Sun Mercury Venus Ve Ves
বিশেষ খবর
লক্ষ্মীপুরে মডেল থানা পুলিশের আলোচনা সভা ও আনন্দ উদযাপন  লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেলের সংবাদ সম্মেলন  লক্ষ্মীপুর মডেল থানায় ওসি (তদন্ত) শিপন বড়ুয়ার যোগদান  ঘর মেরামতে ঢেউটিন উপহার পেলেন লক্ষ্মীপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম  রায়পুর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু ও সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচিত 

বন্ধের পথে ফেনীর একমাত্র সিনেমা হলটিও

বন্ধের পথে ফেনীর একমাত্র সিনেমা হলটিও। এক সময় জেলায় ছয়টি সিনেমা হল থাকলেও শুধু দুলাল সিনেমা হল কোনোমতে খুঁড়িয়ে চলছে। তবে দর্শক খরার কারণে বছরের পর বছর লোকসান গুনছে মালিকপক্ষ। ফলে যে কোনো সময় ফেনীর একমাত্র হলটিও বন্ধ হতে পারে।
দুলাল সিনেমা হল, সুরত মহল, বিলাসী সিনেমা হল ও কানন সিনেমা হল নামে ফেনী শহরে চারটি সিনেমা হল ছিল। এছাড়া ফুলগাজীতে বিউটি সিনেমা হল ও দাগনভূঞায় ঝর্ণা সিনেমা হল নামে আরও দু’টি সিনেমা হল ছিল। কালের বিবর্তনে একটি বাদে সবগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময় এসব হলে ছবি দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শক ভিড় করতেন। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পরিবার নিয়ে আসতেন অনেকে।

কানন সিনেমা হলের নিয়মিত দর্শক তারা বাবু। এক সময় সপ্তাহে তিন-চার দিন সিনেমা দেখতেন। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে একবারও হলে যাইনি। দর্শকরা এখন ভালো ছবির পাশাপাশি ভালো পরিবেশ চায়। ফেনীর কোনো সিনেমা হলেই তা ছিল না। একাধিক সিনেমা হল মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৫২ সালের দিকে ক্রীড়া সংগঠক খায়রুল এছাক মিয়া শহরের রেল স্টেশন সড়কে ‘দুলাল’ সিনেমা হল চালু করেন। বছর খানেক পর শহরের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন ‘সুরত’ চালু করেন আফজালুর রহমান। ১৯৭৮ সালের দিকে আবুল কালাম আজাদ পেয়ারা ও মমতাজুল হক ভূঞার হাত ধরে শহরের মাস্টারপাড়া মোড়ে চালু হয় ‘কানন’ সিনেমা হল। ১৯৮০ সালের পরবর্তী সময়ে নুর মিয়া শহরের একাডেমি রোডে চালু করেন ‘বিলাসী’ নামের আরও একটি সিনেমা হল।

পরিবেশ, নিরাপত্তা ও পরিুছন্ন আসন ব্যবস্থায় সুরত ও দুলাল সিনেমা হলই দর্শকদের পছন্দের তালিকায় ছিল। এসব হলে প্রতি শো’তে ৭০০-৮০০ টিকিট বিক্রি হতো। অন্য সিনেমা হলগুলোতে ভালো ছবি না থাকায় দর্শক সমাগম কিছুটা কম হতো। তবে সেগুলোতেও প্রতি শো’তে ৪০০-৬০০ দর্শকের সমাগম ঘটতো। শহরের চারটি সিনেমা হলে প্রতিদিন অন্তত ১০-১২ হাজার দর্শক বিনোদন সুবিধা পেতেন। জানা যায়, ২০০৩ সালে আফজালুর রহমানের মৃত্যুর পর তার ছেলে বাচ্চু মিয়া সুরত হলের দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে সিনেমা হলটি ভেঙে ‘ফেনী সুপার মার্কেট’ নামকরণ করা হয়। বিলাসী সিনেমা হলের প্রতিষ্ঠাতা নুর মিয়া মারা যাওয়ার পর তার ছেলেরা স্থানীয় কমিশনার ওমর ফারুকের কাছে ভাড়া দেন। তবে দর্শক সঙ্কটের কারণে লোকসানের ভয়ে ২০০২ সালে হলটি ছেড়ে দেন তিনি। এরপর থেকে সেটি বন্ধ।

