Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকারে
উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর জেলার পাঁচ উপজেলার নির্বাহী অফিসারগণ (ইউএনও) এর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় মিলিত হন লক্ষ্মীপুর বার্তা পত্রিকার প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর হোসেন লিটন। আলাপচারিতার মধ্যদিয়ে উঠে আসে উপজেলার দায়িত্বগ্রহণে তাঁদের অনুভূতির কথা, উপজেলার মূল সমস্যা এবং তার সমাধানের উপায়; উন্নয়ন সম্ভাবনার কথাও আলোচিত হয়। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয় প্রশাসনিক কাজকর্মে তাঁরা কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা, সুশীল সমাজ ও জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে কীরকম সহযোগিতা পাচ্ছেন।

আলোচনা প্রসঙ্গে উপজেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কেও তাঁদের মতামত চাওয়া হয়। তাঁদের আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ লক্ষ্মীপুর বার্তার সহকারী সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তফার অনুলিখনে এখানে সন্নিবেশিত হলো।

 

সদর উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে জনসেবার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি

-মোহাম্মদ আজিজুর রহমান

নির্বাহী অফিসার, সদর উপজেলা, লক্ষ্মীপুর


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে তরুণ-উদ্যমী প্রশাসক আজিজুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বলাভ করে আমি আনন্দিত। জনগণের সেবায় লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগলাভ করে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। সদর উপজেলার গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিক, শিক্ষক, সমাজকর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহযোগিতা নিয়ে আমি স্বচ্ছন্দে এ উপজেলা প্রশাসনের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছি।

আপনার উপজেলায় স্থাপিত তথ্য সেবাকেন্দ্র মানুষের কতটুকু উপকারে আসছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তারুণ্যদীপ্ত উপজেলা প্রশাসক আজিজুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন এবং ভিশন ২০২১ ঘোষণা করে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য স্থির করেছেন। ইতোমধ্যে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। আমরা এ কেন্দ্রের মাধ্যমে তথ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গুরুত্বসহকারে কাজ করছি। ফলে অত্যন্ত স্বল্প সময় ও সুলভ মূল্যে জনগণ এ কেন্দ্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। যেমন বিদেশে স্বজনের সাথে কথা বলা, ই-মেইল পাঠানো ও পর্যালোচনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম ডাউনলোড ও প্রেরণ, অনলাইনে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা ইত্যাদি। এ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রমে লক্ষ্মীপুর জেলা শ্রেষ্ঠ জেলার সম্মানলাভ করেছে; তথ্যমন্ত্রীর হাত থেকে জেলা প্রশাসক সম্মাননা পুরস্কার গ্রহণ করেছেন যা সবাইকে উদ্দীপিত ও গৌরবান্বিত করেছে।

কৃষি উন্নয়নে এলাকায় কি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে উন্নয়ন-প্রত্যাশী প্রশাসক আজিজুর রহমান বলেন, লক্ষ্মীপুর উর্বরাজমির এলাকা, এখানে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষি উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছেন কৃষিবিদ কর্মকর্তা। যারা কৃষকদের  বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাছাড়া তথ্যসেবা কেন্দ্রের অনলাইনের মাধ্যমে কৃষকরা প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় অবগত হয়ে উপকৃত হচ্ছেন। মৎস্য চাষী, ডেইরি ফার্ম, পোল্টি ফার্মের মালিক-কর্মচারীরাও মূল্যবান তথ্য-উপাত্ত পেয়ে প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাচ্ছেন। সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে রোগের চিকিৎসায় পরামর্শ লাভের সুযোগও রয়েছে। আমাদের সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে টেলি মেডিসিন চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ইতোমধ্যে আমরা ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছি। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে তথ্যসেবা কেন্দ্রের সেবাকার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

ডিজিটাল সেন্টার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট উল্লেখ্য করে উদ্যমী প্রশাসক আজিজুর রহমান বলেন, প্রথমে আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়ার জন্য এ সেন্টারগুলো প্রতিষ্ঠা করি। বর্তমানে জনগণের মাঝে সামান্য ফির মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সব সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। আর এ সেন্টারের মাধ্যমে যে আয় হচ্ছে, তা কর্মীদের বেতন ভাতায় ব্যয় হচ্ছে। তাদের নির্ধারিত কোনো-বেতন নেই। তাদের সাথে সেন্টার পরিচালনার যে চুক্তি হয়েছে তা তিন বছর অন্তর নবায়ন হয়ে থাকে। আমার বিশ্বাস ৩/৪ বছর পর তাদের বেতন-ভাতা রাজস্ব খাতে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন আমার বিশ্বাস, মানুষ উপজেলার সুবিধা ইউনিয়ন অফিসে পেলে তারা উপরের অফিসে যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করবে না।

উপজেলা প্রশাসনে আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি এমন প্রশ্নে প্রাণোচ্ছল ব্যক্তিত্ব আজিজুর রহমান বলেন, আমি  প্রকৃতই  একজন  ভাগ্যবান মানুষ। আমি উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কাউন্সিলরদের নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি। ফলে কোনোদিক থেকে বাধা-প্রতিবন্ধকতা আসছে না। বড় কথা হলো এতে উপজেলা চেয়ারম্যান বা ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হচ্ছে না। কারণ আমরা এক পরিবারের সদস্য হিসেবে কাজ করছি; আর আমাদের সবার লক্ষ্য হলো এলাকার উন্নয়ন, জনগণের কল্যাণ, শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি।

উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে পরিচ্ছন্ন চিন্তার অধিকারী ইউএনও আজিজুর রহমান বলেন, জাতীয়ভাবে আমরা খাদ্য বা কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ; বস্ত্রেও এগিয়েছি, এখন স্বাস্থ্য ও শিক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। শিক্ষা মানে সুশিক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা। এটি নিশ্চিত করতে আমাদের স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার দিকে মনোযোগী হতে হয়েছে। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর দিয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষাবিষয়কে হাতের কাছে পাচ্ছে, সবাই মিলে বসে দেখার সুযোগ হচ্ছে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে শিক্ষাদান সম্ভব হলে এর ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী। সমস্যা হচ্ছে বিদ্যমান শিক্ষকদেরকে নিয়ে। তারা পুরোনো ধ্যানধারণার অনুসারী, সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসেতে পারছে না। এজন্য আমাদের সিদ্ধান্ত হলো প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান প্রধানকে বিস্তারিতভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া। তারা অধস্তন শিক্ষকদের যারা প্রশিক্ষণে পিছিয়ে আছেন, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন। এ কর্মসূচি সম্পন্ন হলে শিক্ষকরা শতভাগ প্রশিক্ষিত হয়ে উঠবে।

শিক্ষানুরাগী উপজেলা নির্বাহী আজিজুর রহমান আরও বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে নানা সমস্যার মধ্যে একটি হলো প্রাইভেট কোচিং। কর্তৃপক্ষ এটিকে নিষিদ্ধ করলেও এটি নানাভাবে আবির্ভূত হচ্ছে। ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন একসাথে বসে সবাই পাঠগ্রহণ করে কোচিং সেন্টারেও সেরূপ একসাথে গাদাগাদি করে বসে টিচারের সাজেশন নোট করছে। সেখানে সীট মুখস্থ করানো হচ্ছে, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করছে। কিন্তু সিলেবাসের অনেক কিছু বাদ যাচ্ছে, পুরো বই পড়ানো হচ্ছে না, শিক্ষার্থীর জ্ঞান হয়ে পড়ছে সীমিত।

আশাবাদী প্রশাসক আজিজুর রহমান বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদেরকে সিরিয়াস হতে হবে। নকলের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। নকলের ব্যাপকতা কমলেও নকল পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এর জন্য আমাদেরকে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে।

উপজেলা প্রশাসক হিসেবে নিজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা আজিজুর রহমান বলেন আমার প্রথম লক্ষ্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, তৃতীয়ত কৃষিতে ক্যামিকেল ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা।

উদ্যমী সরকারি কর্মকর্তা আজিজুর রহমান আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সমাজে মানুষ ভূমিহীন থাকবে না, গৃহহীন থাকবে না। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। ভূমিহীনদের তালিকা প্রণয়ন করে তাদের জন্য ভূমি বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করছি। আমরা গৃহহীনদের আবাসনের ব্যবস্থা করছি। ভূমিহীন, গৃহহীনদের পুনর্বাসনে একশ কোটি টাকার প্রকল্প আছে। আমরা পরিকল্পিতভাবে কাজ করছি যাতে অল্প সময়ের মধ্যে এদের সমস্যার সমাধান হয়।

তিনি বলেন, আরেকটি কর্মসূচি আমরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি সেটি হলো মানসম্মত উন্নয়ন। ভবন, রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, সেতু ইত্যাদি নির্মাণের সময় সঠিকভাবে উপকরণ ব্যবহার হয় না; কারচুপি হয়, দুর্নীতি হয়। এগুলো রোধ করতে পারলে এসব অবকাঠামা টেকসই হবে, দীর্ঘস্থায়ী হবে। এতে আমাদের অর্থের সাশ্রয় হবে, কোনো অবকাঠামোয় বার বার অর্থ ব্যয় করতে হবে না, জনগণের ভোগান্তি হবে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় বন্ধ হবে।

ইউএনও আজিজুর রহমান বলেন, বর্তমান যুগের প্রশাসন হলো জনগণের প্রশাসন, আমাদের জনমুখী হতে হবে, জনকল্যাণমুখী কর্মকান্ডে নিযুক্ত থাকতে হবে। তাদের কথা শুনতে হবে, সমস্যার সমাধান দিতে হবে, প্রতিকার করতে হবে। এজন্য যে কোনো লোক যেকোনো সমস্যা নিয়ে সরাসরি আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসনের ধারা আমরা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করেছি, আমরা নিজেদেরকে জনগণের সেবক বলে মনে করি।

আপনার উপজেলায় বর্তমানে কি কি সমস্যা আছে, কীভাবে এর সমাধান করা যায় এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কর্মোদ্যমী কর্মকর্তা আজিজুর রহমান বলেন, লক্ষ্মীপুরে কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনী কাজ করছে। দিনের বেলায় থাকে না, রাতে এসে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। উন্নয়ন কর্মকান্ডে এরা বাধা সৃষ্টি করছে, চাঁদা দাবি করছে, চাঁদা না দিলে উন্নয়ন সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে অথবা নষ্ট করে ফেলছে। এজন্য নির্বিঘেœ উন্নয়ন কাজ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। আরেকটি সমস্যা হলো মাদক। আগে দুএক ধরনের মাদকদ্রব্য ছিল, এখন তার সাথে কয়েকটি যোগ হয়েছে। ছাত্র-যুবকদের মাদকের নীল ছোঁয়া আচ্ছন্ন করে ফেলছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। মাদকাসক্ত, ইভটিজিং-সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ এদের খপ্পর থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রবল সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যুব-সমাজকে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিনোদনমূলক কর্মকান্ডে জড়িত করতে পারলে তারা খারাপ চিন্তার অবকাশ পাবে না। লক্ষ্মীপুরে এরই মধ্যে টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে, সামনে আরও কয়েকটি হবে। এসব কর্মসূচিতে বিপুল জনসমাগম দেখে আমরা আশান্বিত হয়েছি যে, আমাদের হতাশ হবার কিছু   নেই, সামনে আমাদের আলোকোজ্জ্বল দিনের হাতছানি। সুশীল সমাজ, জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে সন্ত্রাস আর মাদকের বিরুদ্ধে। সঠিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে সামাজিক অপকর্মের  হোতারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

