যায়ের অকাল মৃত্যুতে ও তার নাবালক পুত্রগণের দেশ ত্যাগের পর অত্র আমিশাপাড়া এলাকার গণ্যমান্য ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের সমর্থনে গঠিত হয় ‘আমিশাপাড়া সর্বজনীন দেবালয় কমিটি’। উক্ত কমিটির তত্ত্বাবধানে বারাহী দেবীর অর্চনা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কর্মকা- সম্পন্ন হয়ে থাকে। বর্তমান (২০০৮সাল) কমিটিতে যারা বিভিন্ন পদে নিয়োজিত রয়েছেন তারা হলেন ঃÑ২৯
টুটুল লাল চট্টোপাধ্যায় (মূল সেবাইত)
কার্তিক চন্দ্র মাল -সভাপতি
পিযুষ চক্রবর্তী -সহ-সভাপতি
হরে কৃষ্ণ শীল -সাধারণ সম্পাদক
মানিক চক্রবর্তী -পুরোহিত
কানুলাল দেবনাথ -ধর্ম সম্পাদক
নন্দলাল দাস -সমাজকল্যাণ সম্পাদক
মিন্টু লাল দাস -প্রচার সম্পাদক
সদস্যবৃন্দঃ
শ্রীধাম চন্দ্র শীল
বিমল চন্দ্র শীল
প্রিয় লাল দাসযার কথা না বললেই নয়-
বাবু কার্তিক চন্দ্র মাল। বয়স ৬৫। এম.এ (বাংলা), বি.এড। প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক, খলিলুর রহমান ডিগ্রি কলেজ, আমিশাপাড়া, নোয়াখালী। অত্যন্ত সাদাসিধে, পরোপকারী এবং বন্ধুসুলভ মানুষ তিনি। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি গত প্রায় ৩০ বছর বারাহী দেবী নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত মানুষের মধ্যে বেশ কয়েকটি স্মৃতি আমরণ তার স্মৃতিপটে উপনীত থাকবে। উক্ত বিশেষ স্মৃতি বংশানুক্রমে জনশ্রুতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বারাহী দেবীর ইতিহাস কিংবদন্তি বা জনশ্রুতি হলেও অস্বীকার করা যায় না। নোয়াখালীর ইতিহাসের সাথে উক্ত দেবীর স্মৃতি সম্পূর্ণরূপে বিজড়িত। বহু ঐতিহাসিকের ইতিহাসই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।৩০
সাহায্য-সহযোগিতা ঃ
ভুলুয়ার শেষ জমিদার অরুণ চন্দ্র সিংহ বাহাদুর বারাহী দেবীর মন্দির উন্নয়নে এবং বাবু শান্তিলাল চট্টোপাধ্যায় এবং ডা: যদুবাবু মন্দির সংস্করণে ব্যাপক অবদান রাখেন। মন্দিরের আশে-পাশের জমির (দেবোত্তর সম্পত্তি) উৎপাদিত ফসলের আয় হতেও এর উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়। ইউ.এন.ও সোনাইমুড়ী ২০০৭ সালে মন্দিরের জন্য এক টন গম বরাদ্দ দেন। ২০০৮ সালে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং ১০ নং আমিশাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ পাঁচ হাজার টাকা করে মোট দশ হাজার টাকা প্রদান করেন। অর্থাৎ প্রতি বছরই কোন না কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি এই মন্দিরের জন্য আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। ঐতিহ্যবাহী এই মন্দির উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষে সবার এগিয়ে আসা উচিত।
