Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

আমি আদর্শ জীবন গড়ার পক্ষে; যে জীবন মৃত্যুর পরও যুগযুগ বেঁচে থাকে, মানুষ অনুসরণ করে -হাবিব উল্লাহ, ফাউন্ডার এমডি, সিটি হসপিটাল

আমার জন্ম ১৯৩২ সালে ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলায়। আমি দাগনভূঁইঞা কামাল আতাতুর্ক হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করি ১৯৪৭ সালে। তখন আসাম-বেঙ্গল-বিহারের মধ্যে এ স্কুলটি ছিল একটি স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ। আমি আতাতুর্ক হাইস্কুলের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলাম, খেলাধুলার প্রতি তখন শিক্ষার্থীদের খুব আগ্রহ ছিল। তখন স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো। এরপর আমি ফেনী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে হায়ার সেকেন্ড ক্লাস পেলাম। পরবর্তীতে শারীরিক অসুস্থতার জন্য আমার পড়ালেখার বিঘœ ঘটে। ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর বি কম ক্লাসে ভর্তি হলাম চট্টগ্রাম গভর্ণমেন্ট কমার্স কলেজে। ছাত্রাবস্থায়ই এজিবি অফিসে চাকরিতে যোগ দেই এবং নাইট ক্লাসে ল’তে ভর্তি হই। ল’ কলেজটি তৎসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ছিল। এরই মধ্যে ব্যবসাও শুরু করি। ল’ এর সেকেন্ড ইয়ারে পড়াকালীন সময়ে খুলনা চলে যাই ব্যবসা উপলক্ষে।
১৯৫৮ সালে এজিবির চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি একটি কোম্পানীতে যোগ দেই একাউন্টেন্ট হিসেবে। কোম্পানীর প্রধান ছিলেন হুমায়ূন খাঁ পন্নী। তিনি কোম্পানি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আসলেন তাজুদ্দিন আহমদ, পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। অত্যন্ত অমায়িক ও দরদী মানুষ। ছিলেন খুব দায়িত্বসচেতন। পরবর্তীতে আমি কোম্পানির চাকরিও ছেড়ে দিলাম, কুমিল্লায় গেলাম ব্যবসা করব বলে। তাই আর ল’ পাস করা হলো না। তাছাড়া আইন পেশায় সম্পৃক্ত হব -এমন লক্ষ্যও ছিল না। তবে আইন পাস করে আইন-কানুন বুঝে-শুনে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করব -এটিই ছিল আমার লক্ষ্য। কুমিল্লা থেকে ফিরে এসে ঢাকায় ব্যবসা শুরু করি। ১৯৮১ সালে মাল্টিমুড কোম্পানী গড়ে তুলি। আমি এর চেয়ারম্যান, আমার ভাতিজা আবদুল আউয়াল মিন্টু এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। সে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে, এরপর মেরিন একাডেমি থেকে ফার্স্টক্লাস নিয়ে পাস করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। সে আমেরিকা থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে। দেশে ফিরে এসে মাল্টিমুড কোম্পানী পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করে। আমি জীবনে বহু ব্যবসা করেছি, ব্যবসায় মেধা ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়েছি। শ্রম দিয়েছি, কিন্তু ১টি টাকাও কাউকে ঘুষ দেইনি। হাবিবুল্লাহ আরও বলেন, ১৯৮৩ সালে আমি বেসরকারি খাতে দেশের প্রথম ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক লিঃ প্রতিষ্ঠা করি, আমি এর ফাউন্ডার ডাইরেক্টর। সে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলাম, এক্সিকিউটিভ কমিটিরও চেয়ারম্যান ছিলাম।
এরপর ১৯৯৯ সালে সিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করি; আমি এর ফাউন্ডার এমডি। ২০০৬ সালে লালমাটিয়ায় নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয় এ হাসপাতাল, আমি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আজও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। মাল্টিমুডে মাঝে মাঝে যাই, তবে বেশিরভাগ সময় সিটি হাসপাতালে থেকে মানুষের সেবা করার চেষ্টা করি।