বৃহত্তর নোয়াখালীর দর্পণ খ্যাত লক্ষ্মীপুর বার্তার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে উপজেলা প্রশাসক আজিজুর রহমান বলেন, এ পত্রিকা এলাকাপ্রেমী, উন্নয়ন সহায়ক, পরিচ্ছন্ন সাংবাদিকতার অনুসারী। লক্ষ্মীপুর বার্তা বৃহত্তর নোয়াখালী বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নে নিবেদিত। এলাকার বিভিন্ন সমস্যা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করে সেগুলোর সমাধানের পরামর্শ দিয়ে এ পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনা এ পত্রিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যার জন্য আমি মনে করি লক্ষ্মীপুর বার্তা আগামীর দিনগুলোতেও নান্দনিক প্রকাশনার স্বাক্ষর অব্যাহত রাখবে। আমি এ পত্রিকার সুদীর্ঘ-সমৃদ্ধ প্রকাশনা কামনা করি।

 

উপজেলার মানুষকে যেকোনো সমস্যার সমাধান দেয়ার জন্য আমার দরজা ২৪ ঘন্টা খোলা রয়েছে

-মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল

নির্বাহী অফিসার, কমলনগর উপজেলা, লক্ষ্মীপুর



নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর অনুভূতির কথা জানতে চাইলে তারুণ্যদীপ্ত প্রশাসক আবদুল আউয়াল বলেন, লক্ষ্মীপুর জেলা বাংলাদেশের একটি আলোকিত জেলা; এখানে অনেক স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ, কৃতী সমাজকর্মী, প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পপতি ও চিন্তাশীল রাজনীতিকের জন্ম হয়েছে। যাঁরা দেশের বিভিন্ন স্তরে জ্ঞান-মেধা-প্রতিভা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এমনি একটি জেলার একটি উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব পেয়ে আমি আনন্দিত এবং আশান্বিত যে জনসেবার যে মানসিকতা এতদিন মাথায় ছিল, তা বাস্তবায়নের সুযোগ লাভ করলাম।

তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুর জেলায় ৫টি উপজেলা; আমরা জেলা প্রশাসকের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলছি, যার ফলে প্রশাসনসহ উন্নয়নমূলক সকল কর্মকান্ডে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে।

আপনার দায়িত্ব গ্রহণের পর উপজেলার জনগণ কতটুকু উপকৃত হচ্ছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে আশাবাদী প্রশাসক আবদুল আউয়াল বলেন, বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়ে কাজ শুরু করেছেন; ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের সারিতে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। সে লক্ষ্যে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন কাউন্সিলের উন্নয়নে আগেই হাত দেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ফলে গ্রামজনপদের মানুষ সহজে, স্বল্পব্যয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যলাভের সুযোগ পাচ্ছে। আগের মতো তাদেরকে মহকুমা বা জেলাশহরে ছোটাছুটি করতে হয় না। কমলনগর একটি উপকূলীয় অঞ্চল। এখানে অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ নজর দিয়েছি। ৯টি ডিজিটাল সেন্টারে বর্তমানে সোলার সিস্টেম চালু হয়েছে; জন্ম নিবন্ধন, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল এখান থেকে দেয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়াও এখান থেকে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন ফরম এখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে। এখানে অনেক মানুষ বিদেশে কর্মরত রয়েছেন, ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে তাদেরকে প্রয়োজনীয় সেবাপ্রদান করা হচ্ছে। বিদেশ গমনে প্রয়োজনীয় সব কাজ এখান থেকে করা হয় বলে আগেকার সব জটিলতার নিরসন হয়েছে। কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য কৃষকরা এখান থেকে পাচ্ছেন, কৃষি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পরামর্শ কাজে লাগিয়ে উপকৃত হচ্ছেন। উপজেলার সব মানুষের জীবন-জীবিকার সব তথ্য-উপাত্ত খুব সহজে যাতে হস্তগত হয়ে ব্যক্তিজীবনে কার্যকর হতে পারে, তার জন্য আমি আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কাজের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক; যেসব কর্মক্ষম যুবক বেকার ছিল, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। কিছু যুবককে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যাতে তারা ঘরে বসে আয় করতে পারে। এরা এরই মধ্যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাকে কোনো বিরোধ বা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তারুণ্যদীপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল বলেন, এধরনের কোনো বিরোধ বা সংঘাতের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমি খুব আস্থার সাথে বলতে পারি যে, আমাদের উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদগুলোর চেয়ারম্যানরা সবাই মিলে একটি সুন্দর প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি যা অন্যদের কাছেও অনুসরণীয় হতে পারে। এখানে কাজের ক্ষেত্রে কোনো মতপার্থক্য নেই, সবাই একমনে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে সরকারের বিভিন্ন কমিটি আছে, সবাইকে নিয়ে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিই এবং তা উপজেলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর করি। কোনো সমস্যার উদ্ভব হলে আমরা মিটিং করে দ্রুত জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত আসার সাথে সাথে তা দ্রুত কার্যকর করার ব্যবস্থা করি। উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে আমি এটুকু বলতে পারি যে, উপজেলাবাসীর সেবার জন্য আমার দরজা ২৪ ঘন্টা খোলা রয়েছে।