করোনার আগ পর্যন্ত চালু ছিল কানন সিনেমা হল। গত কয়েক বছর লোকসান হলেও কর্মচারীদের কথা মাথায় রেখে মালিকপক্ষ এটি চালু রাখে। কিন্তু করোনায় হল বন্ধ হলে তারা অন্য পেশায় চলে যান। সম্প্রতি মালিক পক্ষ হলটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। দুলাল সিনেমা হলে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ‘কাউন্টার অ্যাটাক’ ছবি চলছে। দর্শক মাত্র ১০-১২ জন। টিকিট কিনে কেবিনে ঘুমিয়ে আছেন এক দর্শক। নিয়মিত দর্শক না থাকায় আসন ধুলোয় ঢাকা পড়েছে। কিছু আসন ভেঙে গেলেও সংস্কার করা হয়নি দীর্ঘদিন ধরে।

হলের ক্যাশিয়ার গোলাম নবী বলেন, দুলালে এক সময় পাঁচটি শো চালানো হতো। দর্শক না থাকায় এখন দু’তিনটি চালানো হয়। হলটিতে ১০০ টাকা করে আটটি ভিআইপি সিট, ৮০ টাকা করে ২০ জনের কেবিন, ৭০ টাকা করে ৬০ জনের বেলকনি ও ৬০ টাকা করে ৮০ জনের প্রথম শ্রেণির আসন রয়েছে। গত কয়েক বছর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির টিকিট বিক্রি বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ৩৫ বছর আগে দুলাল হলে আচার ও চকলেট বিক্রি করতাম। এ দিয়ে সংসার চলতো। বিশ্বস্ত হওয়ায় মালিক পক্ষ আমাকে নিয়োগ দেয়। দর্শক না থাকায় এখন হলের ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থেকেও সংসার চালানো যাচ্ছে না। নবী আরও বলেন, নব্বইয়ের দশকে ফেনীর হলগুলোতে টিকিটের দাম ছিল ২ টাকা ২০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৫ টাকা। তখন দর্শকদের টিকিট কেনার লম্বা লাইনের কথা এখনো মনে পড়ে। দুলাল সিনেমা হলের মালিক ইঞ্জিনিয়ার সফিউদ্দিন বেলাল বলেন, বেদের মেয়ে জোসনা, রূপবানের মতো চলচ্চিত্র দেখতে দর্শকদের ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হয়েছিল। ভালো ছবিগুলো দু’তিন মাস চালানোর পরও দর্শকের কমতি ছিল না।

তিনি বলেনÑ ফেনী, রামগতি, মাটিরাঙ্গা, লাকসাম, হাতিয়ায় কয়েকটি সিনেমা হল ছিল আমাদের। শুধু ফেনীর দুলাল সিনেমা হলে ৩০-৩৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল। ২০১৫ সালের পর থেকে দর্শক কমতে থাকে। জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সমর দেবনাথ বলেন, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ও ভালো চলচ্চিত্র না হওয়ায় সিনেমা হলগুলো বিলুপ্তির পথে। সরকার হল মালিকদের নানাভাবে প্রণোদনা দিয়ে এ সংস্কৃতিকে ঘুরো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারিভাবে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কম মূল্যে সিনেমা দেখানো গেলে মানুষ হলের দিকে ঝুঁকবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনীর সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, সিনেমা হলের সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে হল মালিকরাও দায়ী। কারণ হলের পরিবেশ ও ভালো ছবি একে অপরের পরিপূরক। তারা দর্শকদের রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হলের পরিবেশের উন্নতি ঘটাতে পারেনি। হলের পর্দা ও আসন যুগোপযোগী ছিল না বলে দর্শকরা হল বিমুখ হয়েছে।

ফেনী জেলা কালচারাল অফিসার জান্নাত আরা যুথি বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের জন্য ফেনী উর্বর স্থান। এখানে সিনেমা হলের সংস্কৃতি বিলুপ্তির বিষয়টি অপ্রত্যাশিত। সরকার এ শিল্পকে রক্ষা ও ঘুরে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিলে আমরা সংস্কৃতিককর্মী ও সংগঠনগুলোকে সহযোগিতা করবো। জেলা প্রশাসক মো ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘সরকার এ খাতকে গণমুখী করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। আধুনিক হল নির্মাণ ও সংস্কারে কেউ এগিয়ে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।