মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কিংবদন্তি ও স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা খালেদ মোহাম্মদ আলী

ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোহাম্মদ আলী বহুমুখী প্রতিভায় ভাস্বর, বর্ণিল গুণাবলির কর্মযোগী এক বিরল ব্যক্তিত্ব। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে যে ক’জন সংগ্রামী ও ত্যাগী ছাত্রনেতার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, লক্ষ্মীপুরের এই গর্বিত সন্তান তাদের অন্যতম। তৎকালীন সময়ে তার তেজোদ্দীপ্ত প্রতিভা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টি করায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সুনজরে পড়েন এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেবার সুযোগ লাভ করেন। তিনি শুধু একটি সাধারণ নামই নন বরং একটি সংগ্রাম, একটি ইতিহাস, একটি প্রতিষ্ঠান, বৈচিত্রময় ও সফল জীবনের অধিকারী। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকাই তার জীবনকে দিয়েছে বর্ণিল আভা, কর্মযোগকে করেছে সুষমা মন্ডিত। একজন দক্ষ সংগঠক, জনকল্যাণকামী ও দূরদর্শী এই সাহসী মানুষটি জনকল্যাণকামীতার কারণেই সারাদেশে পরিচিত। এককালের তুখোড় এই ছাত্রনেতাকে চেনে না এমন লোক এদেশে বিরল। তিনি একজন পূর্ণ আধুনিক মানুষ, মানবিক সংস্কৃতির বন্ধনে বিশ্বাসী, নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। মানুষ হিসেবে তিনি মমতাময়, স্নেহপরায়ণ ও অমায়িক বন্ধুবৎসল। বিরক্ত হন না, রাগেন না। কোনো কিছু জানতে চাইলে অনায়াসে বলে দেন। বৃহত্তর নোয়াখালীর মুখপত্র লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সাথে এবং এর প্রকাশক ও সম্পাদক ড. এম হেলাল এর সাথে জননেতা খালেদ মোহাম্মদ আলীর বরাবরই একটি সুসম্পর্ক ছিল।
হাস্যোজ্জ্বল ও চিরসবুজ এ চৌকস মানুষটির সাথে সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর বার্তা পত্রিকার প্রতিনিধিদের কয়েকদফা আলাপ হয়; যার অংশবিশেষ এখানে উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণে গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ও আনিসুর রহমান এরশাদ।
লক্ষ্মীপুর বার্তা পত্রিকাঃ আপনি মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার অনুভূতি কী?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ অবশ্যই এটি আনন্দের ও গর্বের। কেননা আমাদের স্বাধীনতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, উন্নতির মুখ্য সহায়। বহু রক্ত, জীবন এবং ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে সগৌরবে স্থান করে নিয়েছে। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা পেয়েছি লাল সবুজে মিশ্রিত পতাকাবাহী একটি সবুজ শ্যামল দেশের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব। শত বছরের পরাধীনতা আর শৃঙ্খলা ভেঙ্গে মুক্ত বিহঙ্গের মতো পাখা মেলে এদেশের স্বতন্ত্র পতাকা। এখন আমাদের চিন্তার, বলার এবং লেখার স্বাধীনতা আছে।
লবাঃ স্বাধীনতার পর সুদীর্ঘ ৪৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। সেই সময় এবং এই সময়কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ দেখুন, উনসত্তরের উত্তাল গণআন্দোলনে সারা বাংলাদেশে নেতৃত্ব দানকারীদের মধ্যে আমিও ছিলাম। সেই সময়কার ছাত্রনেতাদের কালজয়ী ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশ ’৬২ থেকে ’৭১ এর সংকটময় মুহূর্তগুলোকে জয় করতে সক্ষম হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তরুণ ও যুবকদের বিরাট অবদান রয়েছে, রয়েছে ত্যাগ ও তিতিক্ষা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের মহান ত্যাগ ও অবদানের জন্যই তারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে বিবেচিত ও স্বীকৃত। শহীদ-গাজী-পঙ্গু বীর সেনাদের নির্ভীকতা-সততা-সাহসিকতার জন্য এই জাতি চিরদিন গর্ববোধ করবে। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো সেই সময়। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন ও অসম্মান করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে, বিচার হচ্ছে দেখে যেতে পেরে এই সময়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।
লবাঃ আপনাদের সময়ের ছাত্র-রাজনীতি ও বর্তমান ছাত্র-রাজনীতি প্রসঙ্গে কিছু বলবেন কী?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ শুধু আমি নই, একসময়ে যারা ছাত্র-রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন সবারই উদ্দেশ্য ছিল দেশের মাটি ও মানুষের সেবা করা। সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ বা অন্ধ দলীয় স্বার্থে তারা কাজ করতেন না। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তারা ঐক্যবদ্ধ হতেন, সম্মিলিত প্রয়াসেই জাতীয় স্বার্থ অর্জনে সচেষ্ট থাকতেন। বর্তমানে কিছু ছাত্রনেতার কর্মকান্ড দেখলে কষ্ট হয়। বর্তমান নেতাদের অনেকে সিনিয়র নেতাদের সম্মান করে কিনা সন্দেহ রয়েছে।