উপজেলার সার্বিক উন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে জিজ্ঞাসার জবাবে নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল বলেন, আমরা সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় প্রেক্ষিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। কমলনগর উপজেলা পরিষদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছি। উপজেলার মূল সমস্যা নদী ভাঙ্গন রোধ করা। এরই মধ্যে ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। আমরা ভাঙ্গন প্রতিরোধে কাজ শুরু করেছি। ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় মানুষকে পুনর্বাসনের কাজ অব্যাহত রয়েছে। আমাদের সম্পদ সীমিত; দেড়শ মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে, ২০০ পরিবারের মাথা গোঁজার জন্য আশ্রয়ণ কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। উপকূলবাসী বিশেষ করে জেলেরা যাদের জীবিকা নদীনির্ভর, তাদের পুনর্বাসন করা হবে। এডিবিসহ অন্যান্য যেসব কর্মসূচি আছে, সেগুলোকে সুসমন্বিত করে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করব যাতে গরিব অধিবাসীদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-আবাসন ইত্যাদি কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়। এগুলো নিয়ে আমাদের একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। আমাদের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি আছে, যেগুলো আমাদের বার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও অন্তর্ভুক্ত হবে।

আপনার উপজেলায় কী কী সমস্যা রয়েছে এবং এগুলো সমাধানে আপনার পরামর্শ কী এমন প্রশ্নের জবাবে আত্মবিশ্বাসী ও উদ্যমী প্রশাসক আবদুল আউয়াল বলেন, কমলনগর উপজেলার এক নম্বর সমস্যা নদী ভাঙ্গন। আমাদের ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে চরকালকিনি, চরফলকন, সাহেবের হাট, পাটোয়ারী হাট ব্যাপক নদীভাঙ্গনের শিকার। চরকালকিনি এবং সাহেবের হাটের বিরাট অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গন রোধের ব্যাপারে সদাশয় সরকার সুদৃষ্টি দিয়েছেন। আশা করি, এ সমস্যার সমাধান অচিরেই হবে। উপকূলীয় এলাকা হওয়ার কারণে অবকাঠামোগত দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি; এখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন ইত্যাদি ব্যাপারে অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে, মানসম্মত শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। উপজেলা হেল্থ  ক্লিনিক,  কমিউনিটি  ক্লিনিকের কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ার কারণে বাঁধ ভেঙ্গে লবণাক্ত পানি ভেতরে প্রবেশ করে জমির উর্বরতাশক্তি নষ্ট করে দিচ্ছে, উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে; এতে উৎপাদক কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এখানে বেশি সংখ্যক ডিপ টিউবওয়েল প্রয়োজন, কারণ এ এলাকার পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেশি। কমলনগর তথা লক্ষ্মীপুর জেলায় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি, এখানে দেশের ৭০/৮০ ভাগ সয়াবিন উৎপাদিত হয়। সয়াবিন ভিত্তিক কারখানা গড়ে ওঠার প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কল-কারখানা গড়ে ওঠেনি। আমরা কমলনগরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নোয়াখালী জেলার সীমানার কাছাকাছি একটি এলাকা চিহ্নিত করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাবনা কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করেছি। এটি সরকারের বিবেচনাধীন আছে। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে এ শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে। এখানে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থার অফিস স্থাপন করা হবে, যুব শ্রেণির প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

তিনি আরও বলেন, মাদক এখানকার একটি বড় সমস্যা। আমরা উপজেলার ইউনিয়নসমূহের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে প্রায়ই আলোচনা বৈঠক করছি যাতে খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে যুব সমাজকে মাদকের ছোবল থেকে বাঁচানো যায়। এখানের সমস্যাগুলো সম্পর্কে নিয়মিত পর্যালোচনা করছি, যাতে এগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়। মেঘনা নদী কমলনগর উপজেলার পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত; এখানে কয়েকটি ঘাট আছে, লক্ষ্মীপুর জেলার সবচেয়ে বড় মাছঘাট মতিরহাট কমলনগরে অবস্থিত। এখানে একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র আছে, এছাড়া আছে লুধুয়া মাছঘাট। কিন্তু কোস্টগার্ডদের কোনো সেন্টার নেই। ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে যে সময়ের জন্য, শুধু সে সময় কোস্টগার্ডরা এখানে সাময়িক ক্যাম্প বসায়। কিন্তু বছরের বাকি সময় নদীপথ অরক্ষিত থাকে, জলদস্যুরা জেলেদের জাল-নৌকা-ট্রলার নিয়ে যায়, জেলেদের নির্যাতন করে তাদের আহরিত মাছও নিয়ে যায়। এখানে কোস্টগার্ড কেন্দ্র অথবা নৌ-পুলিশ অফিস স্থাপন জরুরি। উপজেলার আড়াই লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে ৬০/৭০ হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করে নদীর ওপর।