আমি যখন বিবাহ করি, তখন আমার স্ত্রী রিজিয়া বেগমের বয়স ছিল ১৩ বছর, সবে প্রাইমারি পাস করেছেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর তিনি বললেন, আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেব। ১৯৬৭ সালে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে পাস করলেন। ১৯৬৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলেন। এরপর ১৯৭২ সালে ইডেন কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হলেন। হায়ার সেকেন্ড ক্লাস নিয়ে বিএ পাস করলেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। ভালোয় ভালোয় ফার্স্ট পার্ট কমপ্লিট করলেন, কিন্তু সেকেন্ড পার্টের সময় একটা সমস্যা হলো। তবে তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিলে একটি কোর্স করেন, এর মধ্যে একটি ডিপ্লোমাও সম্পন্ন করেন।
১৯৬৬ সালে আমার ছেলের জন্ম হয়। সে ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে, ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স থার্ড ইয়ারের সময় সে আমেরিকা চলে যায়। কিন্তু পড়ালেখা ছাড়েনি, আমেরিকাতে সে ম্যানেজমেন্টে এমএস ডিগ্রি অর্জন করে। এরপর কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয় পিএইচডি করার জন্য। দেশে ফিরে এসে সে ব্যবসাক্ষেত্রে মনোনিবেশ করেছে।
আমার বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে। এ বিষয়ের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করেছে। আমার দ্বিতীয় মেয়ে হলিক্রস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে, ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ইডেন কলেজ থেকে। সোসিওলজিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করে। বড় মেয়ের বিয়ে হয় ১৯৮৩ সালে, স্বামী ডাক্তার। দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে হয় ১৯৮৪ সালে, তার স্বামীর নাম ডঃ আশরাফ হোসেন। তিনি আরও বলেন, ১৯৬৫ সালে আমার ছোট মেয়ের জন্ম হয়। সে অগ্রণী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেকেন্ড ক্লাস নিয়ে মাস্টার্স পাস করে। তার স্বামী ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, ইকনমিক্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট।
বড় মেয়ের এক ছেলে এক মেয়ে; ছেলে ডাক্তার, বিয়ে করেছে এক ডাক্তারকে। মেয়ে ডাক্তার, বিয়েও করেছে এক ডাক্তার ছেলেকে। মেঝো মেয়ের দুই মেয়ে। দুজনই ডাক্তার। বড়টির বিয়ে হয়েছে এক ডাক্তারের সঙ্গে, ছোটটিরও বিয়ে হয়েছে এক ডাক্তারের সঙ্গে। ছোট মেয়ের দ্ইু মেয়ে। বড়টি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। ছোটটাও পড়ালেখা করছে হার্ভার্ডে।
বর্তমানে যে রাজনীতি চালু রয়েছে, তা আমাদের সময়ে ছিল না। ভালো এবং মেধাবী তরুণরাই ছিল রাজনীতির কান্ডারী। আমি নিজে রাজনীতিতে অংশ নেইনি; রাজনীতিবিদ এবং আমার জীবনধারা সম্পূর্ণ আলাদা। আমি ছিলাম আদর্শ জীবন গড়ার পক্ষে, যে জীবন মৃত্যুর পরেও যুগ থেকে যুগান্তরে অক্ষয় থাকে, মানুষ অনুসরণ করে। এ চেতনা বুকে ধারণ করে শুরু হয় আমার কর্মময় জীবন। আজও সেই চেতনাকে বুকে লালন করে চলেছি। আমরা ৩/৪ বন্ধু প্রায়ই শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে যেতাম; উদারপ্রাণ মানুষ, তিনি আমাদের সাথে কথা বলতেন আন্তরিকতার সাথে। পরবর্তী সময়ে তিনি আমাকে আমার নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যবসায়িক কিছু কৌশলের কারণে আমি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারিনি। বিএনপি’র আমলেও একই ধরনের প্রস্তাব আসে। আমাকে বলা হয় আপনি শুধু ফরম পূরণ করে দিন, বাকিটুকু আমরা করব। আমি সবিনয়ে তাদের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছি। তখনকার রাজনীতিবিদদের মধ্যে এ চিন্তা-চেতনা ছিল না যে, রাজনীতি করে গুলশান বনানীতে বাড়ি করব, ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলব। সেবার মনোভাবই ছিল প্রধান। কিন্তু আজ সেই রাজনীতিবিদ খুঁজে পাওয়া ভার। তাই জীবনের পড়ন্ত বিকেলে মনে বড় সাধ জাগেÑ সেই রাজনীতির ধারা দেখে যেতে। আরও দেখে যেতে মন চায়Ñ বাংলাদেশও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর একটি হবে; যেখানে হাহাকার নাই, দলাদলি নাই, হিংসা-বিদ্বেষ নাই।