আমি মনে করি, সমগ্র জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হচ্ছে আমার ছাত্ররাজনীতির সময়। কলেজ জীবনে প্রবেশ করেই প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। চৌমুহনী কলেজে অধ্যয়নকালীন ১৯৬০ সালে কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পেয়ে নির্বাচিত হই। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে আমিই প্যানেল থেকে একমাত্র নির্বাচিত হয়েছিলাম। ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘনীভূত হতে থাকে এবং ১৯৬২ সালে প্রথম তা বিস্ফোরোন্মুখ হয়। এ সময় নোয়াখালীতে আমার নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। ১৯৬২ সালে আমি নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। আমি তখন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করতে শুরু করি এবং তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে সম্পৃক্ত হই। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারী ছাত্রনেতাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ঐ বছরের ঐতিহাসিক ৭ই জুনের শ্রমিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় এবং আমি এসময় নির্বাচন কমিশনের সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলাম। এছাড়া ছাত্রলীগের সংবিধান ও ঘোষণাপত্র সাব কমিটির চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেছি।
১৯৬৮ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। এরপর ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই ১১ দফা আন্দোলন সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়। এসময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি তৎকালীন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করেছি। ১৯৬৮ সালের আগস্ট এর শেষ সপ্তাহে বরিশালে ছাত্রলীগের সভার পর হোটেল গুলবাগ থেকে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। এরপর পুলিশের সাথে ছাত্রলীগ কর্মীদের ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষের এক পর্যায়ে হোটেলের তিন তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে হেঁটে এবং নদী সাঁতরিয়ে মাদারীপুর চলে আসি। তৎকালীন সময় মাদারীপুর ছাত্রলীগের সভাপতি বর্তমান নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান আমাকে দেখা মাত্রই নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান এবং খুলনা যাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। ছাত্রজীবনের এসব সাংগঠনিক তৎপরতা ও তীব্র আন্দোলন এর অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আমাদের সময়ের ছাত্ররাজনীতি অস্ত্রনির্ভর ছিল না, ছিল আদর্শনির্ভর। দলীয় সমর্থন ছিল তবে অন্ধ আনুগত্য ও লেজুড়বৃত্তি ছিল না। বর্তমানে অনেক ছাত্রনেতা যেভাবে সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজি করে, জোর-জবরদস্তি করে ক্ষমতা দেখিয়ে সংকীর্ণ স্বার্থ হাসিলে মগ্ন থাকে তাতে সন্তুষ্ট হবার কোনো কারণ নেই। ছাত্ররাজনীতির গুণগত পরিবর্তন জরুরি। ছাত্রনেতাদের অবশ্যই দেশ ও জাতির স্বার্থে নিবেদিত হওয়া জরুরি।
লবাঃ ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে আসলেন কীভাবে এবং কেন?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ দেখুন সেই সময়ে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে একক সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এদেশের গণমানুষ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল। ছাত্রলীগের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছিল। ছাত্রলীগের সে ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্তি লাভ করে। আমি উত্তাল সেই আন্দোলনের দিনগুলোতে যেহেতু ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, ফলে পরবর্তীতে সেই আবেগ অনুভূতি বৃহত্তর কল্যাণে নিবেদিত হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
’৬৯ সালে আমি জাতীয় শ্রমিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করি এবং দেশের বিভিন্ন শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা বিশেষ করে তেজগাঁও, টুঙ্গী, আদমজী, পোস্তগোলা, হাজারীবাগ, সিলেটের শ্রীমঙ্গল, খাদিম ইত্যাদি এলাকায় চা শ্রমিকদের দাবির আন্দোলনকে সংগঠিত করতে থাকি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য তথা ন্যাশনাল এসেম্বলি (এমএনএ) নির্বাচিত হই। আমিই ছিলাম পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। ১৯৬২ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত হুলিয়া-পরোয়ানা বহুবারই আমার বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে। আমাকে লক্ষ্য করে পাকিস্তান পুলিশ কয়েকবারই গুলি ছুঁড়েছে কিন্তু অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছি। ’৬৯ সালে শহীদ আসাদ আমার সম্মুখে গুলিবিদ্ধ হন এবং আমার হাতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে আমি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যাই। আগরতলায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এপ্রিলের ২২ তারিখে নোয়াখালী অঞ্চলে ফিরে এসে রামগতি, লক্ষ্মীপুর , রায়পুর, রামগঞ্জ, চন্দ্রগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করি। জুন মাসে পুনরায় ভারতে যাই এবং মুজিবনগর সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করি। আমি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পূর্ব জোনের ডাইরেক্টর মোটিভেশন ছিলাম। এছাড়া সাউথ ইস্টার্ণ জোন-২ এর মেম্বার ফাইন্যান্স এবং মুজিবনগর সরকারের অধীনে ২ নং সেক্টরের সিভিল এফেয়ার্স এডভাইজারি কমিটির সদস্য ছিলাম। এছাড়াও আমি পূর্ব জোনের রিক্রুটমেন্ট এবং মুভমেন্ট ইনচার্জ ছিলাম। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর এর বিজয় লাভের মাত্র দু’দিন পরে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমি, গাজী গোলাম মোস্তফা এবং মইজুদ্দিন ও আহরাম সিদ্দিকী কোলকাতা থেকে ঢাকায় এসে মুজিব বাহিনী এবং মুক্তি বাহিনীর দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা পালন করেছিলাম।