বৃহত্তর নোয়াখালীর নন্দিত মুখপত্র লক্ষ্মীপুর বার্তার মূল্যায়ন সম্পর্কে কমলনগর উপজেলার তারুণ্যদীপ্ত নির্বাহী অফিসার আবদুল আউয়াল বলেন, আমি এ পত্রিকা আগ্রহ সহকারে পড়ি; লক্ষ্মীপুরসহ বৃহত্তর নোয়াখালীর সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা এ পত্রিকায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। বৃহত্তর নোয়াখালীর কৃতী সন্তানদের পরিচিতি জানা যায় এ পত্রিকার মাধ্যমে। লক্ষ্মীপুর বার্তা এলাকার মাটি ও মানুষের কথা বলে, তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করে। যে ধারায় লক্ষ্মীপুর বার্তা চলছে, আগামীতে তার বক্তব্য আরও শানিত হবে, লক্ষ্যাভিসারী হবে এ কামনা করি।

 

শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য রামগঞ্জে একটি শিক্ষা ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা হবে

-কাজী মাহবুবুল আলম

নির্বাহী অফিসার, রামগঞ্জ উপজেলা, লক্ষ্মীপুর

লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বলাভে তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলে কর্মোদ্যমী সরকারি কর্মকর্তা কাজী মাহবুব আলম বলেন, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর দেশের কয়েকটি স্থানে দায়িত্ব পালন করি। ২০১৩ সালে আমি রামগঞ্জ উপজেলা প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হই। রামগঞ্জ লক্ষ্মীপুর জেলার একটি আলোকিত উপজেলা। দেশের অনেক কৃতী সন্তানের জন্ম এ উপজেলায়। শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক অগ্রসর। এখানকার মানুষ সচেতন, তারা আমার প্রশাসনিক কাজকর্মে সহযোগিতা করে। স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও তারা প্রশাসনিক কাজকর্মে বাধা দেয় না। এজন্য প্রশাসনিক কাজ খুব সচ্ছন্দে করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে। এ উপজেলায় প্রশাসনিক নির্বাহীর দায়িত্বলাভ করে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।

আপনার উপজেলায় স্থাপিত তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণ কতটুকু উপকৃত হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তারুণ্যদীপ্ত উপজেলা প্রশাসক কাজী মাহবুব আলম বলেন, বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ২০১১ সালে সারাদেশে তথ্য সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। অন্যান্য উপজেলার মতো রামগঞ্জ উপজেলায়ও এ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। প্রতিটি ইউনিয়নে তথ্যকেন্দ্র চালু হয়েছে, এর বর্তমান নাম হচ্ছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। এ সেবাকেন্দ্র থেকে মানুষ অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। বিদেশ থেকে কোনো খবর জানা, খবর প্রেরণ, রেমিট্যান্স প্রাপ্তি, ভর্তি ফরম পূরণ, ভর্তি সম্পর্কে তথ্য জানা ও পরীক্ষার ফলাফল জানতে পাচ্ছে। ডিজিটাল সেন্টারে অনলাইনের মাধ্যমে তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে, আগে যা সংগ্রহ করতে তাদেরকে জেলা হেড কোয়াটারে ছোটাছুটি করতে হতো। প্রযুক্তি এবং তথ্যসেবা এখন জনগণের নাগালের মধ্যে এসে গেছে। জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হচ্ছে এ তথ্যসেবা তথা ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে।

উপজেলা প্রশাসনের সাথে উপজেলা পরিষদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে মতপার্থক্য হয় বলে শোনা যায়, আপনার উপজেলায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে কীভাবে তা মোকাবেলা করবেন এমন প্রশ্নে ইউএনও কাজী শামসুল আলম বলেন, উপজেলা প্রশাসক সরকার-নিয়োজিত আর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জনগণের ভোটে নির্বাচিত। দুটোর কাজ দুরকমভাবে করা হলেও মূল লক্ষ্য হলো উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন। আমি উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক দায়িত্বে আছি। উপজেলার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা করি, সমস্যা সমাধানে তার পরামর্শ চাওয়া হয়। তিনি তার আওতায় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সাথে কোনো কোনো সময় পরামর্শ করেন। এভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভালো পরামর্শগুলো উঠে আসে, আমরা তা বাস্তবায়ন করি। কাজেই উপজেলা পরিষদের সাথে উপজেলা প্রশাসনের কোনো বিরোধের সুযোগ নেই। উপজেলায় আমি এ ধরনের কোনো সমস্যা দেখি না। কাজের সমন্বয়ের মাধ্যমে সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সমস্যা যদি দেখা দিয়েই থাকে, তাহলে তার সমাধানের ব্যাপারেও আমরা সচেতন রয়েছি।

উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী এমন প্রশ্নের জবাবে দৃঢ় প্রত্যয়ী সরকারি কর্মকর্তা কাজী মাহবুব আলম বলেন, লক্ষ্মীপুর জেলার মধ্যে রামগঞ্জ একটি অগ্রসর উপজেলা; তবু এখানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কিছু করার সুযোগ রয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা নজর দেব; বিশেষ করে রাস্তা, পুল, কালভার্ট পুনঃনির্মাণ অথবা সংস্কারের কাজ আমাদের চিন্তায় রয়েছে। সহসা আমরা যে কাজটিতে হাত দিতে যাচ্ছি, তা হলো শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন। এখানে একটি শিক্ষা ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে দরিদ্র-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করা হবে। অর্থের অভাবে যেসব ছাত্র-ছাত্রী পড়ালেখা ছেড়ে দেয়, তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় খরচ ফাউন্ডেশন থেকে বহন করা হবে। ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বইপত্র সরবরাহ করা হবে, যাতে মাঝপথে শিক্ষার্থীরা ঝরে না পড়ে। ফাউন্ডেশনের তহবিল গঠনের ক্ষেত্রে আমরা এলাকার সন্তান শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, ধনী, দানশীল, সমাজসেবী ব্যক্তিদের সহযোগিতা নেব। ফান্ডের গঠনমূলক কাজ অব্যাহত থাকবে, ফান্ড সংগ্রহের কাজও সারাবছর চলবে। লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীদের বৃত্তি প্রদান করা হবে। বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান এবং নিয়মিত খেলাধূলার চর্চার সুবিধার্থে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের কথাও আমাদের পরিকল্পনায় আছে।

