লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জজ কোর্টের পিপি এডভোকেট জসীম উদ্দিন এর সাক্ষাৎকার

স্বাধীনচেতা ছিলেন সেই ছোট্টবেলা থেকে, চাইতেন না পরনির্ভরশীল হতে। মানুষের কল্যাণচিন্তা ধারণ করে শৈশব-কৈশোর পার হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। বেছে নেন আইনপেশাকে। কেননা এখানে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কল্যাণ করার সুযোগ রয়েছে। সেই কল্যাণচিন্তা এখনও তাঁর মাথায় রয়েছে। সরকারের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বিভিন্ন মানুষকে আইনি সহায়তা দেয়ার কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রিয় পাঠক এতক্ষণ যাঁর কথা বললাম, তিনি হলেন এডভোকেট মোঃ জসীম উদ্দিন; লক্ষ্মীপুর জজ কোর্টের সরকারি উকিল (পি পি)। সম্প্রতি তাঁর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় মিলিত হন লক্ষ্মীপুর বার্তা’র বৃহত্তর নোয়াখালীর বার্তা সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন লিটন। তাঁদের আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ লক্ষ্মীপুর বার্তা’র সহকারী সম্পাদক মোহাম্মদ মোস্তফার অনুলিখনে নিচে সন্নিবেশিত হলো।
নিজ জন্মস্থান সম্পর্কে অনুভূতি ব্যক্ত করে তারুণ্যদীপ্ত আইনজীবী এডভোকেট জসীম উদ্দিন বলেন আমার জন্ম লক্ষ্মীপুরের অজপাড়াগাঁয়ে, আমার পিতা একজন সমাজসেবী ছিলেন। তিনি আজীবন ইউনিয়নের জনকল্যাণের সাথে ছিলেন, সমাজসেবামূলক কাজ করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। লক্ষ্মীপুরে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় আমার নিজ গ্রাম থেকে। এজন্য আমি আমার জন্মস্থান লক্ষ্মীপুরকে নিয়ে গর্বিত।
অন্যপেশায় না গিয়ে আইন পেশাকে কেন বেছে নিলেন এমন প্রশ্নে আশাবাদী আইনজীবী জসীম উদ্দিন পি পি বলেন, ছোটবেলা থেকে আমি স্বাধীনচেতা ছিলাম, পরনির্ভরতা ভালো লাগত না। নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছা জাগত মনে। বড় হয়ে আমি দেখলাম পেশাতো অনেক, তবে আইন পেশায় সংশ্লিষ্ট হলে বিশাল জনগোষ্ঠীর সাথে সহজে যোগসূত্র স্থাপিত হয়, এখানে কল্যাণমূলক কাজ করারও যথেষ্ট সুযোগ আছে। আমার মরহুম পিতা আমাকে এ পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এসব কারণে আইন পেশায় আমার সম্পৃক্ততা।
আইনজীবীরা সেবার চেয়ে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের পেশাকে দেখে থাকেন, এ অভিযোগ অনেকের; এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি এমন জিজ্ঞাসায় আত্মবিশ্বাসী আইনজীবী জসীম উদ্দিন পি পি বলেন, এ পেশায় সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, বিভিন্ন মত ও পথের অনুসারী লোক আসেন। এদের মধ্যে অনেকে মানুষের সেবার লক্ষ্যেই আসেন, আবার কারুর উদ্দেশ্য মহৎ নাও হতে পারে। এজন্য এ অভিযোগের বিষয়কে আমি আংশিক সত্য বলে মনে করি।
আপনার জন্মস্থান লক্ষ্মীপুরের প্রধান সমস্যা কী কী, এ সমস্যা সমাধানে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি এমন প্রশ্নের জবাবে এলাকাপ্রেমী আইনজীবী জসীম উদ্দিন বলেন, লক্ষ্মীপুরের সমস্যা অগণিত। আমি যে এলাকার বাসিন্দা সেটি দির্ঘদিন থেকে অবহেলিত। এখানে দীর্ঘদিন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে উন্নয়ন-উদ্যোগ নগণ্য। এখানে রেল-লাইন নেই, দীর্ঘদিন এখানে নদী-বন্দর ছিল না। প্রধানমন্ত্রী লক্ষ্মীপুর আসার পর নদী-বন্দর স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। রূপালী ইলিশ আহরণের বিশাল ক্ষেত্র, সয়াবিনের বিপুল সমারোহ; কিন্তু এসবের উপর ভিত্তি করে কোনো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি। অথচ লক্ষ্মীপুর একটি বিপুল সম্ভাবনাময় অঞ্চল। অনেক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলো কাজে লাগানো গেলে শুধু লক্ষীপুরের জন্য নয়, সমগ্র দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। লক্ষ্মীপুরের ‘নেই’ এর তালিকা বড়। এখানে মেডিকেল কলেজ নেই, আধুনিক হাসপাতাল নেই। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হয়নি। এসব কারণে লক্ষ্মীপুর বাংলাদেশের অনেক অঞ্চল থেকে পিছিয়ে আছে।