শঙ্কিতঃ
বারাহী দেবীর পবিত্রতা ক্ষুণœ করতে এবং মন্দিরের ভূ-সম্পত্তি অবৈধ দখলের জন্য কতিপয় দুষ্কৃতকারীর হামলার আশংকায় অত্র এলাকার ধর্মপ্রাণ হিন্দুগণ শঙ্কিত।
যা করা প্রয়োজনঃ
বারাহী দেবীর মন্দির সংস্কারকরণ;
মন্দির কেন্দ্রিক পরিবেশের শ্রীবৃদ্ধিকরণ;
দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ;
বারাহী দেবীর ইতিহাস-ঐতিহ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাগ্রহণ;
আমিশাপাড়া সর্বজনীন দেবালয় কমিটির আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন;
বারাহী দীঘি, ভদ্রের দীঘি ও বলরামের দীঘির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ;
মন্দিরে শিশু শিক্ষা ও গণশিক্ষার ব্যবস্থাকরণ;
অধিবাসীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ;
ঐক্যবদ্ধ অবস্থান;
দাতাদের তালিকা লিপিবদ্ধকরণ;
বারাহী দেবীর বাড়ির তোরণকে আরো আকর্ষণীয় করণ;
পরিদর্শক বই- এর ব্যবস্থাকরণ ও যথাযথ ব্যবহার;
এখানকার অধিবাসীদের দেশত্যাগের ‘ভুত’ মাথা থেকে বিতাড়িতকরণ।
উপসংহার ঃ
নোয়াখালী তথা ভুলুয়ার আদি দেবী বারাহী দেবী। যা নোয়াখালীর ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বারাহী মন্দির বাংলাদেশের হিন্দুদের তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম স্থানে রয়েছে। দুঃখের বিষয় উন্নত দেশগুলোর মত আমাদের দেশে স্থানীয় ইতিহাস চর্চা তেমন একটা না থাকায় পাড়াগাঁয়ের অনেক মূল্যবান ঐতিহ্য বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ঐতিহ্যগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এগুলো হতে অনেক কিছু জানতে পারবে এবং যথেষ্ট উপকৃত হবে। সুতরাং বারাহী দেবীর স্মৃতিগুলো রক্ষা করার জন্য আমাদের প্রকৃষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তথ্যনির্দেশ ঃ
১. শ্রী হরে কৃষ্ণ শীল (সম্পাদনায়), শ্রী শ্রী বারাহী দেবী স্মরণিকা ‘মা’ আমিশাপাড়া সর্বজনীন দেবালয় কমিটি, নোয়াখালী, ১৯৮০, পৃ.৪।
২. ঘঁৎধষ ওংষধস কযধহ, ইধহমষধফবংয উরংঃৎরপঃ এধুবঃঃববৎং (ঘড়ধশযধষর), উধপপধ: ইধহমষধফবংয এড়াবৎহসবহঃ চৎবংং, ১৯৭৭, চ.৩১১.
৩. কে. আলী, মুসলিম বাংলার ইতিহাস, আলী পাবলিকেশন্স, ৭৭ পাটুয়াটুলী, ঢাকাÑ১, ১ম সংস্করণ, ১৯৭৭, পৃ.১১।
৪. ড. দীনেশ চন্দ্র সিংহ, নোয়াখালীর মাটি ও মানুষ, জ্ঞান প্রকাশ, ২৩/১ কলেজ রোড, কলিকাতা-৭০০০০৯, প্রথম প্রকাশ, শ্রী পঞ্চমী ১৩৯৯, পৃ.১-২।
৫. ঔধসবধং ডরংব, ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ ঃযব অংরধঃরপ ঝড়পরধঃু ড়ভ ইবহমধষ ঠড়ষঁসব ঢখ১১১, চধৎঃ-১, চধমব-২০৩.