আপনার উপজেলায় কী কী সমস্যা আছে এবং সেগুলোর সমাধানে আপনার পরামর্শ কী এমন প্রশ্নের জবাবে দূরদর্শী উপজেলা প্রশাসক কাজী মাহবুব আলম বলেন, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও সংস্কার, মাদক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সমস্যা আমাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের অন্যান্য এলাকার চেয়ে রামগঞ্জের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি ভালো। রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য আছে, কর্মসূচিও আলাদা, তবে তারা পরস্পরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না। এটি আমাদের প্রশাসনিক কাজকর্ম সুচারুরূপে সম্পাদনের পক্ষে যেমন সহায়ক, তেমনি উন্নয়ন কর্মকান্ড নির্বিঘেœ সম্পন্ন করাও সম্ভব হচ্ছে। সন্ত্রাস, সামাজিক বিশৃংখলার কারণে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধার সম্মুখীন হয় এদিক থেকে রামগঞ্জ উপজেলাকে ভাগ্যবান বলা যায়।

বৃহত্তর নোয়াখালীর মুখপত্র লক্ষ্মীপুর বার্তার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মাহবুব আলম বলেন, লক্ষ্মীপুর বার্তা এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সরকারের নজরে এনে এর সমাধানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লক্ষ্মীপুর বার্তা বৃহত্তর নোয়াখালী বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নে নিবেদিত। বৃহত্তর নোয়াখালীর কৃতী সন্তানদের জেলাবাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদেরকে অনুকরণীয় করে তুলছে। লক্ষ্মীপুর বার্তা একটি পরিচ্ছন্ন পত্রিকা, আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকা জগতে এর বিশেষ স্থান রয়েছে।

 

উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে আলোচনার    প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেয়ায় উন্নয়নকর্মের বাস্তবায়ন সহজ ও সফল হচ্ছে

-শারমিন আলম

নির্বাহী অফিসার, রায়পুর উপজেলা, লক্ষ্মীপুর

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণে তাঁর অনুভূতির কথা জানতে চাইলে রায়পুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম শারমিন আলম বলেন, নতুন দায়িত্ব লাভে আমি খুব আনন্দ অনুভব করছি, বলা যায় আমার অনুভূতি খুব চমৎকার। আমি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, কাজকর্ম গুছিয়ে নিয়েছি, আমার ওপর আরোপিত দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন করার আশা রাখছি।

ইউএনও হিসেবে আপনার গৃহীত কার্যক্রম জনগণের কতটুকু কল্যাণে আসছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে শারমিন আলম বলেন, আমার এখানে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা যথেষ্ট সফল হয়েছি। আগে এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না, যার জন্য তথ্যসেবা কেন্দ্র জনগণকে প্রয়োজনীয় সার্ভিস দিতে পারছিল না। বর্তমানে সে সমস্যা নেই।

ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপিত হয়েছে, ফলে তথ্যসেবা সত্যিকার অর্থে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে। তথ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে মানুষ দেশে-বিদেশে সহজে যোগাযোগ করতে পারছে, প্রবাসী আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা বলতে পারছে। টাকা-পয়সা আদান-প্রদান, বিদ্যুৎ বিল প্রাপ্তি ও পরিশোধ, রেমিটেন্স প্রাপ্তি, কৃষি উৎপাদন সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য, উচ্চতর শিক্ষার ভর্তি ফরম সংগ্রহসহ আরও নতুন নতুন আইটেম তথ্য সেবাকেন্দ্রে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ মানুষের তথ্যসেবা লাভকে আরও সহজ ও অর্থবহ করবে। বর্তমান পর্যায়েও এলাকার মানুষ উপকৃত হচ্ছে, নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলে এ সেবা জনজীবনে শান্তি ও স্বস্তির ভাব নিয়ে আসবে।

উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো বিরোধ বা সমস্যা হয় কিনা এমন প্রশ্নে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ শারমিন আলম বলেন, প্রশাসন এবং কর্মপরিচালনার ক্ষেত্রে উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে আমাদের কোনো বিরোধ হয় না। দুই প্রশাসনের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত কোনো কোনো সময় কার্যক্ষেত্রে মতপার্থক্য দেখা দেয়। তবে আলোচনার মাধ্যমে সে মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়। মতপার্থক্য মতানক্য নয় বলে এটি কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আমার উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানদের নিয়ে বৈঠক করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কার্যকর করা হয়। এজন্য এ উপজেলায় উন্নয়ন-বান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে। তিনি বলেন, যখন কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয় তখন সমন্বয়ের মাধ্যমে তা নিরসন করা হয়, এটি কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