লবাঃ মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ গঠনে আপনি কীভাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর আমরা দেশ গড়ার জন্য যুবকদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করি। ’৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ’৭২ সালের প্রথম সপ্তাহ -এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মতো মিশরের কায়রোতে আফ্রো-এশিয়া সলিডারিটি কমিটির সম্মেলনে যে প্রতিনিধিদল পাঠানো হয় আমি তাদের মধ্যে ছিলাম। এছাড়া দ্বিতীয় যে প্রতিনিধি দল সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সফরে যান, আমি সে দলেরও প্রতিনিধি ছিলাম। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের পার্লামেন্টের রুলস প্রসিডিওর এবং সংবিধান প্রণয়ন সাব কমিটি কন্সটিটিউয়েন্ট এসেম্বলি (এমসিএ) এর সদস্য হিসেবে কাজ করেছি।
লক্ষ্মীপুর ও অত্র অঞ্চলের উন্নয়নে আমি কাজ করেছি এবং করে যাচ্ছি। লক্ষ্মীপুর থানাকে মহকুমায় উন্নীত করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছি। আজ সেই লক্ষ্মীপুর স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। তাছাড়া এই জেলায় প্রথম বিদুৎ আনা, বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা স্থাপন, সড়ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছি। অত্র অঞ্চলের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রম ও প্রচেষ্টাকে নিয়োজিত রাখতে আমি সবসময় আন্তরিক ছিলাম।
১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে এবং ১৯১৬ সালে আমার পূর্ব পুরুষ কর্তৃক ওয়াকফকৃত সম্পত্তির ৬ষ্ঠ মোতায়াল্লী হিসেবে নিযুক্ত রয়েছি। আমি সাধারণ বীমা করপোরেশনে চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি।
দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সংগঠন-প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে আমাকে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা এবং ছাত্র আন্দোলনে সফলভাবে নেতৃত্বদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত করেছে। চেকোশ্লোভিকিয়ার একটি ইউনিভার্সিটি থেকে ১টি অনারারী ডিগ্রি এবং সার্টিফিকেট ও ১টি মেডেল প্রদান করেছে।
লবাঃ ’৭১ এর উত্তাল দিনগুলোতে মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর নোয়াখালীতে আপনার কোনো স্মৃতি আছে কী?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ২৫ মার্চের পর নোয়াখালীতে প্রথম প্রতিরোধ হয়। ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সবাই ক্কারী করিমুল্লাহর বাড়িতে ছিল। তখন পাকবাহিনী ঢুকতে পারেনি। রাজাকার বাহিনী গঠন হওয়া পর্যন্ত কিছুদিন সবাই তার বাড়িতে অবস্থান করছিল। চন্দ্রগঞ্জ, মান্দারী ছাড়া শুধু নোয়াখালীতে তাদের হেড কোয়ার্টার ছিল। রাজাকার ক্যাম্প চন্দ্রগঞ্জে হওয়ার পূর্বেই আমি ক্কারী করিমুল্লাহর বাড়িতে উঠলাম। আমাকে দেখে ওরা খুব হতবাক হয়ে গেল। আমি কোত্থেকে আসলাম, আমাকে কোথায় রাখবে, আমাকে কোথায় খাওয়াবে। যখন চন্দ্রগঞ্জে রাজাকার ক্যাম্প বসে গেল, তখন সেখানে থাকা নিরাপদ মনে হলো না। কারণ আমি এই এলাকাতে বা আশেপাশের অঞ্চলে কয়েকটা ইউনিয়নে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের তথা বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচি পালনকারী হিসেবে পরিচিত ছিলাম। ফলে ছয়আনি বাজারের উত্তরে একটা বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করি। এখান থেকে সেদিনই নোয়াখালীর রাজনগরে মি. নিত্য গোপাল দেবনাথের বাড়িতে ক্কারী করিমুল্লাহসহ যাই। নিত্যগোপাল বাবু বর্তমানে এডভোকেট। ঐখান থেকে আবার সদরের দিকে জনাব খিজির আহমেদ চৌধুরীর এলাকাতে ছিলাম।
রাত্রির অন্ধকারে এসব বাড়িতে যেতে হয়েছে। তখন বুঝলাম, আমাকে নিয়ে ওদের একটা প্রবলেম হচ্ছে। আমাকে দেখতে নাকি তখন বাঙালির মতো মনে হতো না। ঝিক ঝিকে রাত্রে বাইরে মানুষ তাকিয়ে দেখত। ঢাকা থেকে এলাকায় চলে আসা ছাত্ররাও আমাকে চিনে ফেলে। সবাই ফুসুর-ফাসুর করে বলে যে খালেদ ভাই। আমি যেদিকে যেতাম, সেদিকেই নিউজ আউট হয়ে যেত। আমরা তখন উত্তর অঞ্চলে পানপাড়ায় সুবেদার লুৎফর রহমান এর ওখানে গিয়ে সংগঠনের কাজ শুরু করলাম। তখন ক্কারী করিমুল্লাহসহ অনেকেই আমার সাথে ছিল। পরবর্তীতে আমি ভারতে চলে যাই।
স্বাধীনতার ইতিহাস বলতে গেলে নোয়াখালীতে এবং লক্ষ্মীপুরে খুব কম লোক ছিল এদের মধ্যে আবদুর রব চেয়ারম্যান ছিল, চৌমুহনীর গাজী আমিনউল্লা ছিল। সাংগঠনিক কাজে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য আমাকে সভাপতি করে একটা কমিটি করা হয় উত্তরাঞ্চলে। আবির পাড়ার আবুল খায়ের ভূঁইয়া কমিটির সেক্রেটারী ছিল। সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী একটি রাজনৈতিক দল আমাকে হত্যা করার জন্য পরিকল্পনা করেছিল। ওদের ঘুরাফিরা দেখে সন্দেহ হলে আমার লোকজন তাদেরকে ঘেরাও করে। অনেকে পালিয়ে গেলেও একজন ধরা পড়েছিল। সে ছিল তাদের গাইডার, তার কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। পরে সে স্বীকার করেছে, তারা তাকে গাইডের জন্য এনেছে; আমাকে হত্যার জন্য তাকে নিয়োগ করা হয়েছিল।