৬. কাজী মোজাম্মেল হক, তিন হাজার বছরের নোয়াখালী, হিরামন প্রকাশনালয়, ১ম প্রকাশ: মে ১৯৮২, পৃ. ৪২।
৭. ড. এম আবদুল কাদের, নোয়াখালীতে ইসলাম, ই.ফা. ১ম প্রকাশ: অক্টোবর ১৯৯১, পৃ. ১২-১৩।
৮. শাহজাহান কিবরিয়া (সম্পাদক), শতবর্ষপূর্তি, নোয়াখালী পৌরসভা স্মারক গ্রন্থ ’৮২, পৃ.২৯।
৯. কাজী মোজাম্মেল হক, ইতিহাসের রূপরেখায় ফেনী, ১ম প্রকাশ: মে ১৯৭৭, পৃ. ১১
১০. জমির আহমেদ, ফেনীর ইতিহাস, সমতট প্রকাশনী, চট্টগ্রাম, ১ম প্রকাশঃ ২৬ মার্চ ১৯৯০, পৃ. ৪৮।
১১. মোঃ ফখরুল ইসলাম, বৃহত্তর নোয়াখালীর ইতিহাস, নোয়াখালী: আঞ্জুমান আরা বেগম, ১০ ডিসেম্বর ১৯৯৮, পৃ. ১।
১২. শ্রী কৈলাশ চন্দ্র সিংহ, রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস, গতিধারা, বাংলাবাজার, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ২০০৮, পৃ. ২২৫।
১৩. ড. খালেদ মাসুকে রসুল, নোয়াখালীর লোক সাহিত্যে লোক জীবনের পরিচয়, বাংলা একাডেমী, ঢাকা জুন ১৯৯২, পৃৃ. ১৮-১৯।
১৪. কাজী মোজাম্মেল হক, প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৩-৯৪।
১৫. বাবু কার্তিক চন্দ্র মাল (সম্পাদক), বার্ষিকী’০১, খলিলুর রহমান ডিগ্রি কলেজ, আমিশাপাড়া, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী, পৃ. ৬০।
১৬. ড. দীনেশ চন্দ্র সিংহ, প্রাগুক্ত, পৃ. (অনুল্লেখিত)।
১৭. বাবু কার্তিক চন্দ্র মাল, আমিশাপাড়া, সাক্ষাৎকার: ১৮ নভে.২০০৮।
১৮. শ্রী রতেœশ্বর চট্টোপাধ্যায়, নোয়াখালীর অধিষ্ঠাত্রী পীঠ-দেবী বারাহী।
১৯. রতন লাল চক্রবর্তী, বাংলাদেশের মন্দির, বাংলা একাডেমী; ঢাকা, জুন ১৯৮৭, পৃ. ৫৫।
২০. বারাহী দেবী মন্দিরের তিন টুকরো ইট আমার সংরক্ষণে রয়েছে।
২১. মহিম চন্দ্র চক্রবর্তী, ভুলুয়ার বারাহী, নোয়াখালী পত্রিকা, বাং ১৩২৩।
২২. শ্রী হরে কৃষ্ণ শীল (সম্পাদনায়), প্রাগুক্ত, পৃ. ২
২৩. শ্রী প্যারী মোহন সেন, নোয়াখালীর ইতিহাস, ১ম প্রকাশ: ১৮৭৬ খৃ., বইপত্র, বাংলাবাজার, ঢাকা, ১ম প্রকাশ: জুলাই ২০০৭, পৃ. ২২।
২৪. দৈনিক ইত্তেফাক, ১১ জুলাই ২০০৫।
২৫. বাবু কার্তিক চন্দ্র মাল (সম্পাদক), প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০।
২৬. ড. দীনেশ চন্দ্র সিংহ, প্রাগুক্ত, পৃ. (অনুল্লেখিত)।
২৭. বাবু কার্তিক চন্দ্র মাল (সম্পাদক), প্রাগুক্ত, পৃ.৬১।
২৮. ড. দীনেশ চন্দ্র সিংহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৩।
২৯. পিযুষ চক্রবর্তী, আমিশাপাড়া, সাক্ষাৎকারঃ ১৮ নভে. ২০০৮।
৩০. বাবু কার্তিক চন্দ্র মাল, আমিশাপাড়া, সাক্ষাৎকার ঃ ১৮ নভে. ২০০৮।
|