Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

সুললিত কন্ঠের সুর মূর্চ্ছনার আভাস দিলেন
নোয়াখালীর গর্বিত কন্যা শিল্পী সুমনা হক

দীর্ঘ ১৫ বছর পর আধুনিক বাংলা গানের একক এ্যালবাম নিয়ে এলেন নোয়াখালীর সন্তান, কন্ঠতারকা ও চিত্রশিল্পী সুমনা হক। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একক অ্যালবাম ‘কিছু স্মৃতি কিছু বেদনা’। অ্যালবামটি শিল্পীর আধুনিক গানের তৃতীয় এ্যালবাম। এতে গান রয়েছে ৭টি। সুর-সংগীত করেছেন মুম্বাইয়ের যশপাল মনি। গানগুলোর রেকর্ডিং হয়েছে মুম্বাইয়ে। বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয় জিঙ্গেল গায়িকা সুমনা হকের গানের প্রথম এ্যালবাম ‘মায়াবী এ রাতে’ প্রকাশ পায় ১৯৮৮ সালে। এক যুগ বিরতির পর ২০০০ সালে বাজারে আসে তাঁর আধুনিক গানের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘মাঝে কিছু বছর গেল’। ২০০৮ সালে একটি রবীন্দ্র সংগীত গাইলেও এবার ১৫ বছর পর আধুনিক গানের অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে সুমনা হক বলেন, নিজের ভালো লাগাত রয়েছেই, সেই সঙ্গে ভক্তদের অনুরোধেই নতুন করে গানে ফেরা। তবে গানে নিয়মিত হওয়ার পরিকল্পনা নেই। ভক্তদের চাওয়াকে মূল্য দিতেই এ অ্যালবাম করা। গানগুলো ভক্ত-শ্রোতাদের ভালো লাগলেই চেষ্টা সার্থক মনে করব। সুমনা হক জানিয়েছেন, প্রায় প্রতিটি গানেই এ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতি প্রসঙ্গে সুমনা হক জানান, পেইন্টিংয়ের নেশায় গান থেকে দূরে ছিলাম। ২০০০ সালে যখন দ্বিতীয় অ্যালবাম প্রকাশের পর মনে হয়েছিল, একটা জগৎতো দেখলাম- এবার অন্য কিছু করা যাক। এ চিন্তাধারা থেকেই ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে রঙতুলি হাতে তুলে নিয়েছিলাম। এরপর কেমন করে যে ১৫ বছর কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ‘কিছু স্মৃতি কিছু বেদনা’ প্রকাশ করলেও নিজস্বতা বজায় রেখে সমকালীন শ্রোতা-উপযোগী গান করার চেষ্টা করেছি।
জনপ্রিয়তা থাকার পরও গান ছাড়ার কারণ সম্পর্কে সুমনা হক বলেন, পেইন্টিংয়ের নেশা বরাবরই ছিল। গান থেকে দূরে সরে যাওয়ার এটা একটা কারণ। দ্বিতীয়ত, নিত্যদিন জিঙ্গেলে (বিজ্ঞাপনের গান) কন্ঠ দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। সকাল-দুপুর-রাত একাকার হয়ে যেত জিঙ্গেল রেকর্ডিং করতে করতে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। জিঙ্গেলের তো রেকর্ড থাকে না। ভালো লাগলেও কোনো শ্রোতা যেকোনো সময়ে তা শোনার সুযোগ পাবেন না। কত সহস্র বিজ্ঞাপনের গান গাইলাম, কিন্তু সে গানগুলো কি কন্ঠশিল্পী হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে? নিজের কাছে নিজে এমনই কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলাম। তারপরই সিদ্ধান্ত নিয়েছি গান থেকে সরে দাঁড়ানোর। তবে এতকিছুর পরও আমি পারিনি গান থেকে দূরে থাকতে। অর্থ বা জনপ্রিয়তার মোহে নয়, ভালোবাসার তাগিদেই আবার গানের ভুবনে ফিরে এসেছি। তবে নিয়মিত গাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। আগামীতে আর কোনো অ্যালবাম করব কিনা, তাও জানা নেই।
শিল্পী সুমনা হকের শিল্পাঙ্গনে আবার সক্রিয় হবার খবরে সংস্কৃতি জগতে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। সবাই আশা করছেন প্রতিশ্রুতিশীল এই শিল্পী তাঁর কন্ঠের সুর মাধুর্যে স্রোতার হৃদয় স্পর্শ করবেন। শিল্পী সুমনা হক এগিয়ে যাবেন সৃষ্টিশীলতার পথে, সুর-বৈভব ছড়িয়ে দিতে জনপদ থেকে জনপদে।

শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র সুমনা হক’র পরিচিতি
বিশিষ্ট গায়িকা ও অংকন শিল্পী সুমনা হক ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালীর চৌমুহনীতে। পিতা ইপিআইডিসি’র সাবেক অর্থ পরিচালক মরহুম আনোয়ারুল হক, মাতা প্রখ্যাত কবি খালেদা এদিব চৌধুরী। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ সাবেক রাষ্ট্রপতি ডাঃ এ কিউ এম বদরুদ-দৌজা চৌধুরী এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক, বামপন্থি রাজনীতিক শহীদুল্লাহ কায়সার তাঁর খালু, অধ্যাপিকা পান্না কায়সার তাঁর খালা। তাঁর ভাই ইঞ্জিনিয়ার তানভীরুল হক প্রবাল রিহ্যাব’র প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
সুমনা হকের স্বামীর নাম ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মওলা আলী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পেইটিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে আর্টস ইনস্টিটিউটের জয়নুল গ্যালারিতে তাঁর একক চিত্র প্রদশনী অনুষ্ঠিত হয়। তিনি শংকর আন্তর্জাতিক শিশু চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় তিনবার পুরস্কার লাভ করেন। গান ও ছবি আঁকায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও ছবি আঁকার প্রতি তাঁর রয়েছে বিশেষ আকর্ষণ। সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে আমেরিকা, কানাডা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন।
সুমনা হকের প্রিয় শিল্পী হলেন-বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, এস এম সুলতান এবং ফরাসী শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যাগ গগ। তাঁর দৃষ্টিতে নোয়াখালীর কৃতী সন্তান প্রফেসর কবীর চৌধুরী অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। নাটকের ক্ষেত্রে রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, ত্রপা মজুমদার, লাকী ইনান, ড. ইনামুল হক, এটিএম শামসুজ্জামান, শমী কায়সার, নাট্যচার্য সেলিম আল দীন, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ নোয়াখালীর সন্তানদের সম্পর্কে গৌরববোধ করেন। তাঁর মতে এঁরা দেশের গৌরব বৃদ্ধির সাথে সাথে নোয়াখালীরও গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। শিল্পী সুমনা হকের নোয়াখালীর সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকলেও অনেক আত্মীয়-স্বজন ঢাকায় নিয়মিত থাকেন, যাদের মাধ্যমে পিতৃভূমি নোয়াখালীর খবরা-খবর জানতে পারেন।

১৯৯৮ সালে লক্ষ্মীপুর বার্তা পত্রিকার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে সুমনা হক
উক্ত সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা কী হতে পারে -এমন প্রশ্নের জবাবে সুমনা হক বলেন, শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা অবশ্যই থাকবে। সমাজের সবচেয়ে সচেতন ও অনুভূতিশীল মানুষ হিসেবে একজন শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তথা বুদ্ধিজীবী দেশ, সমাজ ও জাতির আহ্বানে অবশ্যই সাড়া দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের মাধ্যমে শিল্পী সমাজ তাদের যথাযোগ্য ভূমিকা রাখেন। এটিই জাতির প্রতি একজন শিল্পীর দায়বদ্ধতা।
একজন শিল্পী সারাবিশ্বের প্রতিনিধি হয়েও কেন দেশ ও অঞ্চলের টান অনুভব করেন -এমন জিজ্ঞাসায় শিল্পী সুমনা হক বলেন, সারাবিশ্বের প্রতিও একজন শিল্পীর প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে। শিল্পীতো পৃথিবীরই একজন। তবে মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা একজন শিল্পীকে মহত্ব দান করে। চারপাশের জগৎ, জীবন, প্রকৃতি ও তার সৌন্দর্য একজন শিল্পীকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দান করে। এটাই বড় কথা। শিল্পীর মধ্যে অনন্য গুণাবলিই তাকে মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। তবে শিল্পী প্রথমে নিজের সন্তুষ্টির জন্যই শিল্প সৃষ্টি করেন।
শিল্পজীবনে কার অনুপ্রেরণা বেশি পেয়েছেন -এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাবা-মা আমার সকল প্রেরণার উৎস। ছবি আঁকার জগতে প্রবেশ করেছিলাম বাবার হাত ধরে। খুব উৎসাহ-অনুপ্রেরণা দিতেন সেই ছোট্টবেলা থেকে। বাবা আবার খুব ভালো গান গাইতে পারতেন। তাঁর সেই সংগীত প্রিয়তা মনে হয় আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। আজ সংগীত ভুবনের একজন প্রতিনিধি হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে পারছি। এতে বাবার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। অন্যদিকে আমার ওস্তাদ গোপাল চন্দ্র দাশ ও ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ আমাকে সংগীতের ক্ষেত্রে যে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, সে ঋণ পরিশোধ হবার নয়।
সংগীত ও চিত্রাংকন, এ দু’টির মধ্যে কোন্টিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন -এমন জিজ্ঞাসায় তারুণ্যদীপ্ত শিল্পী সুমনা হক বলেন, দু’টোতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি; তবে ছবির দিকে আমার আকর্ষণ বেশি। কারণ এটিই আমার নিজস্ব ভুবন, যেখানে আমিই স্রষ্টা। চেতনায় যে রূপকল্প ভেসে ওঠে, তা-ই মূর্ত হয়ে ফুটে ওঠে ক্যানভাসে।
বৃহত্তর নোয়খালীর মুখপত্র লক্ষ্মীপুর বার্তা’র মূল্যায়ন করতে গিয়ে সুমনা হক বলেন, আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকার জগতে লক্ষ্মীপুর বার্তা একটি উজ্জ্বল নাম। এ পত্রিকার জন্য আমার শুভ কামনা রইল।