লবাঃ ছাত্রলীগের সাথে আপনার স্মৃতিময় কোনো ঘটনা মনে পড়ে কী? স্মরণীয় কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা জানতে চাই।
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাকর ও মূল্যবান সময়তো ছাত্রলীগের সাথেই কাটিয়েছি। ফলে অনেক স্মৃতিই রয়েছে। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করা হলো। ’২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে পল্টন ময়দানে বিশিষ্ট রাজনীতিকদের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। রেসকোর্সের সংবর্ধনায় (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের) জনতার ঢল নামে। বক্তৃতা পর্বের শেষে উপস্থিত ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে বাংলার নন্দিত নায়ক সবার প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান “বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। সেই সংবর্ধনা সভায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এর পক্ষ থেকে আমি বক্তৃতা করেছিলাম। এছাড়া বক্তৃতা করেছিলেন তোফায়েল আহমেদ, সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, মতিয়া) মাহবুব উল্লাহ (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, মেনন), মাহবুবুল হক দোলন (এনএসএফ)।
ঢাকার যে সাতজন ছাত্রনেতা এক যুক্ত বিবৃতিতে শিক্ষাগত দাবি-দাওয়া আদায়কল্পে আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ছাত্রসমাজের প্রতি এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য গণতান্ত্রিক বিরোধী দলগুলির প্রতি আহ্বান জানান, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি তাদের সাথে ছিলাম। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছিল যে- সরকার ছাত্র নির্যাতন, গুন্ডামি, শিক্ষায়তনে পুলিশ মোতায়েন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা প্রভৃতির মাধ্যমে ছাত্র সমাজের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধ্বংস করতে চাইছে। কিন্তু সংগ্রামী ছাত্রসমাজ নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না।
১১ দফা দাবি আদায়ের সুনিশ্চিত ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত গণ সংগ্রাম ক্ষ্যান্ত হবে না বলে সংগ্রামী ছাত্র সমাজ রক্ত শপথ নেয়। স্বৈরচারী সরকারের শাসন-শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে ছাত্রজনতা আন্দোলনের পথে এগিয়ে এসেছিলেন।
লবাঃ ছাত্রদের সেই প্রাণের দাবি ১১ দফায় কী ছিল?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগারো দফা দাবির মধ্যে আওয়ামী লীগের ছয়দফা দাবির ব্যাপক প্রতিফলন ঘটেছিল। এগারো দফায় বাঙালি মধ্যবিত্ত কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট দাবিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ফলে এগারো দফার আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তনে ব্যাপক গণসমর্থন লাভ করে এবং আইউব বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব কার্যত চলে আসে ছাত্র-নেতৃবৃন্দের হাতে। ছাত্র আন্দোলন ১৯৬৮ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয় এবং ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে তুঙ্গে ওঠে এবং মধ্য জানুয়ারিতে গণআন্দোলনের রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনায় ছাত্র সমাজের এগারো দফা আন্দোলন প্রত্যক্ষ অবদান রাখে। ছাত্রদের ১১ দফা দাবি ছিল নিম্নরূপঃ
১। ক) সচ্ছল কলেজসমূহকে প্রাদেশিকীকরণের নীতি পরিত্যাগ করিতে হইবে এবং জগন্নাথ কলেজসহ প্রাদেশিকীকরণকৃত কলেজসমূহকে পূর্বাবস্থায় ফিরাইয়া দিতে হইবে।
খ) শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের জন্য প্রদেশের সর্বত্র বিশেষ করিয়া গ্রামাঞ্চলে স্কুল-কলেজ স্থাপন করিতে হইবে এবং বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত স্কুল-কলেজসমূহকে সত্বর অনুমোদন দিতে হইবে। কারিগরি শিক্ষা প্রসারের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পলিটেকনিক, টেকনিক্যাল ও কমার্সিয়াল ইনস্টিটিউট স্থাপন করিতে হইবে।
গ) প্রদেশের কলেজসমূহে দ্বিতীয় শিফটে নৈশ আইএ; আইএসসি; আইকম ও বিএ; বিএসসি; বিকম; এবং প্রতিষ্ঠিত কলেজসমূহে নৈশ এমএ ও এমকম ক্লাস চালু করিতে হইবে।
ঘ) ছাত্র বেতন শতকরা ৫০ ভাগ হ্রাস করিতে হইবে। স্কলারশিপ ও স্টাইপেন্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে হইবে এবং ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার অপরাধে স্কলারশিপ ও স্টাইপেন্ড কাড়িয়া লওয়া চলিবে না।
ঙ) হল, হোস্টেলের ডাইনিং হল ও কেন্টিন খরচার শতকরা ৫০ ভাগ সরকার কর্তৃক ‘সাবসিডি’ হিসাবে প্রদান করিতে হইবে।
চ) হল ও হোস্টেল সমস্যার সমাধান করিতে হইবে।
ছ) মাতৃভাষার মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে হইবে। অফিস আদালতে বাংলা ভাষা চালু করিতে হইবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক অভিজ্ঞ শিক্ষকের ব্যবস্থা করিতে হইবে। শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি করিতে হইবে এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার দিতে হইবে।
জ) অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করিতে হইবে।