লক্ষ্মীপুরে শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেয়া যায় বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে সমাজসেবী ব্যক্তিত্ব এডভোকেট জসীম উদ্দিন বলেন, লক্ষ্মীপুরে অনেক কর্মক্ষম যুবকের বাস, কাজের ক্ষেত্রও বিস্তৃত। এখানে শক্তসমর্থ যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ রয়েছে। যেমন মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগীর ফার্ম, গবাদিপশুর ফার্ম ইত্যাদি ব্যাপকভাবে চালু করা যায়। যুবউন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেয়া হলে উৎপাদন বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হবে। ফলমূল, শাকসব্জি চাষের জন্য গ্রীন বেল্ট গড়ে তোলা যায়; যেখানকার উৎপাদিত তরি-তরকারি, হাঁস-মুুরগী, ডিম, মাছ বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করা যায়। এতে লক্ষ্মীপুরের যুবসমাজের ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়ে উঠবে। এ ব্যাপারে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে উদ্যোগ নিলে লক্ষ্মীপুরের যুবকরা কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করবে। তারা আর পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে না।
ঢাকাস্থ লক্ষ্মীপুর জেলা সমিতি লক্ষ্মীপুরের উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে সচেতন এলাকাপ্রেমী নাগরিক এডভোকেট জসীম উদ্দিন বলেন, সমিতিতে যারা আছেন তাঁরা সবাই সচেতন নাগরিক; প্রশাসনের সাথে এঁদের পরিচয় রয়েছে। এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের ব্যাপারে তাঁরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। এ ব্যাপারে তাদের উদ্যোগ অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করি। পত্র- পত্রিকায়, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় লক্ষ্মীপুরের সুনির্দিষ্ট উন্নয়নের ব্যাপারে তুলে ধরার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন; স্থানীয় এমপিদের সাথে যোগাযোগ করে ফান্ড বরাদ্দের ব্যাপারে, একনেকে অনুমোদনের ব্যাপারে দেনদরবার করতে পারবেন।
কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লক্ষ্মীপুর সফরকালীন মজু চৌধুরী হাটকে নদী-বন্দর হিসেবে ঘোষণা দেন, নদী-বন্দর বাস্তবায়িত হলে কী ধরনের উপকার হবে বলে আপনি মনে করেন এমন প্রশ্নের জবাবে আত্মপ্রত্যয়ী এডভোকেট জসীম উদ্দিন বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের নয়নমণি। তিনি লক্ষ্মীপুরে এসে এখানে নদী-বন্দর প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেছেন। এটা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে লক্ষ্মীপুর ছাড়াও ভোলা-বরিশাল উপকৃত হবে। বৃহত্তর নোয়াখালীও এর উপকার লাভ করবে।