রায়পুর উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী মিজ শারমিন আলম বলেন, এক বছরের পরিকল্পনায় এলাকার প্রাথমিক স্কুলের উন্নয়নকে প্রাধান্য দেব। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ নজর দেয়া হবে। প্রাথমিক স্কুলের ক্লাসগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের শতভাগ উপস্থিতি যাতে নিশ্চিত করা যায়, ঝরেপড়া রোধ হয় এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হবে। যারা নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে নিঃস্ব ও বাস্তুহারা হচ্ছে তাদের পুনর্বাসনের কাজও আমাকে করতে হবে। এছাড়া এলাকার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণ প্রশাসনের কাছে চায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, যাতে তারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, নির্বিঘেœ তাদের জীবিকা অর্জন করতে পারে। এসব নিয়মিত কাজের বাইরে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে আমি বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার আশা পোষণ করছি।

রায়পুর উপজেলায় বর্তমানে কী কী সমস্যা রয়েছে এবং সেগুলোর সমাধানে আপনার পরামর্শ কী এমন প্রশ্নের জবাবে জনকল্যাণকামী প্রশাসক মিজ শারমিন আলম বলেন, মেঘনা বিধৌত উপজেলা রায়পুর নদীভাঙ্গনের কবলে রয়েছে। এ উপজেলায় রয়েছে বিরাট চরাঞ্চল। কৃষকদের সমস্যা দুই রকম। ভাঙ্গন কবলিতদের পুনর্বাসন, তাদেরকে খাস জমির বন্দোবস্ত দান, আশ্রয়ণ প্রকল্পে তাদেরকে অন্তর্ভুক্তকরণ জরুরি কাজ। অন্যদিকে চর এলাকার কৃষকদের সমস্যা অন্যরকম। তাদেরকে সময়মত বীজ, সার সরবরাহ করতে হবে, ডিপ টিউবওয়েল হলে জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হবে, তারা এর পানি পান করে আর্সেনিকমুক্ত থাকতে পারবে। চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য সহজশর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা দরকার। অন্যদিকে ভূমিদস্যুরা চরের কৃষকদের পাকা ধান কেটে নিয়ে যায়, চরে বসতি স্থাপনের জন্য সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হয়। তা না হলে বসতভিটা ও জমি হারাতে হয়। এসব অত্যাচার থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে চরাঞ্চল অনেক পিছিয়ে আছে। চরাঞ্চলের সব এলাকায় প্রাথমিক স্কুল গড়ে ওঠেনি, এজন্য কৃষকদের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। রায়পুর উপজেলাকে শতভাগ শিক্ষিতের অঞ্চলে পরিণত করতে প্রাইমারি শিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। শিক্ষিত লোক সচেতন লোকও বটে। শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত মানুষ স্বাভাবিকভাবে সচেতন হয়ে কাজ করে। প্রাথমিক শিক্ষা হলো ফাউন্ডেশন, একে মজবুত করাও প্রয়োজনীয় কাজ।

বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রিয় পত্রিকা লক্ষ্মীপুর বাতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে শারমিন আলম বলেন, লক্ষ্মীপুর বার্তা বৃহত্তর নোয়াখালীর মুখপত্র, লক্ষ্মীপুরসহ সমগ্র নোয়াখালীর পরিচয় বহন করে চলেছে। সম্ভাবনাময়ী জেলা লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নে নিবেদিত। বিভিন্ন অর্থকরী ফসল উৎপাদনে লক্ষ্মীপুরের সদর, রায়পুর, রামগতি প্রভৃতি উপজেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সয়াবিন উৎপাদনে দেশের শ্রেষ্ঠ জেলা। নারিকেল-সুপারি পান, বিভিন্ন রবিশস্য উৎপাদনেও রেকর্ড স্থাপন করেছে লক্ষ্মীপুর। নোয়াখালী দর্পণ খ্যাত লক্ষ্মীপুর বার্তা বৃহত্তর নোয়াখালীর কৃতী সন্তানদের পরিচিতি তুলে ধরে জেলার গৌরব বৃদ্ধি করে চলেছে। তথ্যবহুল, সুখপাঠ্য এ পত্রিকার অব্যাহত প্রকাশনা আমার একান্ত কামনা।

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং বেড়ীবাঁধের ব্যবস্থা করা জরুরি

-মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন

নির্বাহী অফিসার, রামগতি উপজেলা, লক্ষ্মীপুর


নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে অনুভূতির কথা জানতে চাইলে রামগতি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২৪ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে ২৭তম উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে রামগতি উপজেলার দায়িত্বভার গ্রহণ করি। এটি আমার উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রথম পদায়ন। ভাঙ্গন কবলিত মেঘনা নদীর কারণে রামগতি উপজেলার অধিকাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এখানকার অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। এখানকার জনগণের মূল পেশা কৃষি ও মৎস্য। শিক্ষার হার কম, জনসংখ্যার আধিক্য রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাদি বিশেষ করে বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, যৌতুক ইত্যাদি বিষয়ে জনগণ অন্যান্য এলাকার তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম সচেতন। এখানে বিধবা, বয়স্ক ও বিশেষ শ্রেণির জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বর্তমান অবস্থা হতে উত্তরণের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিশেষ করে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনিটরিং এবং নকলমুক্ত পরিবেশে সকল পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠান ইত্যাদি বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তোলার প্রয়াসে গণসংযোগ, মসজিদে প্রতি শুক্রবার বাদ জুম্মা মুসল্লিগণের সাথে সামাজিক বিভিন্ন সমস্যাদি নিয়ে মতবিনিময়, উপজেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত রাখতে দলমত নির্বিশেষে সকল মহলের সাথে নিবিড় সংযোগ স্থাপন, উপজেলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগতমান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি প্রকল্প পরিদর্শন, সকল সরকারি দপ্তরের প্রধানগণের সাথে সমন্নয়সাধন এবং পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে এলাকার সুষম উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পেরে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে ধন্য মনে করছি। বয়স্ক, বিধবা, নদীভাঙ্গা দুর্দশাগ্রস্ত অসহায় বহু মানুষ প্রতিদিন আমার সাথে তাদের সমস্যা নিয়ে সাক্ষাৎ করতে আসে। আমি প্রত্যেকের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি এবং আইনগতভাবে সমাধানের চেষ্টা করি। যেসকল সমস্যার সমাধান আমার এখতিয়ার বহির্ভূত, সেসকল বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করে থাকি। অন্যপেশায় থেকে সাধারণ মানুষের এত কাছাকাছি অবস্থান করে সেবা করার সুযোগ হয়ত পেতাম না। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের কাছাকাছি থেকে এমনকি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত এবং এই সুযোগ পেয়ে মহান আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করছি।