ঝ) মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করিতে হইবে এবং অটোমেশন প্রথা বিলোপ, নমিনেশনে ভর্তি প্রথা বন্ধ, মেডিকেল কাউন্সিল অর্ডিনেন্স বাতিল, ডেন্টাল কলেজকে পূর্ণাঙ্গ কলেজে পরিণত করা প্রভৃতি মেডিকেল ছাত্রদের দাবি মানিয়া লইতে হইবে। নার্স ছাত্রীদের সকল দাবি মানিয়া লইতে হইবে।
ঞ) প্রকৌশল শিক্ষায় অটোমেশন প্রথা বিলোপ, ১০% ও ৭৫% রুল বাতিল, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সুব্যবস্থা, প্রকৌশল ছাত্রদের শেষবর্ষেও ক্লাস দেওয়ার ব্যবস্থাসহ সকল দাবি মানিয়া লইতে হইবে।
ট) পলিটেকনিক ছাত্রদের ‘কনডেন্সড কোর্সের’ সুযোগ দিতে হইবে এবং বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষা বাতিল করিয়া একমাত্র সিমেস্টার পরীক্ষার ভিত্তিতেই ডিপ্লোমা দিতে হইবে।
ঠ) টেক্সটাইল, সিরামিক, লেদার টেকনোলজি এবং আর্ট কলেজ ছাত্রদের সকল দাবি অবিলম্বে মানিয়া লইতে হইবে। আইইআর ছাত্রদের দশ-দফা; সমাজ কল্যাণ কলেজ ছাত্রদের, এমবিএ ছাত্রদের ও আইনের ছাত্রদের সমস্ত দাবি মানিয়া লইতে হইবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিভাগকে আলাদা ‘ফ্যাকাল্টি’ করিতে হইবে।
ড) কৃষি বিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্রদের ন্যায্য দাবি মানিয়া লইতে হইবে। কৃষি ডিপ্লোমা ছাত্রদের কনডেন্সড কোর্সের দাবিসহ কৃষি ছাত্রদের সকল দাবি মানিয়া লইতে হইবে।
ঢ) ট্রেনে, স্টিমারে ও লঞ্চে ছাত্রদের আইডেন্টিটি কার্ড দেখাইয়া শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ‘কন্সেসনে’ টিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মাসিক টিকিটেও ‘কন্সেশন’ দিতে হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানের মতো বাসে ১০ পয়সা ভাড়ায় শহরের যে কোনো স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করিতে হইবে। দূরবর্তী অঞ্চলে বাস যাতায়াতেও শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেসন’ দিতে হইবে। ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সরকারি ও আধাসরকারি উদ্যোগে আয়োজিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্রদের শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেশন’ দিতে হইবে।
ণ) চাকরির নিশ্চয়তা বিধান করিতে হইবে।
ত) কুখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স সম্পূর্ণ বাতিল করিতে হইবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হইবে।
থ) শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষা সংকোচন নীতির প্রামাণ্য দলিল জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ও হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট সম্পূর্ণ বাতিল করিতে এবং ছাত্রসমাজ ও দেশবাসীর স্বার্থে গণমুখী ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করিতে হইবে।
২। প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হইবে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিতে হইবে।
৩। নিম্নলিখিত দাবিসমূহ মানিয়া লইবার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হইবেঃ
ক) দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো হইবে ফেডারেশন শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্রসংঘ এবং আইন পরিষদের ক্ষমতা হইবে সার্বভৌম।
খ) ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা এই কয়টি বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকিবে। অপরাপর সকল বিষয়ে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা হইবে নিরঙ্কুশ।
গ) দুই অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকিবে। এই ব্যবস্থায় মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকিবে। কিন্তু এই অবস্থায় শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকিতে হইবে যে, যাহাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হইতে না পারে। এই বিধানে পাকিস্তানে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে। দুই অঞ্চলে দুইটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক অর্থনীতি প্রবর্তন করিতে হইবে।
ঘ) সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা, কর ধার্য ও আদায়ের সকল ক্ষমতা থাকিবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। ফেডারেল সরকারের কোনো কর ধার্য করিবার ক্ষমতা থাকিবে না। আঞ্চলিক সরকারের আদায়ী রেভিনিউর নির্ধারিত অংশ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে জমা হইবে। এই মর্মে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের উপর বাধ্যতামূলক বিধান শাসনতন্ত্রে থাকিবে।
ঙ) ফেডারেশনের প্রতিটি রাষ্ট্র বহিঃবাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করিবে এবং বহিঃবাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত মুদ্রা অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির এখতিয়ারাধীন থাকিবে। ফেডারেল সরকারের প্রয়োজনীয় বিদেশি মুদ্রা অঙ্গ রাষ্ট্রগুলি সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রের নির্ধারিত ধারা অনুযায়ী প্রদান করিবে। দেশজ দ্রব্যাদি বিনা শুল্কে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আমদানি-রপ্তানি চলিবে। এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে বিদেশি রাষ্ট্রগুলির সাথে চুক্তি সম্পাদনের, বিদেশে ট্রেড মিশন স্থাপনের এবং আমদানি-রপ্তানি করিবার অধিকার অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির হাতে ন্যস্ত করিয়া শাসনতন্ত্রে বিধান করিতে হইবে।