কিছুদিন আগে লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আপনি অনেক ভোটের ব্যবধানে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রে আপনার পরিকল্পনার কথা জানাবেন কি এমন প্রশ্নের জবাবে পেশার প্রতি একনিষ্ঠ আইনজীবী জসীম উদ্দিন পি পি বলেন, লক্ষ্মীপুর আইনজীবী সমিতিতে বিভিন্ন স্তরের আইনজীবীদের সমাবেশ ঘটেছে। অভিজ্ঞ আইনজীবী, সিনিয়র আইনজীবী, জুনিয়র আইনজীবী রয়েছেন। তারা বিভিন্ন মত ও পথ অনুসরণ করেন। আইনজীবীদের পেশাগত কোনো সমস্যা হলে সেটা সমাধান করা হয়। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে নতুন ভবন নির্মাণের অনুমতি চাইব। অনুমোদন পেলে আমরা দ্রুত কাজ শুরু করতে পারব। এছাড়া আইনজীবীদের সমিতি গরিব-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারে। সমিতির সদস্যগণ উদ্যোগী হয়ে বিত্তশালী, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে ফান্ড গঠন করবে, যেখান থেকে প্রতি বছর বৃত্তি দেয়া হবে।
আপনি দীর্ঘদিন পাবলিক প্রসিকিউটর (পি পি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, এ দায়িত্বে থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো মামলা পরিচালনা করছেন কি এমন জিজ্ঞাসার জবাবে আস্থাশীল আইনজীবী জসীম উদ্দিন পি পি বলেন, এ এলাকা সন্ত্রাস-কবলিত এলাকা, অনেক মামলা দায়ের হয়। বিশেষ করে জেলা জজ সাহেবের যোগদানের পর আমি ২১শ’ মামলা নিষ্পত্তি করেছি। বেশ কিছু সংখ্যক মামলায় আসামির ফাঁসি হয়েছে, অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। এর মধ্যে চন্দ্রগঞ্জে এক হিন্দু বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে সীমা নামে একটি মেয়েকে হত্যা করে ডাকাতরা। মামলার রায়ে ১০ জন আসামির মৃত্যুদন্ড হয়, বর্তমানে মামলাটি আপীল বিভাগে আছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা বলে আমি মনে করি।
আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মামলা করলে আইনজীবী পাওয়া যায় না তাহলে মামলা নিষ্পত্তি হবে কীভাবে, এ ব্যাপারে তাঁর মতামত জানতে চাইলে পি পি জসীম উদ্দিন বলেন, সমিতির সিদ্ধান্ত কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে অন্য আইনজীবী লড়বে না। সেক্ষেত্রে আমাদের সমিতি ক্ষতিগ্রস্ত পার্টির সাথে বসে কোর্টের মামলার নিষ্পত্তি করে দেয়। এ রকম আমরা অনেক মামলা নিষ্পত্তি করেছি।
ছাত্র-যুব সমাজের বিপথগামিতারোধে পরিবার বা সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে জসীম উদ্দিন বলেন আমি মনে করি, প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত সন্তানদের উপর নজর রাখা, ঠিকভাবে স্কুল-কলেজে যাচ্ছে কিনা, কাদের সাথে মেলামেশা করে, তারা কী ধরনের ছাত্রযুবক তা জানতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজগুলো অভিভাবকগণ যত সহজে করতে পারবেন, সমাজ কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তা পারবেন বলে মনে হয় না। বর্তমানে ছাত্র-যুব সমাজের মধ্যে বড় সমস্যা হলো মাদকাসক্তি, ইয়াবা মাদক খুব সহজে চলে আসছে ছাত্র-যুবকদের হাতে। এটা রোধ করতে না পারলে যুবসমাজ ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। মাদক বা ইয়াবার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে মাদক সরবরাহ ব্যবসায়ে যারা জড়িত তাদেরকে আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তি দিতে হবে। মাদক সরবরাহ রুট বন্ধ করে দিতে হবে।
৩০ বছর থেকে প্রকাশিত বৃহত্তর নোয়াখালীর মুখপত্র লক্ষ্মীপুর বার্তা সম্পর্কে বৃহত্তর নোয়াখালীর ঐক্য-চেতনায় বিশ্বাসী আইনজীবী জসীম উদ্দিন বলেন লক্ষ্মীপুর বার্তা বৃহত্তর নোয়াখালীর কন্ঠস্বর, ঐক্যের প্রতীক। বৃহত্তর নোয়াখালী, বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষের নজরে এনে এর সমাধান কামনা করে। এ পত্রিকা বৃহত্তর নোয়াখালীর অনেক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে। উন্নতমানের প্রকাশনা, সম্পাদনার পত্রিকা লক্ষ্মীপুর বার্তা’র অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক, পাঠকপ্রিয়তা লাভ করুক লক্ষ্মীপুর বার্তা এ কামনা করি।