আপনার দায়িত্ব গ্রহণের পর উপজেলার জনগণ কতটুকু উপকৃত হচ্ছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর অফিস থেকে এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এর প্রশাসক ও নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিস হেলেন ক্লার্ক ভোলা জেলার চর কুকরিমুকরি ইউনিয়ন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারাদেশের সকল ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র (ইউআইএসসি) একযোগে উদ্বোধন করেন। এ সকল কেন্দ্র থেকে মাসে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ তথ্য ও সেবা গ্রহণ করছে। ইউআইএসসির মাধ্যমে সহজে, দ্রুত ও কম খরচে সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের জীবনমানের ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। জনগণের দোড়গোড়ায় সেবা (ঝবৎারপব ধঃ উড়ড়ৎংঃবঢ়ং) এ সেøাগানকে সামনে রেখে ইউআইএসসির যাত্রা শুরু হয়। ইউআইএসসি প্রতিষ্ঠার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি অবাধ তথ্যপ্রবাহ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে মানুষকে আর সেবার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে না; বরং সেবাই পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়। অবাধ তথ্যপ্রবাহ জনগণের ক্ষমতায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। দেশের ৪,৫০১টি ইউনিয়ন পরিষদে তথ্য ও সেবাকেন্দ্র স্থাপনের ফলে গ্রামীণ জনগণের অবাধ তথ্যপ্রবাহে অংশগ্রহণসহ দ্রুততম সময়ে তথ্য ও সেবা পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। বর্তমানে ইউআইএসসির নাম পরিবর্তন করে ইউডিসি অর্থাৎ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার নামে নামকরণ করা হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাকে কোনো বিরোধ বা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তারুণ্যদীপ্ত প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেন, অনেক উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যানদের সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের মতপার্থক্য দেখা দেয় মর্মে জানা যায়। তবে রামগতি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল ওয়াহেদ তাদের থেকে ব্যতিক্রম। তিনি একজন শিক্ষিত বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। তিনি আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের আলোকে সকলের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কোনোরূপ মতপার্থক্য নেই। শুধুমাত্র উপজেলা নির্বাহী অফিসার নয়, উপজেলায় কর্মরত উপজেলার সকল দপ্তরের কর্মকর্তাগণের সাথে এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে উপজেলার সার্বিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

উপজেলার সার্বিক উন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে জিজ্ঞাসার জবাবে নির্বাহী কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, এ উপজেলার উন্নয়নে আমার কয়েকটি পরিকল্পনা রয়েছে। সেগুলো হলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশের জন্য উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান; পর্যায়ক্রমে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা; সেচভিত্তিক কৃষির সম্প্রসারণ সংক্রান্ত প্রকল্প গ্রহণ; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহপাঠ কার্যক্রম জোরদারকরণ; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কাউট আন্দোলনকে বেগবান করা; মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষানুরাগী এবং সরকারি কর্মকর্তার সমন্বয়ে কমিটি গঠনপূর্বক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তদারকি জোরদার করা; মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম; একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সমিতিগুলোকে অধিকতর কার্যকর করে পরিবারভিত্তিক দারিদ্র্য বিমোচন করা; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পরিবারভিত্তিক বনায়নে উৎসাহিত করা।

আপনার উপজেলায় কী কী সমস্যা রয়েছে এবং এগুলো সমাধানে আপনার পরামর্শ কী এমন প্রশ্নের জবাবে দেলোয়ার হোসেন বলেন, উপকূলীয় উপজেলা হওয়ায় এখানে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডোসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং বেড়ীবাঁধের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। এ থেকে উত্তরণে কৃষি এবং মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এছাড়া প্রত্যন্ত এলাকায় জন্মহার বৃদ্ধি এ এলাকার একটি সমস্যা। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে পরিবার-পরিকল্পনা বিভাগকে সক্রিয় করার মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। রামগতি উপজেলায় প্রায় ৫৭% অধিবাসী বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। আলেকজান্ডার-দৌলতখান-মীর্জাকালু নৌ-পথে সরকারি নৌ-যানের ব্যবস্থা নেই। এছাড়া আলেকজান্ডার-চরগজারিয়া-তেলিরচর নৌ-পথে যাত্রী পারাপারে নিরাপদ নৌ-যানের অভাব রয়েছে। স্থানীয়ভাবে নির্মিত ছোট ট্রলার/নৌকা দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যাত্রী পারাপার হয়ে থাকে। এ সমস্যার সমাধানে বিআইডব্লিউটিএ/বিআইডব্লিউটিসি এর মাধ্যমে সি-ট্রাক বা অন্যান্য নিরাপদ নৌ-যানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।