চ) পূর্ব পাকিস্তানকে মিলিশিয়া বা প্যারা মিলিটারী রক্ষী বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হইবে। পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র কারখানা নির্মাণ ও নৌবাহিনীর সদর দফতর স্থাপন করিতে হইবে।
৪। পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধুসহ সকল প্রদেশের স্বায়ত্তশাসন প্রদান করতঃ সাব-ফেডারেশন গঠন করিতে হইবে।
৫। ব্যাংক-বীমা, পাট ব্যবসা ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করিতে হইবে।
৬। কৃষকের উপর হইতে খাজনা ও ট্যাক্সের হার হ্রাস করিতে হইবে এবং বকেয়া খাজনা ও ঋণ মওকুফ করিতে হইবে। সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল ও তহশিলদারদের অত্যাচার বন্ধ করিতে হইবে। পাটের সর্বনিম্ন মূল্য মণ প্রতি ৪০ টাকা নির্ধারণ এবং আখের ন্যায্য মূল্য দিতে হইবে।
৭। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বোনাস দিতে হইবে এবং শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থা করিতে হইবে। শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী কালাকানুন প্রত্যাহার করিতে হইবে এবং ধর্মঘটের অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান করিতে হইবে।
৮। পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জল সম্পদের সার্বিক ব্যবহারের ব্যবস্থা করিতে হইবে।
৯। জরুরি আইন প্রত্যাহার, নিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য নিবর্তনমূলক আইন প্রত্যাহার করিতে হইবে।
১০। সিয়াটো, সেন্টো, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল করিয়া জোট বহির্ভূত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি কায়েম করিতে হইবে।
১১। দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক সকল ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, রাজনৈতিক কর্মী ও নেতৃবৃন্দের অবিলম্বে মুক্তি, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া প্রত্যাহার এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ সকল রাজনৈতিক কারণে রুজুকৃত মামলা প্রত্যাহার করিতে হইবে।
লবাঃ ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনকে সফল করতে আপনারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ ছাত্র সমাজের ১১ দফা দাবি আদায়ে কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
১। প্রদেশের সকল জেলায়, মহকুমায়, থানায়, প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, মহল্লায় এবং শ্রমিক অঞ্চলে সর্বদলীয় ছাত্র সমাজের উদ্যোগে সংগ্রাম কমিটি গড়িয়া তুলুন। এই সকল কমিটি হইতে আন্দোলনকে সুশৃঙ্খল ও সংগঠিতভাবে পরিচালনা করুন। স্থানীয় কমিটিগুলি উপরের কমিটির সহিত যোগাযোগ করুন।
২। আন্দোলনের কর্মপন্থা ঘোষণার জন্য এই সকল কমিটি হইতে প্রচারপত্র, প্রাচীরপত্র, পথসভা, মাইক ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার করুন।
৩। সকল জনগণকে সংগঠিত করুন।
৪। গ্রাম অঞ্চলে গণঅভ্যুত্থানকে ছড়াইয়া দিন।
৫। সর্বত্র হাজার হাজার সুশৃঙ্খল স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করুন।
৬। সংগ্রামকে সফল করার জন্য ছাত্র-শ্রমিক স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে আগাইয়া আসুন।
৭। সকল সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। সকল প্রকার সরকারি উস্কানির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখুন।
৮। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখিয়া ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে সাহায্য করুন।
৯। সকল সময় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশাবলি বিনাপ্রশ্নে মানিয়া চলুন।
দেশবাসীর নিকট আমাদের আহ্বান ছিল-
১। গুলিবর্ষণ, বেয়নেট চার্জ ও লাঠির আঘাতে আহতদের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে রক্ত দান করুন। সান্ধ্য আইনের বিরতির মাঝে সম্ভবমত রক্ত দান করুন। সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবার পরিজনকে সাহায্যার্থে এগিয়ে আসুন। এবং নিম্ন ঠিকানায় সম্ভবমতো অর্থ প্রেরণ করুন। তোফায়েল আহমেদ, ৩১৩, ইকবাল হল, ঢাকা।
২। রিক্সা চালক, ক্ষুদে মজুর এবং দরিদ্র জনসাধারণকে বেশি করিয়া ভাড়া ও মজুরি দিন ও যথাসাধ্য সাহায্য করুন। রিক্সা মালিকদের নিকট আমাদের আবেদন তারা যেন পুরোদিনের ভাড়া গ্রহণ না করেন।
৩। দোকানদার ও ব্যবসায়ী ভাইয়েরা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অতিরিক্ত মূল্য গ্রহণ না করিয়া ন্যায্য মূল্য গ্রহণ করুন।
৪। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে অগ্রসর করুন। যে কোনো প্রকার সরকারি উস্কানির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখুন এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।
লবাঃ আপনি যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, সেই স্বপ্ন ও আশা কী পূরণ হয়েছে?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, সে স্বপ্ন আজও পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন- ‘স্বাধীনতা লাভ করা যেমন কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করাও তেমনি কঠিন। আজ আমাদের অস্ত্রের সংগ্রাম শেষ হয়েছে। এবার স্বাধীনতার সংগ্রামকে দেশ গড়ার সংগ্রামে রূপান্তরিত করতে হবে। মুক্তির সংগ্রামের চেয়েও দেশ গড়ার সংগ্রাম কঠিন। তাই দেশ গড়ার কাজে আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত দূরদর্শী নেতা ছিলেন এবং খুব বাস্তবসম্মত কথা বলেছিলেন। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা এখনো হয়নি, তবে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে। এক সমুদ্র রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে সুখী সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব পালনে তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তৎকালীন প্রত্যাশা ও বর্তমান প্রাপ্তির মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন কমে আসছে।
লবাঃ আপনি বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখেছেন; নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলবেন কী?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অসহায় বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু এক ও অবিভাজ্য। এর চেয়ে সত্য আর কিছু হয় না। বঙ্গবন্ধু আমার ভালোলাগা এক মানুষ। তাঁকে ভালোবাসি, ভালোবাসি তাঁর কর্মকে। তাঁর উদার মন, সৃষ্টিশীলতা, সৌন্দর্যবোধ ও ক্ষিপ্রতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি এগিয়ে চলার শক্তি পাই। জাতির উন্নয়ন চাইলে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাইলে, দেশপ্রেমী ও মানবিকতা সম্পন্ন মানুষ চাইলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনার কোনো বিকল্প নেই ।
আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর অবদান রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর মুক্তিপাগল তরুণদের প্রাণে আলোড়ন তুলেছিল। তিনি ছিলেন বিদ্রোহী, তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সমস্ত অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে। তিনি জানতেন পূর্ব পাকিস্তানকে দানবমুক্ত করার জন্য সুসংগঠিত শক্তির প্রয়োজন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর সবচয়ে বড় ভূমিকা ছিল। তিনি তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের অন্তরে বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর প্রতিটি বক্তৃতায় বিদ্রোহের অগ্নিশিখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দেশের জন্য, মানুষের জন্য তিনি অসংখ্যবার জেল খেটেছেন। দেশকে মুক্ত করতে, অত্যাচারকে উৎখাত করতে তার যুগান্তকারী ভূমিকাকে জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
তিনি সাধারণ মানুষকে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক ও শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শরিক হতে উৎসাহিত করেছিলেন, জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সামাজিক অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন লড়াই-বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার জন্য দেশের মানুষকে ভীরুতা ও কাপুরুষতা ত্যাগ করে, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, দুঃশাসনকে চ্যালেঞ্জ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। খোলাখুলিভাবে তিনি দেশবাসীকে স্বাধীনতার জন্য অস্ত্রধারণ করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তিনি নিপীড়িত সাধারণ মানুষের প্রগতি চেয়েছেন, পিছিয়ে পড়াদের জাগাতে চেয়েছেন, চেয়েছেন বিদেশি শাসকদের হটিয়ে দিয়ে দেশের মানুষের স্বাধীনতার ঝান্ডাকে উড্ডীন করতে। তিনি ছিলেন সকল সংগ্রামে, তিনি ছিলেন সকল সংগ্রামীর অন্তরে, তিনি প্রতিনিধি অত্যাচারিতের এবং দুর্বলের, তাঁর প্রাণে ছিল তারুণ্যের উল্লাস ও উচ্ছ্বাস। তাঁর জীবন সংগ্রাম আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে সংগ্রামী জাতিগঠনে। জীবনের জন্য বাতাস, পানি ও খাদ্য যেমনি অপরিহার্য, তেমনি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য শেখ মুজিব।
লবাঃ ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ ’৬৯ এর ছাত্রনেতাদের গণঅভ্যুত্থান না হলে দেশ স্বাধীন হতো কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অথচ ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীরা অবহেলিত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যারা স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছিলেন, আজ তাদের অনেকেই অবহেলিত। যারা বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বানিয়ে বাজাতে চেয়েছিলেন, আজ তারাই মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। যারা ছাত্রলীগকে সঙ্কীর্ণ বলতেন, তারাই আজ আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তি।
১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পুরোভাগে ছিলেন এ দেশের ছাত্রনেতারা। গণঅভ্যুত্থানের সূচনাকালে ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকা শহরের প্রত্যেকটি মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। তারা আগরতলা মামলার সাক্ষীদের খোঁজা শুরু করেন, তাদের বাড়িতে আক্রমণ করেন। আগরতলা মামলার বিচারক এসএম রহমানের বাড়িতে আক্রমণ হয়। তখন তিনি লুঙ্গি পরে পালিয়ে যান। এই দিনেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের পতনের বীজ রোপিত হয়েছিল। ১৮ জানুয়ারি সেøাগান দেয়া হয়- মুজিব তোমায় মুক্ত করব। শেখ মুজিবের মুক্তি চাই আইয়ুব খানের পতন চাই। শপথ নিলাম শপথ নিলাম, মুজিব তোমায় মুক্ত করব, মাগো তোমায় মুক্ত করব।
১৯ তারিখ মিছিলে আসাদুল নামে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র গুলিবিদ্ধ হলেন। একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। ২০ জানুয়ারি আসাদ নিহত হলে তাঁর রক্তমাখা শার্ট দিয়ে পতাকা বানিয়ে মিছিল করা হয়েছিল। সেদিন কলাভবনের ছাদের উপরে মিটিং হয়েছিল। মিছিল বের হলে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল আসাদুজ্জামান। তাঁকে আমি আর তোফায়েল আহমেদ কোলে করে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সির দিকে নিতে নিতে আমাদের হাতেই তিনি শহীদ হলেন। তাঁর গায়ের রক্তাক্ত জামা খুলে পতাকা বানিয়ে মিছিল করেছিলাম। সেদিন আমরা শপথ নিয়েছিলাম, এ রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেব না। আমাদের প্রতিহত করার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। আমরা তা উপেক্ষা করে মিছিল নিয়ে বেরিয়েছিলাম।
লবাঃ মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানি হিসেবে দেশের বর্তমান উন্নতি ও অগ্রগতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে এখনো প্রবৃদ্ধির সুফল সকল মানুষের কাছে পৌঁছেনি, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। অথচ নতুন প্রজন্ম চায় দেশের প্রত্যেক মানুষ কর্মক্ষম ও সুস্থ জীবন পরিচালনার জন্য চাহিদা ও পছন্দানুযায়ী যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, মৌল মানবিক চাহিদাগুলো পূরণ করা।
দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন, সংগ্রাম ও নানা ঘটনার সূত্র ধরে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আমাদের বিজয় অর্জিত হয়। এ দীর্ঘ সময়ে বহু লোক বিভিন্ন অবদান রেখেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়ে স্বার্থের নেশায় অন্ধ হয়ে আমরা অনেককেই ভুলে গেছি। অনেককে তার অবদানের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের প্রশাসন মারাত্মক দু’টি বিষক্রিয়ার শিকার হয়েছে। একটি হচ্ছে দলীয়করণ, অন্যটি আত্মীয়করণ। যোগ্যতার মূল্যায়ন না করেই শুধুমাত্র মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে চাকরি বঞ্চিত, ওএসডি করা হয় এবং মতাদর্শের ভিত্তিতে পদোন্নতি হয়। নির্লজ্জ দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের কাছে যোগ্যতা ও মেধা হয় মূল্যহীন। ফলে মেধাহীন, দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য ও দলীয় কর্মী প্রশাসনে সুযোগ পায় এবং প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি কূটনীতিকদের নগ্ন হস্তক্ষপে নতুন শঙ্কার সৃষ্টি করছে। নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কথা আমরা ভুলে গেছি। যার ফলে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের জন্ম হয়েছে। আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারিনি; প্রাকৃতিক সম্পদেরও উত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারিনি। সংকীর্ণ ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আমরা বিচার বিভাগকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছি। বহুদলীয় গণতন্ত্রকে একটি সুখী, নির্ভেদ এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি পরিপূর্ণ, স্বনির্ভর এবং প্রগতিশীল সমাজে রূপ দেয়া সম্ভবপর হয়নি। বাক স্বাধীনতা অনেকাংশে খর্ব এবং সাধারণ মানুষ বৃহৎ অর্থে অধিকারবঞ্চিত। এমতাবস্থায় আমরা চাই সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমী নাগরিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।
লবাঃ লক্ষ্মীপুর জেলা নিয়ে কিছু বলবেন?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ ১৯৭২ সালে লক্ষ্মীপুর মহকুমা লক্ষ্মীপুর জেলায় পরিণত হয়েছে। আমাদের প্রিয় লক্ষ্মীপুর এক সময় ছিল সন্ত্রাসের জনপদ। এখন একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে লক্ষ্মীপুর জেলা তার গুরুত্ব প্রমাণ করতে পেরেছে। আমাদের সবাইকে লক্ষ্মীপুরের ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে। লক্ষ্মীপুরকে পরিণত করতে হবে শান্তির অভয়ারণ্যে। সরকার বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণমূলক কাজ করছেন, যাতে দলমত নির্বিশেষে আমাদের সহযোগিতা করা উচিত। এসব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে।
লবাঃ নবীন ও তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
খালেদ মোহাম্মদ আলীঃ স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং জাতি গঠনের মহান অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের প্রজন্ম দেশ স্বাধীন করেছে। এখন এদেশকে মনের মতো করে গড়ে তুলতে তরুণ সমাজই আমাদের আশা-ভরসার স্থল। তাই তাদেরকে দেশগড়ার আহ্বান জানাচ্ছি। নবীন প্রজন্মকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে, স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে, আমাদেরকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ গৌরব ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। যুদ্ধে আমাদের ক্ষতি হয়েছে অনেক, হারিয়েছি ত্রিশ লাখ তাজা গোলাপ, ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত। তবে যুদ্ধের অনেক ক্ষতির সঙ্গে আমাদের চেতনাও হয়েছে ক্ষুরধার। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের লক্ষ্য নিরূপণে সহায়তা করেছে, দিয়েছে সঠিক উদ্দেশ্যের সন্ধান। তাই মুক্তিযুদ্ধকে না জানলে কোনো জানাই পরিপূর্ণ হবে না।